১৯৭৮ সালে রুয়ান্ডার ভিরুঙ্গা পর্বতমালায় পাহাড়ি গরিলাদের সঙ্গে স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরোর ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত—বিশ্ব টেলিভিশনের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য। কিন্তু নতুন এক প্রামাণ্যচিত্রে জানা গেছে, সেই বিখ্যাত ফুটেজ প্রায় হারিয়েই যাচ্ছিল। বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সেটি আফ্রিকা থেকে বের করে আনতে হয়েছিল।
গরিলার চোখে চোখ রাখা
তখন অ্যাটেনবরোর বয়স ছিল ৫১। তিনি মাটিতে শুয়ে একটি মা গরিলা ও তার শাবকদের খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেন। সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, গরিলার সঙ্গে চোখে চোখ রাখার মধ্যে এমন এক বোঝাপড়া আছে, যা অন্য কোনো প্রাণীর ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। তিনি মনে করতেন, মানুষ ও গরিলা পৃথিবীকে প্রায় একইভাবে দেখে।
এই দৃশ্যটি ১৯৭৯ সালে বিবিসির ‘লাইফ অন আর্থ’ সিরিজে প্রচারিত হয় এবং বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ তা দেখেছিল।
বিপদের শুরু
নতুন প্রামাণ্যচিত্রে অ্যাটেনবরো তার ডায়েরি থেকে সেই ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন। কয়েক মাসের পরিকল্পনার পর দলটি রুয়ান্ডায় যায় সিরিজের শেষ দিকের শুটিং করতে। কিন্তু তারা বুঝতেই পারেনি কী ধরনের বিপদের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।

গরিলাদের ছবি ধারণ শেষে ফেরার পথে তাদের গাড়ি একটি সেনা চৌকিতে আটকে যায়। একজন সৈন্য তাদের থামানোর চেষ্টা করলে চালক গাড়ি না থামিয়ে এগিয়ে যান। তখন সৈন্যটি আকাশে গুলি ছোড়ে। কিছুক্ষণ পরই সশস্ত্র পাহারার মুখে পড়ে দলটি।
সন্দেহ ও জিজ্ঞাসাবাদ
সেনারা অভিযোগ তোলে, তাদের শুটিংয়ের অনুমতি নেই। এমনকি তারা মৃত গরিলার ছবি তুলেছে বলেও সন্দেহ করা হয়। এরপর তাদের পুলিশ সদর দপ্তরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
এই সময় ক্যামেরাম্যান মার্টিন সন্ডার্স দ্রুত একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ফিল্মের ক্যানগুলোর লেবেল বদলে দেন, যাতে গরিলার ফুটেজ থাকা ক্যানগুলোকে ব্যবহৃত নয় বলে মনে হয়। এতে করে গুরুত্বপূর্ণ ফুটেজটি বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়।
আটক অবস্থার আতঙ্ক
দলটিকে এক রাত হোটেলে আটকে রাখা হয়। পরে অ্যাটেনবরো ও প্রযোজক জন স্পার্কসকে কিগালির একটি সামরিক ঘাঁটিতে নিয়ে গিয়ে রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, তারা ভেবেছিলেন হয়তো তাদের গুলি করে মারা হবে।
শেষ পর্যন্ত তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বিমানে ওঠার পরই তারা কিছুটা স্বস্তি অনুভব করেন।

প্রায় হারিয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক দৃশ্য
শুধু নিরাপত্তা ঝুঁকি নয়, আরেকটি সমস্যাও ছিল—ফিল্মের স্বল্পতা। দলটি আশঙ্কা করছিল, বেশি শুটিং করলে ফিল্ম শেষ হয়ে যেতে পারে। ফলে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি পুরোপুরি ধারণ নাও করা হতে পারত।
অ্যাটেনবরো যখন প্রায় ১৫ মিনিটের অভিজ্ঞতা শেষে ফিরে আসেন, তখন জানতে পারেন খুব অল্প অংশই ধারণ করা গেছে। তবুও তিনি এটিকে তার জীবনের অন্যতম মূল্যবান অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
জীবনের মোড় ঘোরানো সিদ্ধান্ত
এই সিরিজ অ্যাটেনবরোকে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় প্রাকৃতিক ইতিহাস উপস্থাপক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। যদিও তিনি বিবিসির সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
পরে তিনি বলেন, প্রশাসনিক দায়িত্ব তার জন্য উপযুক্ত ছিল না। তার দক্ষতা ছিল প্রকৃতি ও প্রাণিজগত নিয়ে কাজ করার মধ্যেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















