রঘু রাইয়ের সঙ্গে শেষ দেখা করার সুযোগ পাই ২০১৩ সালে। ধানমন্ডির বেঙ্গল গ্যালারিতে তাঁর “ Bangladesh: The Price of Freedom” শিরোনামের এক্সিবিশন চলাকালে তিনি ঢাকায় এলে।
সেদিনও তাঁর সঙ্গে যা কথা হয়েছিল তার বেশিরভাগই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ঘিরে। শরণার্থী শিবির ঘিরে। কারণ ওই শিবির আমি দেখেছি অপরিণত বয়সের দুটি চোখে আর তিনি দেখেছেন পরিণত চোখে। ১৯৭১ সালে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থী শিবিরের অনেকখানি পরিপূর্ণ রূপ রঘু রাইয়ের ছবিগুলো একের পর এক দেখলে ফুটে ওঠে।
তারপরেও লেন্সের শিল্পী রঘু রাইয়ের প্রতিটি ছবি, প্রতিটি ঘটনা ঘিরে যে অনুভূতি তৈরি হয়েছিল- কিছুটা হলেও সেটা বোঝার চেষ্টা করি তাঁর কথার ভেতর দিয়ে। বুঝতে চেষ্টা করেছিলাম, শিশু, বৃদ্ধ, এবং নানান রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৫ লাখেরও বেশি, কোনো কোনো হিসাবে ২০ লাখের মতো মানুষ শুধু শরণার্থী শিবিরে মারা যায়- সেই সব মৃত্যুর চিত্র।

এক পর্যায়ে এসে ৪ ডিসেম্বর থেকে তিনি যে ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে বাংলাদেশে ঢুকেছিলেন সে প্রসঙ্গ আসে। বিশেষ করে যশোর ও খুলনায় তিনি যে জায়গাগুলোতে আক্রান্ত হয়েছিলেন, ওই জায়গাগুলোতে তাঁর যাওয়ার একটা ইচ্ছে ছিল সেটাই জানাচ্ছিলেন। সে সব কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “আসলে তোমাদের বাংলাদেশের যুদ্ধটা পৃথিবীর অন্যতম সংক্ষিপ্ত সময়ের বড় যুদ্ধ এবং বিজয়ী বাহিনীর দাপটের বিজয়ের একটা যুদ্ধ। এ সময়ে তিনি বার বার ইন্দিরা গান্ধী, মানেকশ ও জ্যাকবের কথা বলেন। তাঁর মাত্র কয়েকদিন আগেই ভারতে জেনারেল জ্যাকবের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তাই আলোচনা আবার জ্যাকবকে ঘিরেই হয়। তবে দ্রুতই সেখান থেকে রঘু রাই আবার ইন্দিরা গান্ধী প্রসঙ্গে আসেন। এবং তাঁর কথার মধ্য দিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর চরিত্রের অনেকগুলো দিক ফুটে ওঠে। তিনি তাঁর ছবির মাধ্যমেও বিশ্বখ্যাত এ নেত্রীর চরিত্রের নানা দিক ফুটিয়ে তুলেছেন।
যাহোক ওই দিন রাতেই রঘু রাইয়ের এক্সিবিশন নিয়ে একটা লেখা লিখি যার শিরোনাম ছিল, “ Bangladesh: ‘Price of Freedom’ : And An Exhibition of Raghu Rai”. লেখাটিতে একটি লাইন ছিল, “ There are thousands of books in Bangladesh that describe the nine-month freedom struggle but basically there is no book on this 10 million people’s horrifying life of that period.”
লেখাটি “ NIYOGI BOOKS” এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর বিকাশ ডি নিয়োগীর চোখে আসার পরে তিনি কুরিয়ারে আমাকে “ Bangladesh: The Price of Freedom” বইটি পাঠিয়ে দেন।

বইটির সঙ্গে তিনি যে চিঠিটি দেন, সেখানে তিনি উপরে উল্লিখিত আমার লেখার লাইনটি উল্লেখ করে লেখেন, রঘু রাইয়ের এই বইটি মনে হয় আমার চোখ এড়িয়ে গেছে। তাই তিনি আমাকে ওই বইটি পাঠাচ্ছেন।
বিকাশ ডি নিয়োগীকে আবারও ধন্যবাদ জানাই, তিনি ওই বইটি না পাঠালে বইয়ের মুখবন্ধ হিসেবে রঘু রাইয়ের লেখাটি পড়ার সুযোগ হতো না। ওই বইয়ের ভূমিকা যিনি লিখেছেন, তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭১, বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ এসব কিছুই স্বীকার করেন না। এবং তাঁর ওই ভূমিকা মূলত বইটিকে খাটো করেছে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকেও খাটো করেছে এমনকি, শরণার্থীদের দুর্দশা নিয়েও একটা পরিহাস আছে তাঁর বিষয় ও শব্দচয়নে। তাই ওইটুকু বাদ দিয়ে এই ছবির বইটি অসাধারণ দলিল।
তবে আমার কাছে নতুন ছিল রঘু রাইয়ের লেখাটি। এবং লেখার একটি লাইন, “ Indira Gandhi’s bold decision,” ( ইন্দিরা গান্ধীর দৃঢ় সিদ্ধান্ত)। তাঁর এই একটি লাইন পড়েই মনে হলো তিনি শুধু আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও শরণার্থীদের দুর্দশা নিয়ে ছবি তোলেননি। সঙ্গে সঙ্গে এও মনে হলো আসলে একজন লিজেন্ড ফটো সাংবাদিক যখন যে কোনো ছবি তোলেন তিনি ওই ঘটনার অনেক গভীরে চলে যান।

যে কারণে পরে রঘু রাইয়ের তোলা ইন্দিরা গান্ধীর ছবি ও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ছবি মিলিয়ে দেখি। আর তখনই মনে হয় রঘু রাই একটি লাইনে চরম সত্য বলেছেন, ইন্দিরা গান্ধীর দৃঢ়তা। রাজনীতি, কূটনীতিতে এই দৃঢ়তা মূলত খেলোয়াড়দের দমের মতো। যেমন ১৮০ মিনিট দম না থাকলে ৯০ মিনিটে সেই ফুটবল খেলা যায় না যে ফুটবলে জয় মিলবে। ১০ ওভার টানা বল না করার ক্ষমতা থাকলে এক ওভার ভালো বল করা যায় না। সব খেলায় মূল বিষয় দম।
রাজনীতি ও কূটনীতির মূল বিষয় এই “দম”। দ্রুত দম ফুরিয়ে গেলে, আশু সমাধান খুঁজলে – হিতে বিপরীত হয়। তবে এটাও সত্য পৃথিবীতে এই দম সব রাজনীতিবিদের থাকে না। আর এই দমের জন্যে রাষ্ট্র ছোট কি বড়, ধনী কি দরিদ্র তারও প্রয়োজন পড়ে না। যার প্রমাণ ইতিহাসে আছে। সে ইতিহাস রঘু রাইয়ের মৃত্যুকে স্মরণ করে এ লেখার প্রসঙ্গ নয়। তাছাড়া রঘু রাই লিজেন্ড- তাঁর ছবি নিয়ে লেখার যোগ্য আমি নই। তবে তাঁর বইয়ের মুখবন্ধে রঘু রাই ছোট লেখায় ইন্দিরা গান্ধীর সম্পর্কে “দৃঢ়তা” শব্দটি ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে তিনি যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ধাত্রীর চরিত্র ও নেতৃত্ব তাঁর ছবির মতোই প্রকাশ করেছেন এ জন্য তাঁকে যে কোনো বাঙালিই শ্রদ্ধা জানাবে। অর্থাৎ শব্দেও তিনি তাঁর ক্যামেরার লেন্সের থেকে কম নন।

ম্যাগনাম ফটোগ্রাফার রঘু রাইকে সারা পৃথিবী চেনে। তবে আমরা বাঙালিরা শুধু চিনি না, তাঁর সঙ্গে আমাদের ভালোবাসা ও দেশের জন্মের ইতিহাসের একটা যোগ রয়ে যাবে চিরকাল। বাঙালির প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে তিনি বেঁচে থাকবেন।
লেখকঃ সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.
স্বদেশ রায় 



















