০৮:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬
আজ রাতে পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে – ট্রাম্প প্রথমবারের মতো প্রাণীর টিকাকার্ড চালুর প্রস্তাব, স্বাস্থ্য ও জীবিকা সুরক্ষায় নতুন উদ্যোগ ২৪ ঘণ্টায় আরও ১০ সন্দেহজনক হাম রোগীর মৃত্যু, মোট মৃত্যু ১২৮ সংসদে বিরোধী দল অত্যন্ত সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করছে- স্পিকার হুতি আন্দোলনের সংযমী পদক্ষেপ: ইরান যুদ্ধে সীমিত হামলা ও কৌশল কান্দির খাবারের ফিরিস্তি: পর্ব-২: জনার নিরামিষ সিঙ্গারা শিরীন শারমিনকে ঘিরে আইনজীবীদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান আদালতের সিঁড়িতে পড়ে গেলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা নিয়ে লন্ডনে বৈঠক, যুক্তরাষ্ট্র অনুপস্থিত যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ চালালে বেসামরিক স্থাপনায় হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের

কান্দির খাবারের ফিরিস্তি: পর্ব-২: জনার নিরামিষ সিঙ্গারা

  • তাপস দাস
  • ০৬:৩৪:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬
  • 15

এই পর্বে কান্দি অঞ্চলের বিখ্যাত ‘জনার নিরামিষ সিঙ্গারা’ নিয়ে আলোচনা করবো। লেখোটিকে তিনটি পর্বে ভাগ করা হয়েছে। যেহেতু প্রথম পর্বে উল্লেখ করা হয়েছিল প্রতিটি পর্বেই বিভিন্ন গবেষণা থেকে উঠে আসা কান্দি সম্পর্কিত কিছু তথ্য তুলে ধরা হবে, সেহেতু প্রথম পর্বে কান্দি নামের অর্থ নিয়ে খানিক আলোচনা থাকবে। দ্বিতীয় ভাগে থাকবে ‘সিঙ্গারা’র উৎপত্তি সম্পর্কিত কিছু তথ্য। এবং তৃতীয় ভাগে এই লেখার মূল বিষয় নিয়ে আলোচনা থাকবে, অর্থাৎ ‘জনা’ সিঙ্গারা।

আমি প্রথম পর্বেই উল্লেখ করেছি যে, কান্দি নিয়ে আমার পড়াশোনা এবং গবেষণা এখনও খুব প্রাথমিক পর্যায়ে। সেই জায়গা থেকে আপাতত আমার হাতে যে সমস্ত বই এসেছে, সেখানে কান্দির সামাজিক-রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক আলোচনাই প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু খাদ্য সংস্কৃতি নিয়ে লেখালেখি অপরিমিত। তবে ডঃ গদাধর দে সম্পাদিত ‘ঐতিহ্য ইতিহাস: বাংলার ভোজ ও ভোজন বৈচিত্র্য’ পুস্তকে প্রকাশ দাস বিশ্বাস রচিত ‘রামেন্দ্র স্মরণে এক অবিস্মরণীয় ভোজসভা’ এবং মৃন্ময় মুখোপাধ্যায় রচিত ‘কান্দির ভোজ’ নিয়ে দুটি অধ্যায় আছে। পরবর্তী কোনো এক পর্বে লেখো দুটির বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করবো।

সুতরাং, উল্লিখিত বিভাগ অনুসারে কান্দি নামের অর্থ দিয়ে শুরু করা যাক।

কান্দিনামা

প্রণব আচার্য রচিত ‘কান্দিনামা’ বইটি থেকে কান্দি শব্দের দুটি অর্থ পাওয়া যায়। তার আগে একটি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে নেওয়া প্রয়োজন। এই ধারাবাহিক পর্বে যে ‘কান্দিনামা’ শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি এই পুস্তকের নাম থেকেই অনুপ্রাণিত। এবার মূল বিষয়ে ফেরা যাক। এই বই থেকে কান্দির যে দুটি অর্থ পাওয়া যায়, তার মধ্যে একটি হলো—দুইদিকে বন্ধ পুরোনো নদীপথের জলাশয়বদ্ধ পাশের স্থান। অন্যটি হলো—একদা বহড়ো গাছে সমাকীর্ণ স্থান (পৃষ্ঠা: ৪৭)।

এবার আসা যাক সিঙ্গারার উৎপত্তি প্রসঙ্গে।

সিঙ্গারার উৎপত্তি

সিঙ্গারা বাঙালি বা ভারতীয়দের সৃষ্টি নয়। ইতিহাস বলছে, ইরান থেকেই নাকি এদেশে সিঙ্গারা এসেছে। একদল ইতিহাসবিদের মতে, ফার্সি শব্দ ‘সাম্বোসাগ’ থেকেই এই সিঙ্গারা শব্দের উৎপত্তি। তাঁদের দাবি, গজনবী সাম্রাজ্যে সম্রাটের দরবারে এক ধরনের নোনতা মুচমুচে খাবার পরিবেশন করা হতো। যার মধ্যে কিমা, শুকনো বাদামসহ নানা উপকরণ দেওয়া থাকত। এটাই নাকি সিঙ্গারার আদি রূপ।

ইতিহাসবিদ আবুল ফজল বায়হাকি তাঁর ‘তারিখ-ই-বহোগি’ বইয়ে ‘সাম্বোসা’র কথা উল্লেখ করেছেন। এই ‘সাম্বোসা’ই সিঙ্গারার আদি রূপ। তবে দ্বাদশ শতাব্দী থেকেই মোটামুটি ভারত উপমহাদেশে পরিচিত নাম সিঙ্গারা। আমির খসরুর রচনাতেও এর উল্লেখ আছে।

তবে সিঙ্গারার জন্মভূমি নিয়ে মতান্তর এবং বিতর্ক থাকলেও ভারতে আসার পর এর স্বাদ ও উপকরণে আমূল পরিবর্তন এসেছে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। যেমন, ষোড়শ শতকে পর্তুগিজরা ভারতে আসার পর এ দেশের মানুষের পরিচয় হয় ‘আলু’ নামের এক চমৎকার সবজির সঙ্গে। পরবর্তী সময়ে এই ভূভাগে মাংসের সিঙ্গারা, ফুলকপির সিঙ্গারা, পনিরের সিঙ্গারা, ক্ষীরের সিঙ্গারা ইত্যাদি নানা রকম স্বাদের সিঙ্গারা তৈরি হতে থাকে। তবে আলুর পুর দেওয়া সিঙ্গারাই সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে এই সবজিকে এ দেশের মানুষ কতটা আপন করে নিয়েছে, তা আমাদের সবারই জানা।

জনার নিরামিষ সিঙ্গারা

কান্দির প্রশাসনিক ভবনের সামনে রাস্তা দিয়ে যেতে ডান হাতে জনার সিঙ্গারার দোকান পড়বে। তবে আজ যে দোকানটি আমরা দেখি, এর পেছনে লুকিয়ে আছে অনেক দীর্ঘ অতীত, পারিবারিক বিচ্ছেদ এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম। আনুমানিক ১৯৭০-এর দশকে অরুণ কুমার দাস একটি মুদি দোকান চালু করেন। বর্তমানে অ্যাডভোকেট সুকান্ত মুখার্জীর যে চেম্বারটি রয়েছে এবং ‘জনার সিঙ্গারা’র দোকানটি মিলিয়ে যে জায়গাটি, সেটিই ছিল সেই মুদি দোকান। আজ কান্দিতে অনেক মুদি দোকান থাকলেও, সেই সময় এই দোকানটি ছিল কান্দির সবচেয়ে বড় মুদি দোকান।

কিন্তু অরুণ কুমার দাসের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং ব্যবসায় ভাটা নেমে আসে। ফলে মুদি দোকানটি রূপান্তরিত হয়ে ভাতের হোটেলে পরিণত হয়। তবে মুদি দোকানের সঙ্গে যে পানের দোকানটি ছিল, সেটি অপরিবর্তিত থাকে। অরুণ কুমার দাসের সঙ্গে তাঁর সহধর্মিণী দীপালি দাসও হোটেলের ব্যবসায় তাঁকে সাহায্য করতেন।

পরবর্তী সময়ে তাঁদের সংসারে দুটি পুত্রের জন্ম হয়। বড় ছেলের নাম রাজকুমার দাস (ডাকনাম ‘রাজু’) এবং ছোট ছেলে জয়ন্ত কুমার দাস (ডাকনাম ‘জনা’)।

মুদি ব্যবসা ছেড়ে অরুণ কুমার যে হোটেলটি খুলেছিলেন, সেটির নাম রাখা হয় বড় ছেলে রাজুর নামে—‘রাজু হিন্দু হোটেল’। কিন্তু নতুন ব্যবসাতেও অরুণ বাবুর পূর্ববর্তী আচরণের পরিবর্তন আসেনি। তার ওপর দীপালি দাসের অকালমৃত্যু দুই সন্তানের জীবনে অনিশ্চয়তা বয়ে আনে। দোকানের নাম বদলে রাখা হয় ‘দীপালি হিন্দু হোটেল’, কিন্তু নাম বদলালেও ব্যবসার গতিপথ বদলায়নি। ফলে একসময় ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়।

জীবনধারণের তাগিদে বড় ছেলে পানের দোকানটি চালাতে শুরু করেন। ছোট ছেলে জনা কাজের সন্ধানে বাইরে চলে যান। ২০০০ সালের বন্যার সময় জনা ফিরে আসেন। এরপর থেকে দুই ভাই মিলে আবার একটি মিষ্টির দোকান, ভাতের হোটেল এবং পানের দোকান চালু করেন। কিন্তু আগের মন্দা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।

পারিবারিক পরিস্থিতির চাপে জয়ন্ত কুমার দাস ওরফে জনাকে পাশের একটি মিষ্টির দোকানে কাজ করতে হয়। সেই সময় ওই দোকানটি সিঙ্গারা বিক্রির জন্য বেশ নাম করেছিল—‘চূড়ার সিঙ্গারা’। অন্যের দোকানে কাজ করলেও নিজের দোকান নিয়ে জনা চিন্তিত থাকতেন। কখনও বন্ধুর সঙ্গে, কখনও দোকান ভাড়া দিয়ে—বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করতেন। কিন্তু প্রতিটি প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়।

জীবনের এই চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যে ২০১৪ সালে জনা চূড়ার দোকানের কাজ ছেড়ে এক বন্ধুর সাহায্যে নিজেই একটি ঠেলাগাড়িতে সিঙ্গারা বিক্রি শুরু করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই বন্ধু গাড়িটি নিয়ে নেয়, ফলে জনার জীবনে আবার অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এদিকে তাঁদের পুরোনো দোকানটিও দেনার দায়ে হাতছাড়া হতে বসেছিল। তবে জনার শ্বশুরবাড়ির সহায়তায় দোকানটি ফিরে পাওয়া যায়। এরপর তিনি সিঙ্গারার ব্যবসা শুরু করেন। তারপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি—আজ কান্দির খাদ্য সংস্কৃতির সঙ্গে জনার সিঙ্গারা একটি পরিচিত নাম।

জয়ন্ত কুমার দাস (জনা)

শুরুর দিকে জনা, তাঁর সহধর্মিণী ঊর্মিলা দাস এবং প্রীতি (যিনি ‘ঠাকুর’ নামে পরিচিত ছিলেন)—এই তিনজন মিলে ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে দোকানে চারজন কর্মচারী রয়েছেন। মাঝে মাঝে ঊর্মিলা দাস এখনও কাজে সাহায্য করেন। প্রথমদিকে সিঙ্গারা, গুটকি, খাস্ত কচুরি, মুড়ি, চপ, জল ও ঠান্ডা পানীয় বিক্রি হলেও, পরবর্তীতে সিঙ্গারা ও গুটকির জনপ্রিয়তার কারণে এখন মূলত এই দুই ধরনের খাবারই বিক্রি হয়। সাধারণত দোকান সন্ধ্যার সময় খোলা হয়। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে কান্দিবাসীদের ভিড়ে দোকান মুখর হয়ে ওঠে।

সহকারী অধ্যাপক, কান্দি রাজ কলেজ
মুর্শিদাবাদ-কান্দি

জনপ্রিয় সংবাদ

আজ রাতে পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে – ট্রাম্প

কান্দির খাবারের ফিরিস্তি: পর্ব-২: জনার নিরামিষ সিঙ্গারা

০৬:৩৪:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬

এই পর্বে কান্দি অঞ্চলের বিখ্যাত ‘জনার নিরামিষ সিঙ্গারা’ নিয়ে আলোচনা করবো। লেখোটিকে তিনটি পর্বে ভাগ করা হয়েছে। যেহেতু প্রথম পর্বে উল্লেখ করা হয়েছিল প্রতিটি পর্বেই বিভিন্ন গবেষণা থেকে উঠে আসা কান্দি সম্পর্কিত কিছু তথ্য তুলে ধরা হবে, সেহেতু প্রথম পর্বে কান্দি নামের অর্থ নিয়ে খানিক আলোচনা থাকবে। দ্বিতীয় ভাগে থাকবে ‘সিঙ্গারা’র উৎপত্তি সম্পর্কিত কিছু তথ্য। এবং তৃতীয় ভাগে এই লেখার মূল বিষয় নিয়ে আলোচনা থাকবে, অর্থাৎ ‘জনা’ সিঙ্গারা।

আমি প্রথম পর্বেই উল্লেখ করেছি যে, কান্দি নিয়ে আমার পড়াশোনা এবং গবেষণা এখনও খুব প্রাথমিক পর্যায়ে। সেই জায়গা থেকে আপাতত আমার হাতে যে সমস্ত বই এসেছে, সেখানে কান্দির সামাজিক-রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক আলোচনাই প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু খাদ্য সংস্কৃতি নিয়ে লেখালেখি অপরিমিত। তবে ডঃ গদাধর দে সম্পাদিত ‘ঐতিহ্য ইতিহাস: বাংলার ভোজ ও ভোজন বৈচিত্র্য’ পুস্তকে প্রকাশ দাস বিশ্বাস রচিত ‘রামেন্দ্র স্মরণে এক অবিস্মরণীয় ভোজসভা’ এবং মৃন্ময় মুখোপাধ্যায় রচিত ‘কান্দির ভোজ’ নিয়ে দুটি অধ্যায় আছে। পরবর্তী কোনো এক পর্বে লেখো দুটির বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করবো।

সুতরাং, উল্লিখিত বিভাগ অনুসারে কান্দি নামের অর্থ দিয়ে শুরু করা যাক।

কান্দিনামা

প্রণব আচার্য রচিত ‘কান্দিনামা’ বইটি থেকে কান্দি শব্দের দুটি অর্থ পাওয়া যায়। তার আগে একটি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে নেওয়া প্রয়োজন। এই ধারাবাহিক পর্বে যে ‘কান্দিনামা’ শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি এই পুস্তকের নাম থেকেই অনুপ্রাণিত। এবার মূল বিষয়ে ফেরা যাক। এই বই থেকে কান্দির যে দুটি অর্থ পাওয়া যায়, তার মধ্যে একটি হলো—দুইদিকে বন্ধ পুরোনো নদীপথের জলাশয়বদ্ধ পাশের স্থান। অন্যটি হলো—একদা বহড়ো গাছে সমাকীর্ণ স্থান (পৃষ্ঠা: ৪৭)।

এবার আসা যাক সিঙ্গারার উৎপত্তি প্রসঙ্গে।

সিঙ্গারার উৎপত্তি

সিঙ্গারা বাঙালি বা ভারতীয়দের সৃষ্টি নয়। ইতিহাস বলছে, ইরান থেকেই নাকি এদেশে সিঙ্গারা এসেছে। একদল ইতিহাসবিদের মতে, ফার্সি শব্দ ‘সাম্বোসাগ’ থেকেই এই সিঙ্গারা শব্দের উৎপত্তি। তাঁদের দাবি, গজনবী সাম্রাজ্যে সম্রাটের দরবারে এক ধরনের নোনতা মুচমুচে খাবার পরিবেশন করা হতো। যার মধ্যে কিমা, শুকনো বাদামসহ নানা উপকরণ দেওয়া থাকত। এটাই নাকি সিঙ্গারার আদি রূপ।

ইতিহাসবিদ আবুল ফজল বায়হাকি তাঁর ‘তারিখ-ই-বহোগি’ বইয়ে ‘সাম্বোসা’র কথা উল্লেখ করেছেন। এই ‘সাম্বোসা’ই সিঙ্গারার আদি রূপ। তবে দ্বাদশ শতাব্দী থেকেই মোটামুটি ভারত উপমহাদেশে পরিচিত নাম সিঙ্গারা। আমির খসরুর রচনাতেও এর উল্লেখ আছে।

তবে সিঙ্গারার জন্মভূমি নিয়ে মতান্তর এবং বিতর্ক থাকলেও ভারতে আসার পর এর স্বাদ ও উপকরণে আমূল পরিবর্তন এসেছে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। যেমন, ষোড়শ শতকে পর্তুগিজরা ভারতে আসার পর এ দেশের মানুষের পরিচয় হয় ‘আলু’ নামের এক চমৎকার সবজির সঙ্গে। পরবর্তী সময়ে এই ভূভাগে মাংসের সিঙ্গারা, ফুলকপির সিঙ্গারা, পনিরের সিঙ্গারা, ক্ষীরের সিঙ্গারা ইত্যাদি নানা রকম স্বাদের সিঙ্গারা তৈরি হতে থাকে। তবে আলুর পুর দেওয়া সিঙ্গারাই সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে এই সবজিকে এ দেশের মানুষ কতটা আপন করে নিয়েছে, তা আমাদের সবারই জানা।

জনার নিরামিষ সিঙ্গারা

কান্দির প্রশাসনিক ভবনের সামনে রাস্তা দিয়ে যেতে ডান হাতে জনার সিঙ্গারার দোকান পড়বে। তবে আজ যে দোকানটি আমরা দেখি, এর পেছনে লুকিয়ে আছে অনেক দীর্ঘ অতীত, পারিবারিক বিচ্ছেদ এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম। আনুমানিক ১৯৭০-এর দশকে অরুণ কুমার দাস একটি মুদি দোকান চালু করেন। বর্তমানে অ্যাডভোকেট সুকান্ত মুখার্জীর যে চেম্বারটি রয়েছে এবং ‘জনার সিঙ্গারা’র দোকানটি মিলিয়ে যে জায়গাটি, সেটিই ছিল সেই মুদি দোকান। আজ কান্দিতে অনেক মুদি দোকান থাকলেও, সেই সময় এই দোকানটি ছিল কান্দির সবচেয়ে বড় মুদি দোকান।

কিন্তু অরুণ কুমার দাসের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং ব্যবসায় ভাটা নেমে আসে। ফলে মুদি দোকানটি রূপান্তরিত হয়ে ভাতের হোটেলে পরিণত হয়। তবে মুদি দোকানের সঙ্গে যে পানের দোকানটি ছিল, সেটি অপরিবর্তিত থাকে। অরুণ কুমার দাসের সঙ্গে তাঁর সহধর্মিণী দীপালি দাসও হোটেলের ব্যবসায় তাঁকে সাহায্য করতেন।

পরবর্তী সময়ে তাঁদের সংসারে দুটি পুত্রের জন্ম হয়। বড় ছেলের নাম রাজকুমার দাস (ডাকনাম ‘রাজু’) এবং ছোট ছেলে জয়ন্ত কুমার দাস (ডাকনাম ‘জনা’)।

মুদি ব্যবসা ছেড়ে অরুণ কুমার যে হোটেলটি খুলেছিলেন, সেটির নাম রাখা হয় বড় ছেলে রাজুর নামে—‘রাজু হিন্দু হোটেল’। কিন্তু নতুন ব্যবসাতেও অরুণ বাবুর পূর্ববর্তী আচরণের পরিবর্তন আসেনি। তার ওপর দীপালি দাসের অকালমৃত্যু দুই সন্তানের জীবনে অনিশ্চয়তা বয়ে আনে। দোকানের নাম বদলে রাখা হয় ‘দীপালি হিন্দু হোটেল’, কিন্তু নাম বদলালেও ব্যবসার গতিপথ বদলায়নি। ফলে একসময় ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়।

জীবনধারণের তাগিদে বড় ছেলে পানের দোকানটি চালাতে শুরু করেন। ছোট ছেলে জনা কাজের সন্ধানে বাইরে চলে যান। ২০০০ সালের বন্যার সময় জনা ফিরে আসেন। এরপর থেকে দুই ভাই মিলে আবার একটি মিষ্টির দোকান, ভাতের হোটেল এবং পানের দোকান চালু করেন। কিন্তু আগের মন্দা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।

পারিবারিক পরিস্থিতির চাপে জয়ন্ত কুমার দাস ওরফে জনাকে পাশের একটি মিষ্টির দোকানে কাজ করতে হয়। সেই সময় ওই দোকানটি সিঙ্গারা বিক্রির জন্য বেশ নাম করেছিল—‘চূড়ার সিঙ্গারা’। অন্যের দোকানে কাজ করলেও নিজের দোকান নিয়ে জনা চিন্তিত থাকতেন। কখনও বন্ধুর সঙ্গে, কখনও দোকান ভাড়া দিয়ে—বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করতেন। কিন্তু প্রতিটি প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়।

জীবনের এই চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যে ২০১৪ সালে জনা চূড়ার দোকানের কাজ ছেড়ে এক বন্ধুর সাহায্যে নিজেই একটি ঠেলাগাড়িতে সিঙ্গারা বিক্রি শুরু করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই বন্ধু গাড়িটি নিয়ে নেয়, ফলে জনার জীবনে আবার অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এদিকে তাঁদের পুরোনো দোকানটিও দেনার দায়ে হাতছাড়া হতে বসেছিল। তবে জনার শ্বশুরবাড়ির সহায়তায় দোকানটি ফিরে পাওয়া যায়। এরপর তিনি সিঙ্গারার ব্যবসা শুরু করেন। তারপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি—আজ কান্দির খাদ্য সংস্কৃতির সঙ্গে জনার সিঙ্গারা একটি পরিচিত নাম।

জয়ন্ত কুমার দাস (জনা)

শুরুর দিকে জনা, তাঁর সহধর্মিণী ঊর্মিলা দাস এবং প্রীতি (যিনি ‘ঠাকুর’ নামে পরিচিত ছিলেন)—এই তিনজন মিলে ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে দোকানে চারজন কর্মচারী রয়েছেন। মাঝে মাঝে ঊর্মিলা দাস এখনও কাজে সাহায্য করেন। প্রথমদিকে সিঙ্গারা, গুটকি, খাস্ত কচুরি, মুড়ি, চপ, জল ও ঠান্ডা পানীয় বিক্রি হলেও, পরবর্তীতে সিঙ্গারা ও গুটকির জনপ্রিয়তার কারণে এখন মূলত এই দুই ধরনের খাবারই বিক্রি হয়। সাধারণত দোকান সন্ধ্যার সময় খোলা হয়। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে কান্দিবাসীদের ভিড়ে দোকান মুখর হয়ে ওঠে।

সহকারী অধ্যাপক, কান্দি রাজ কলেজ
মুর্শিদাবাদ-কান্দি