ভারতের মহারাষ্ট্রের ওয়ারলি জনগোষ্ঠীর এক অনন্য শিল্পী জীব্যা সোমা মাশে, যিনি প্রথাগত গৃহস্থালির দেওয়ালে আঁকা শিল্পকে বিশ্বমানের সমকালীন শিল্পে রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর জীবন ও শিল্পকে ঘিরে ফরাসি শিল্পসমালোচক ও কিউরেটর হার্ভে পারদ্রিওল একটি বই প্রকাশ করেছেন, যেখানে উঠে এসেছে এক দীর্ঘ বন্ধুত্ব, শিল্পচর্চা এবং এক অনন্য জীবনদর্শনের গল্প।
ওয়ারলি শিল্পের নতুন দিগন্ত
ওয়ারলি চিত্রকলার মূল শিকড় গ্রামীণ জীবনে। সাধারণত মাটি দিয়ে তৈরি দেয়ালে চালের গুঁড়া দিয়ে আঁকা হতো এই শিল্প। কিন্তু জীব্যা সোমা মাশে এই শিল্পকে ক্যানভাস ও কাগজে নিয়ে আসেন, তবুও এর স্বাভাবিকতা ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সংযোগ অক্ষুণ্ণ রাখেন। তাঁর কাজে দেখা যায় মানুষের জীবন, পশুপাখি, কৃষিকাজ এবং ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের দৃশ্য, যা সরলতার মধ্যেও গভীর অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

শিল্প আর জীবনের একাত্মতা
মাশের শিল্পচর্চা ছিল তাঁর জীবনেরই অংশ। তিনি যেমন মাঠে কাজ করতেন, তেমনি আঁকতেনও। এই দ্বৈত জীবনই তাঁর শিল্পকে দিয়েছে এক বিশেষ গভীরতা। তাঁর কাজের পুনরাবৃত্তিমূলক নকশা—বিশেষ করে মাছ ধরার জালের মতো সূক্ষ্ম বৃত্তের ব্যবহার—তাঁর ধ্যানমগ্ন মনোভাবকে প্রকাশ করে। প্রতিটি রেখা যেন একেকটি গল্প, যা সময় ও জীবনের ধারাবাহিকতাকে তুলে ধরে।
বন্ধুত্ব থেকে বই
১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে হার্ভে পারদ্রিওলের সঙ্গে মাশের প্রথম পরিচয়। ভাষাগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর সম্পর্ক। বহু বছর ধরে পারদ্রিওল মাশের গ্রামে গিয়ে তাঁর জীবনযাপন ও শিল্পচর্চা পর্যবেক্ষণ করেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তৈরি হয়েছে এই বই, যেখানে রয়েছে বিরল ছবি ও ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ।
প্রকাশনার পেছনের গল্প

এই বইটি তৈরি হতে সময় লেগেছে প্রায় দুই দশক। যদিও মাশের জীবদ্দশায় বইটি প্রকাশ করার ইচ্ছা ছিল, অর্থের অভাবে তা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে বিভিন্ন শিল্পসংগ্রাহক ও প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় বইটি প্রকাশিত হয়। এতে মাশের শিল্পের সূক্ষ্মতা ও গভীরতা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
সমকালীন শিল্পে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
পারদ্রিওলের মতে, এই বই পাঠকদের মাশের শিল্পকে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করবে। একই সঙ্গে এটি সমকালীন শিল্পের ধারণাকে বিস্তৃত করবে, যেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিল্পও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায়।
মাশের উত্তরাধিকার
জীব্যা সোমা মাশে ১৯৭৬ সালে জাতীয় পুরস্কার এবং ২০১১ সালে পদ্মশ্রী লাভ করেন। ২০১৮ সালে তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁর শিল্প আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং অনুপ্রেরণাদায়ক। তাঁর কাজ প্রমাণ করে, সরলতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে অসাধারণ গভীরতা।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















