বিশ্ব জুড়ে বই পড়ার হার ধীরে ধীরে কমছে, আর এই প্রবণতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কিছু উন্নয়নশীল ও সংকটাপন্ন দেশে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বই পড়ার অভ্যাসে আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ প্রায় একই অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশে একজন ব্যক্তি বছরে গড়ে প্রায় ২.৭৫টি বই পড়েন, আর আফগানিস্তানে এই সংখ্যা প্রায় ২.৫৬টি।
বৈশ্বিক প্রবণতায় পড়ার আগ্রহ কমছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নিম্নমুখী প্রবণতার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল অবকাঠামো এবং শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব অনেক দেশে পাঠাভ্যাসকে দুর্বল করে দিয়েছে। ফলে বই পড়া অনেক জায়গায় শুধু পরীক্ষামুখী বা চাকরিমুখী প্রস্তুতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, জীবনব্যাপী অভ্যাস হিসেবে গড়ে ওঠেনি।
বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশে বড় জনগোষ্ঠী এখনও অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বই অনেকের কাছে বিলাসপণ্য হিসেবেই বিবেচিত হয়। ফলে নিয়মিত বই কেনা বা পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে না। একই সঙ্গে গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের এলাকায় বইয়ের সহজলভ্যতা কম থাকাও একটি বড় বাধা।
এ ছাড়া ডিজিটাল বিনোদনের বিস্তার এবং মানসম্মত পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়ার উৎসাহও তুলনামূলকভাবে কম।

অন্য দেশগুলোর চিত্র
বিশ্বতালিকায় সবচেয়ে কম বই পড়ার দেশ হিসেবে উঠে এসেছে আফগানিস্তান, যেখানে একজন মানুষ বছরে গড়ে মাত্র ২.৫৬টি বই পড়েন। পাকিস্তান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশও এই তালিকায় রয়েছে।
এদিকে উচ্চ সাক্ষরতার হার থাকা সত্ত্বেও কাতার, কুয়েত বা বাহরাইনের মতো দেশেও বই পড়ার হার খুবই কম। সেখানে পড়াশোনা মূলত একাডেমিক বা ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।
মূল কারণগুলো কী
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেসব দেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নেই, যেখানে বইয়ের বাজার দুর্বল, কিংবা যেখানে সামাজিকভাবে বই পড়ার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি—সেসব দেশেই পড়ার হার সবচেয়ে কম।
একই সঙ্গে প্রকাশনা খাতের দুর্বলতা, বইয়ের উচ্চমূল্য এবং গ্রন্থাগারের অভাবও বড় ভূমিকা রাখছে। অনেক দেশে বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে টেলিভিশন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, যা বই পড়ার সময়কে কমিয়ে দিচ্ছে।
সামনে চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে শুধু সাক্ষরতার হার বাড়ালেই হবে না, পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করে পরিবার ও সমাজে বই পড়ার সংস্কৃতি তৈরি না হলে এই প্রবণতা আরও খারাপ হতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। অর্থনৈতিক চাপ, সীমিত প্রবেশাধিকার এবং সামাজিক অভ্যাস—এই তিনটি বিষয় কাটিয়ে উঠতে না পারলে বই পড়ার হার বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।
পাঠাভ্যাসের এই সংকট শুধু ব্যক্তিগত জ্ঞানের ঘাটতি তৈরি করে না, এটি দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশের বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশকেও প্রভাবিত করতে পারে।
বাংলাদেশে বছরে গড়ে মাত্র ২.৭৫টি বই পড়া হয়—এই বাস্তবতা ভাবাচ্ছে। পড়ার অভ্যাস কমছে কেন, তার বিস্তারিত চিত্রই উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















