ইরান যুদ্ধের ভেতর দিয়ে পৃথিবীর ট্রাডিশনাল সামরিক শক্তির ধারণা যেমন বদলে গেছে, এর সঙ্গে সঙ্গে আরও কিছু বিষয় স্পষ্ট হয়েছে বা ভিন্নভাবে চিন্তার পথ খুলে দিয়েছে। এতদিন বিভিন্ন দেশের যে অর্থনৈতিক সক্ষমতার কথা নানাভাবে বলা হচ্ছিল, সে হিসেবও যে অনেকখানি ফাঁকা তা প্রমাণ হয়ে গেছে। তেমনি বদলে গেছে পৃথিবীব্যাপী যে সামরিক, অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক জোট গঠিত হয়েছে সেগুলোর ভবিষ্যৎ ও কার্যকারিতা নিয়ে।
যেমন ইরান যুদ্ধের ভেতর দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে, আসিয়ান চীনের ছায়ায় থাকলেও চীনের জ্বালানি সক্ষমতা, বাণিজ্যিক কৌশল চীনের নিজস্ব স্বার্থে। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো চীনের ওই সুবিধার ভাগ পাবে না। তাদেরকে শেষ বিচারে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।
আসিয়ান জোটভুক্ত দেশগুলোর বড় কোনো সামরিক, অর্থনৈতিক সংকটে এ জোট কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না। বর্তমানে আমেরিকার ইরান আক্রমণের ফলে যে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো, এ সংকট প্রতিটি দেশকে আলাদাভাবে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। জোট তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।
অন্যদিকে আমেরিকা ইরান আক্রমণ করার এক বছর আগে ইরান ব্রিকসের সদস্য হয়েছে। অথচ ইরান যুদ্ধে ব্রিকসের কোনো ভূমিকা নেই। ভূমিকা রাখার সুযোগও নেই।
একই অবস্থা ন্যাটোর। এই জোটের সদস্যরা ইউক্রেন যুদ্ধেও যেমন এক হয়ে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি, তেমনি ইরান যুদ্ধেও কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। ভূমিকা রাখার সমর্থ যেমন নেই, তেমনি বাস্তবতাও নেই।
অন্যদিকে আরেকটি বিষয় এ মুহূর্তে সামনে এসেছে যে কোনো জোটে পৃথিবীতে বড় জনমতের কাছে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব নেই। কেউ কেউ বলছেন, আজ যদি জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের শুরুর দিকের ওই মাপের নেতারা থাকতেন— যেমন ভারতের জওহরলাল নেহরু, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণ, মিশরের গামাল আব্দুল নাসের— তাহলে হয়তো যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া ও সে লক্ষ্যে সফল হওয়া সম্ভব হতো। পৃথিবীর জনমতের কাছে ওই মাপের নেতাদের তেমনি সেই মাপের গ্রহণযোগ্যতা ছিল। তবে বর্তমান সময় ও পরিস্থিতিতে তাদের মাপের নেতা থাকলেও কী হতো, তা ভেবে কোনো লাভ নেই। তাছাড়া পৃথিবীর বাস্তবতাও বদলে গেছে।
অন্যদিকে কোনো জোট তৈরি না করেও অনেকগুলো গালফ স্টেট আমেরিকার সামরিক ছায়ায় এতদিন নিজেদেরকে নিরাপদ মনে করেছিল। ইরান যুদ্ধের ভেতর প্রমাণিত হয়ে গেছে— যুদ্ধ যে প্রযুক্তিতে চলে গেছে, সেখানে নিরাপত্তার বিষয়টি বেশ জটিল; বড় কোনো দেশের সামরিক ঘাঁটি আর নিরাপত্তার জন্য বিশেষ কিছু নয়। বরং ওই গালফ স্টেটগুলোর মতো বিপদ ডেকে আনতে পারে।

এমনকি ট্রাডিশনাল প্রতিরক্ষায় বা আক্রমণে সুবিধার জন্য বাফার স্টেট বা বাফার জোন তৈরির যে সুবিধা পাওয়া যেত— দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং সর্বশেষ ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে এই বাফার স্টেট বা বাফার জোনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তাও শেষ হয়ে গেছে।
অন্যদিকে দুই মাসেরও কম সময়ের ইরান যুদ্ধে প্রমাণ করেছে, পৃথিবীতে সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকটে নিজেকে সামাল দেওয়ার মতো দেশই খুবই কম আছে।
এ রকম একটা সময়ে ৫০ বছর আগের চিন্তায় তৈরি হওয়া দক্ষিণ এশিয়া— প্রথমে সাত দেশ, পরে আফগানিস্তানকে নিয়ে আট দেশের এই সার্ক জোটের গুরুত্ব আর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু আছে বা আদৌ আছে কি?
প্রথমত এই জোটের আটটি দেশের একে অপরের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বলতে যা বোঝায়, তা কারো সঙ্গে কারো নেই। তাই যেখানে আটটি দেশের কারো সঙ্গেই কারো কোনো ভালো সম্পর্ক নেই— সেখানে সে দেশগুলো নিয়ে একটি জোট কীভাবে কার্যকর হবে? তাছাড়া এই আটটি দেশের ছয়টি দেশে বিভিন্ন নামে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। কোনো দেশে যখন ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি সামনে চলে আসে— সে সময়ে ওই দেশের লিবারেল মিডল ক্লাস বিপন্ন থাকে। আর যতই বলা হোক জনগণই সব, এক ব্যক্তি এক ভোটই গণতন্ত্রের মূল শক্তি— বাস্তবে আধুনিক রাষ্ট্র ধারণার মূল ভিত্তিই লিবারেল মিডল ক্লাস। তাই এই জোটের বেশিরভাগ রাষ্ট্রই এখন নিজ দেশের মানুষকে নিয়ে ওইভাবে সুসংগঠিত নয়। বরং অনেকেই বিভক্ত জনগোষ্ঠীর সমস্যায় ভুগছে।

এর পরেই আসে জোটের দুই পারমাণবিক শক্তির দেশ ভারত ও পাকিস্তানের ভেতরের সম্পর্কের বিষয়টি। সম্পর্ক শুধু খারাপ তা নয়— এই দুই দেশের সম্পর্ক নিকট ভবিষ্যতে ভালো হওয়ার নয়। পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তিকে ভারত শুধু নয়, পৃথিবীর অনেক দেশই মনে করে— এটি একটি বিপজ্জনক বিষয়। কারণ যে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক শক্তি ও সিভিল প্রশাসন দুর্বল এবং রাষ্ট্র নিজেই আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেয়— এমন একটি রাষ্ট্রের হাতে পারমাণবিক শক্তি পৃথিবীর যে কোনো দেশের জন্য হুমকি।
এরপর ভারতে পহেলগাম জঙ্গি হামলা ও তার প্রতিবাদে ভারতের অপারেশন সিঁদুরের ভেতর দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে— ন্যাটো এবং ওয়ারশ ক্লাবের বাইরে যে আধুনিক সমরাস্ত্র তৈরি হয়েছে— পাকিস্তানের হাতে সে সমরাস্ত্রও আছে। তাই ওই অপারেশনের পরের বাস্তবতা হলো, কেউ প্রকাশ করুক আর না করুক— দুই দেশের নিজস্ব অস্ত্র সম্ভার আধুনিকায়ন ও আকার বৃদ্ধির একটি প্রতিযোগিতা গোপনে হলেও চলবে। দেশ দুটি যখন এ ধরনের একটি প্রতিযোগিতায়— সে সময়ে বন্ধুত্বের বিষয়টি চিন্তা করার খুব কোনো যৌক্তিকতা নেই।
অন্যদিকে পাকিস্তানের খনিজ, সমুদ্র ও বন্দর সম্পদ এখন দুটি বড় শক্তির পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের দিকে ক্রমেই এগিয়ে চলেছে। যখন কোনো দেশ এমন একটি অধ্যায়ের মধ্যে ঢুকে যায়, তখন স্বাভাবিকই ওই দেশ একটি ট্রানজিশনাল পিরিয়ডে চলে গেছে— এটাই ধরে নিতে হয়। যেমন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যখন সেন্টো প্যাক্টে যোগদান করেন, সে সময়ে মৌলানা ভাসানী এর বিরোধিতা করেছিলেন। কারণ অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি বুঝেছিলেন, এই প্যাক্টে ঢুকে যাওয়ার অর্থই হলো পাকিস্তান বড় শক্তির খেলনা হতে যাচ্ছে। ঢুকে যাচ্ছে একটি ট্রানজিশনাল পিরিয়ডে।
ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, শেখ মুজিবুর রহমান ওই সময় থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলেন। মৌলানা ভাসানী আইয়ুব খানকে কোনো ডিস্টার্ব না করার নীতি নিয়েও ’৬৯ এসে স্পষ্ট বোঝেন— একক পাকিস্তানের দিন শেষ। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে সহযোগিতা করেন।

যে কোনো দেশ ট্রানজিশনাল পিরিয়ডে চলে গেলে তার পরবর্তী যা হয়, সেটাই হয়েছিল। তরুণ হলেও রাজনীতিতে অনেক পরিপক্ব শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের এই ভঙ্গুর সময়ের সুযোগ নিয়েছিলেন তাঁর দেশ ও মানুষের জন্য একজন দেশপ্রেমিক হিসেবে।
১৯৫৫ সালে সেন্টো প্যাক্টে যোগ দেওয়ার পরে মনে হয়েছিল পাকিস্তান অনেক বেশি বিশ্বমঞ্চে এগিয়ে গেছে। কিন্তু ১৯৫৫ থেকে ১৯৭১— মাত্র ১৬ বছরের মধ্যে পাকিস্তানের যা ঘটার, তা ঘটে যায়। এখন পাকিস্তান ১৯৫৫ থেকে ১৯৭১-এর মধ্যবর্তী সময়ের মতো একটি সময় পার করছে। ভবিষ্যৎ কেউ বলতে পারে না। তবে ঘটনাপ্রবাহ পাকিস্তানকে খনিজ সম্পদ হারানোর দিকে এবং “বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ স্মুথ” হওয়ার দিকেই নিয়ে যাচ্ছে। তাই এ সময়ে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের বন্ধুত্ব হবে না। ঘটনাপ্রবাহ সেদিকে যাবে না। আর ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নয়ন ছাড়া সার্কের কার্যকারিতা চিন্তা করা সম্ভব নয়।
আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো— পাকিস্তান গত দুই বছর যাবৎ বাংলাদেশের সঙ্গে যখন কথা বলে, তখনই কেবল সার্ক পুনরুজ্জীবনের কথা বলে। তাছাড়া তাদের মিডিয়াতে সার্ক নিয়ে তেমন কোনো সাড়া নেই। বাংলাদেশের সঙ্গে সার্ক নিয়ে কথা বলার বাস্তব অর্থ— ভারত যেহেতু এ মুহূর্তে সার্ক সচল চায় না, তাই বাংলাদেশে এসে সার্কের কথা বলে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী রাজনীতিকে আরও উসকে দেওয়ার একটি কূটনীতি মাত্র।
ভারত ও পাকিস্তান যেখানে সার্ক নিয়ে এ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, অন্যদিকে বর্তমানে আফগানিস্তান ওই অর্থে কোনো দেশ নয়। আফগানিস্তানের প্রকৃত জনগণ নীরবে একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ কামনা করছে— তবে সেটা তাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে। তাছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের বর্তমান এক ধরনের যুদ্ধ এবং ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যতের ভেতরও অনেকখানি নির্ভর করছে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ।

অন্যদিকে সার্ক নিয়ে বাংলাদেশের তৎপরতা থাকলেও বাংলাদেশের সরকার একটি নন-ইনক্লুসিভ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এসেছে। আবার নেপালও তথাকথিত জেন-জি সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটিয়ে দেশের রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল করে “র্যাপার প্রধানমন্ত্রীর” দেশ তৈরি করেছে। বাইরের শক্তির সমর্থনে তৈরি হওয়া এই ধরনের “র্যাপার প্রধানমন্ত্রীরা” যেমন নিজের দেশ চালাতে সমর্থ হয় না, তেমনি দেশে প্রকৃত রাজনৈতিক শক্তিও গড়ে তোলার পরিবেশ তৈরি করে না। সেই শিক্ষা ও রাজনৈতিক দক্ষতা তাদের থাকে না। তারা বরং দেশকে আরেকটি সংকটের দিকে ঠেলে দেয়।
দক্ষিণ এশিয়ার এই বাস্তবতায়— এ মুহূর্তে আর যাই হোক, সার্ক পুনরুজ্জীবনের কোনো সম্ভাবনা দেখা যায় না। তাছাড়া ইরান যুদ্ধের মধ্য দিয়ে কোনো জোটই আসলে প্রয়োজনীয় কিনা, সে প্রশ্ন সকলের সামনে এসেছে।
এ বাস্তবতায় এই অর্থনৈতিক-সামাজিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগের জোট গঠনের বা পুনরুজ্জীবনের আগে জোটের সদস্যদের একটা দীর্ঘ প্রস্তুতির দরকার হয়। ওই প্রস্তুতি ও পরিবেশ তৈরির আগে জোট তৈরি করলে তা সঠিক অর্থে কার্যকর হয় না বা শেষ অবধি টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লী কুয়ান অনেক স্পষ্ট করেই এটা বলেছিলেন। তাঁর মত ছিল, আসিয়ান গঠিত হয়েছে প্রস্তুতি ছাড়া— তাই ওই অর্থে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো জোটের মাধ্যমে লাভবান হবে না। তেমনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠিত হয়েছে প্রস্তুতি ছাড়া— এবং তারা অনেক বেশি দূর চলে যেতে যাচ্ছে। তারা যা চাচ্ছে, সেই ঐক্য তাদের মধ্যে নেই। তাই তারা ব্যর্থ হবে এক পর্যায়ে।

লী কুয়ান যে সঠিক ছিলেন, তার প্রমাণ অনেকটাই এখন পাওয়া যাচ্ছে। ইরান যুদ্ধের আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ভেঙে ব্রিটেন বেরিয়ে গেছে। ইরান যুদ্ধের ভেতর আসিয়ানেরও অর্থনীতি, রাজনীতি, নিরাপত্তাসহ সব কিছুর জন্য বাড়তি কিছু সত্য বের হয়ে এসেছে। এমনকি অনেক গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে কোয়াড ও ব্রিকস। এগুলোকে অস্বীকার করলে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত সঠিক নাও হতে পারে।
তাই এমন একটি ভবিষ্যতের আশঙ্কা ও বর্তমানের এই নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে পৃথিবীতে মত, পথে ভিন্নতায় ভরা দেশগুলো যতই এক এলাকার হোক না কেন, তাদেরকে নিয়ে পুরোনো চিন্তার এই জোট কি আদৌ কার্যকর করা সম্ভব? এ কারণে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে আলোচনা করা কি শুধুই রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় ও একটি ভালো লাঞ্চ-ডিনারের স্বাদ পাওয়ার বাইরে কিছু বয়ে আনে?
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।
স্বদেশ রায় 



















