বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও পোষা প্রাণীর জন্য টিকাকার্ড চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মাধ্যমে প্রাণীর স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা, জীবিকা রক্ষা এবং জুনোটিক রোগের ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠান ও প্রেক্ষাপট
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ঢাকার হোটেল বেঙ্গল ব্লুবেরিতে আয়োজিত এক পর্যালোচনা সভায় এই প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। সভাটি যৌথভাবে আয়োজন করে icddr,b এবং Department of Livestock Services।
এটি “বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ, পোলট্রি ও পোষা প্রাণীর কার্যকর টিকা ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা” প্রণয়নের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সরকারি, ইপিআই, ওষুধ শিল্প ও প্রাণিস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
টিকাদান সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা
ডিএলএসের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. বাইজার রহমান জানান, দেশে প্রাণীর টিকাদান সক্ষমতা বর্তমানে প্রায় ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তিনি বলেন, শক্তিশালী টিকাব্যবস্থা ছাড়া প্রাণিসম্পদ খাত তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারবে না।
বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি খাত জিডিপিতে প্রায় ১.৮১ শতাংশ অবদান রাখে এবং প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। তবুও মাত্র ২০ শতাংশ গ্রামীণ খামারি নিয়মিত টিকা দেন।
সমস্যার মূল কারণ
দেশে মানুষের জন্য সফল ইপিআই কর্মসূচি থাকলেও প্রাণীর ক্ষেত্রে সমন্বিত জাতীয় টিকা ব্যবস্থা নেই।
এর ফলে নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে, যেমন—
সচেতনতার অভাব
টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে ভীতি
দুর্বল কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা
অপর্যাপ্ত সরবরাহ
প্রশিক্ষিত ভেটেরিনারি জনবলের ঘাটতি

স্বাস্থ্যঝুঁকি ও রোগের বিস্তার
ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক হাম ও বার্ড ফ্লু পরিস্থিতি দেখিয়েছে যে টিকাদানের ঘাটতি মানব ও প্রাণী—দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকি তৈরি করে। প্রাণীর টিকা শুধু তাদের স্বাস্থ্য নয়, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যও সুরক্ষিত করে।
বাংলাদেশকে উদীয়মান সংক্রামক রোগের একটি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে ধরা হয়, যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ রোগই জুনোটিক। উচ্চ জনসংখ্যা ঘনত্ব, মানুষ-প্রাণীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ, লাইভ পশুর বাজার এবং দ্রুত নগরায়ণ এই ঝুঁকি বাড়ায়। অ্যানথ্রাক্স, জলাতঙ্ক ও বার্ড ফ্লুর মতো রোগের পুনরাবৃত্তিও এই দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে।
নতুন টিকাকার্ড ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করবে
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় icddr,b ও ডিএলএস যৌথভাবে একটি কাঠামোবদ্ধ টিকা ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে টিকাকার্ড চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এই কার্ডে থাকবে—
প্রাণীর পরিচয় তথ্য
টিকাদানের ইতিহাস
ভবিষ্যৎ টিকার সময়সূচি
এর ফলে টিকাদান কার্যক্রম আরও সংগঠিত ও ট্র্যাকযোগ্য হবে।
উপকারিতা ও সম্ভাবনা
এই উদ্যোগের মাধ্যমে—
টিকাদানের আওতা বাড়বে
রোগ নজরদারি শক্তিশালী হবে
প্রাণীর মৃত্যুহার কমবে
চিকিৎসা ব্যয় কমবে
উৎপাদনশীলতা বাড়বে
খাদ্য নিরাপত্তা উন্নত হবে
icddr,b-এর বিজ্ঞানী ডা. সুকান্ত চৌধুরী বলেন, এই টিকাকার্ড খামারিদের টিকাদান ট্র্যাক করতে সাহায্য করবে এবং রোগ প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখবে।
সমন্বিত ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতির গুরুত্ব
সভায় অংশগ্রহণকারীরা একটি সমন্বিত ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতির ওপর জোর দেন, যেখানে প্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে একসঙ্গে যুক্ত করা হবে।
প্রস্তাবিত কাঠামোতে মানসম্মত টিকাসূচি, উন্নত রিপোর্টিং ব্যবস্থা এবং সমন্বিত নজরদারি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রোগের বোঝা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কমবে, কৃষকের আয় বাড়বে এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলায় সহায়তা করবে।
সভা শেষে একটি সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রাণী টিকাব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে সবাই একমত হন, যা দেশের সামগ্রিক ‘ওয়ান হেলথ’ উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















