০৩:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
নীলফামারীতে শিয়ালের হামলা: মাঠে কাজ করতে গিয়ে বৃদ্ধসহ আহত ৭, আতঙ্কে গ্রামবাসী হাওরে ত্রিমুখী সংকট: পানি, ঝড় আর শ্রমিকের চাপে ধান হারানোর শঙ্কায় কৃষক খালি পেটে ৪ ঘরোয়া পানীয়, ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সহজ অভ্যাস বিশ্বকাপের আগে দুঃসংবাদ: অস্ত্রোপচারের টেবিলে মদ্রিচ, অনিশ্চয়তায় ক্রোয়েশিয়ার পরিকল্পনা রূপপুরে ইউরেনিয়াম লোডিং শুরু, পারমাণবিক যুগে বাংলাদেশের বড় পদক্ষেপ গার্হস্থ্য নির্যাতনের শিকারদের আত্মহত্যা বাড়ছে, উদ্বেগে বিশেষজ্ঞরা তনু হত্যা মামলায় নতুন মোড়, দেশত্যাগের গুঞ্জনে যা বললেন ডা. কামদা প্রসাদ ইরানের প্রস্তাবে অসন্তুষ্ট ট্রাম্প, শান্তি আলোচনা অনিশ্চয়তায় তিন নম্বরে ব্যাটিংই পছন্দ শান্তর, কঠিন সময় পেরিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্প      দক্ষিণ সুদানে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা, পাইলটসহ ১৪ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু

স্বাধীনতার মূল্য

  • রঘু রাই
  • ০৬:২৩:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
  • 37

চল্লিশ বছরেরও বেশি আগে খবর পেলামপূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থীদের ঢল দ্রুত বাড়ছে এবং তা একপ্রকার গণপলায়নের রূপ নিচ্ছে। আমি ব্যাগ গুছিয়ে সকালে ফ্লাইটে কলকাতায় পৌঁছালাম এবং সোজা যশোর রোড ধরে সেই সীমান্তের দিকে রওনা দিলামযা আজকের বাংলাদেশ নামে পরিচিত।

সময়টা ছিল আগস্ট মাসবর্ষা তখন তুঙ্গে। আকাশ ছিল গভীর ধূসরটানা বৃষ্টি হচ্ছিল। সীমান্ত শুধু অরক্ষিতই ছিল নাচারদিক দিয়ে উপচে পড়ছিল মানুষ। শরণার্থীরা তাদের সামান্য সম্বল নিয়ে ভিড় করছিল। খুব কম মানুষের কাছে গরুর গাড়ি ছিলবৃষ্টিতে ভিজেক্লান্ত ও বিপর্যস্ত তারা এগিয়ে আসছিল। এক ধরনের নিস্তব্ধতা ছিলকেউ কথা বলছিল না। কারণযা ঘটছে তা সবারই জানা। এটি ছিল এক অভিন্ন জাতীয় বিপর্যয়।

ভারতের দিকের ছোট গ্রাম বাঙ্গাঁও এত মানুষের চাপ সামাল দিতে পারছিল না। হাজার হাজার শরণার্থী শুধু খাবার ও কাপড় নয়মাথা গোঁজার ঠাঁইও চাইছিল। ভারত এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল না। অনেকেই নর্দমার পাইপে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল।

বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের জন্য পথটা যেন আরও দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। শিবির তখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনিভবিষ্যৎ ছিল অনিশ্চিত। আবেগের অভিঘাত ছিল অসহনীয়। এক বৃদ্ধাযিনি শোকে পাথর হয়ে গিয়েছেনএক শিশু খাবারের জন্য চিৎকার করছেচোখ ভরা জল। কয়েকদিন ধরে তার মা তিন বছরের ছেলেকে নিয়ে বসে আছে তার দিকে তাকাতেই, ব্যথিত মুখে আমাকে জিজ্ঞেস করল—“কেন?”

কিন্তু এটি ছিল মাত্র শুরুসোনার বাংলার মানুষের ওপর নেমে আসা এক ভয়াবহ গণহত্যার। পূর্ব পাকিস্তানযা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে হাজার মাইল দূরে ছিলসেখানে মুসলমান বাঙালিরা সাংস্কৃতিকভাবে ভারতের বাঙালিদের কাছাকাছি হলেও রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বারা।

ভারত স্বাধীনতা পাওয়ার সময় ব্রিটিশরা ধর্মের ভিত্তিতে দেশকে ভাগ করে দেয়ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রে। ভৌগোলিক কারণে পাঞ্জাব ও বাংলাএই দুই বৃহৎ অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা বেশি ছিল। পশ্চিম পাঞ্জাব ও বালুচিস্তানের একাংশ পাকিস্তান হয়। অপরদিকেদক্ষিণ বাংলার একাংশ হয় পূর্ব পাকিস্তানযা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে বিচ্ছিন্ন ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষ ছিল বাংলাভাষী মুসলমানযারা সংস্কৃতিগতভাবে ভারতের বাঙালিদের কাছাকাছি হলেও রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চস্বায়ত্তশাসনের আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতা শুরু হয়। নয় মাসের দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় বাংলাদেশ।

এই সময়ের নৃশংসতার কাহিনি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনার মধ্যে পড়ে। হাজার হাজার নারী ধর্ষণের শিকার হনঅসংখ্য শিশু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। একটি পুরো প্রজন্ম যেন নির্মমভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়।

পাকিস্তানি সেনাদের দ্বারা নির্যাতিত তরুণীরা জীবন্ত মৃতের মতো হেঁটে বেড়াচ্ছিলঅনেককে বাঙ্কারে আটকে রেখে তাদের দিয়ে রান্না ও সেবা করানো হতো। তারা এতটাই ক্লান্ত ছিল যে এগিয়ে যাওয়ার শক্তিও ছিল না। তবুও একজন নারী তার শিশুকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলভয়েআতঙ্কে।

প্রায় এক কোটি বাঙালি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয়। অন্তত ২০ লাখ মানুষ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে প্রাণ হারায়এক উন্মত্ত প্রতিশোধস্পৃহায়। অথচ এই সেনাবাহিনীর কাছেই তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ তুলে দিয়েছিল।

১৯৬৯ সালে এক নিবেদিত বাঙালি নেতাশেখ মুজিবুর রহমানতার জনগণকে একটি নতুন সূচনা ও স্বতন্ত্র পরিচয়ের স্বপ্ন দেখানবাংলাদেশ। পাকিস্তানি জেনারেলরা বিদ্রোহের আভাস পান। মুজিবুর রহমান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে অনুরোধ করেনপাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই বাঙালিদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ দিতে। তিনি সরাসরি অস্বীকার করেননিকিন্তু সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেন—“যেকোনো মূল্যে বিদ্রোহ দমন করো।

পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের প্রতি এই অমানবিক আচরণ বিশ্বকে নাড়া দেয়। ভারত তখন প্রতিবেশী হিসেবে এই মানবিক বিপর্যয়ের ভার বহন করছিলঅপর পাশ থেকে নির্যাতিতক্ষতবিক্ষত মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে আসছিল।

১৯৭১ সালের এপ্রিলেই ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেট থেকে ওয়াশিংটনে একটি গোপন বার্তা পাঠানো হয়যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানানো হয়। সেখানে বলা হয়এই নীতি নৈতিক ও জাতীয় স্বার্থদুটোরই পরিপন্থী। গণতন্ত্র দমননির্যাতন ও হত্যার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কোনো দৃঢ় অবস্থান নেয়নিবরং পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের তুষ্ট রাখতে ব্যস্ত ছিল। এটিকে অনেকেই নৈতিক দেউলিয়াত্ব হিসেবে দেখবেযখন সোভিয়েত ইউনিয়নও গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।

বাংলাদেশের ভেতরে তরুণরা দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়। মুক্তিবাহিনী ছিল রিকশাবাস কিংবা পায়ে হেঁটে চলা যোদ্ধাদের দলযাদের অস্ত্র ছিল পুরনোশত্রুপক্ষের তুলনায় দুর্বল। তবুও তারা লড়াই চালিয়ে যায়। পরে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে পরিস্থিতির গভীরতা উপলব্ধি করেন। এই শিবিরগুলো ভারতের অর্থনীতির ওপর বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে বিশ্ব তখনও পুরো পরিস্থিতির সত্যতা বিশ্বাস করতে চাইছিল না।

৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতের সীমান্তবর্তী কয়েকটি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়। শুরু হয় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ। ৪ ডিসেম্বর জেনারেল মানেকশ ভারতীয় সেনাবাহিনীকে আক্রমণের নির্দেশ দেন।

আমি প্রথম আক্রমণকারী বাহিনীর সঙ্গে যশোর রোড ধরে খুলনার দিকে অগ্রসর হই। প্রথম ৪০-৪৫ কিলোমিটার পথ তুলনামূলক সহজ ছিলকিন্তু খুলনার কাছাকাছি পৌঁছাতেই গোলাবর্ষণ শুরু হয়। শত্রুপক্ষ ওয়্যারলেসের মাধ্যমে তথ্য পেয়ে আমাদের অবস্থান নির্ধারণ করছিল। আমরা হামলার মুখে পড়িখোলা জায়গায় থাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটে। আমি আহত সৈন্যদের ছবি তুলছিলামকিন্তু বুঝতে পারছিলামপরবর্তী শিকার আমরাও হতে পারি।

আমাকে নিরাপদ স্থানে যেতে বলা হয়। আমরা আধা কিলোমিটার দৌড়ে একটি চায়ের দোকানে আশ্রয় নিই। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলামহঠাৎ একটি গুলি আমার পাশ দিয়ে ছুটে যায়। মাটিতে শুয়ে পড়তেই আরেকটি গুলি বেরিয়ে যায়। দোকানদার জানায়পাকিস্তানি সেনারা রেললাইনের ওপারেমাত্র আধা কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে।

 

এই যুদ্ধ ইতিহাসের অন্যতম স্বল্পসময়ের মধ্যে সমাপ্ত হওয়া যুদ্ধগুলোর একটি। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১মাত্র ১২ দিনের মাথায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করে।

আমি সেনা হেলিকপ্টারে ঢাকায় পৌঁছাইদেখি বিজয়ের উল্লাস এবং পরাজয়ের অপমান একসঙ্গে। ইন্দিরা গান্ধীর দৃঢ় সিদ্ধান্তজেনারেল মানেকশর কৌশল এবং জেনারেল জ্যাকবের পরিকল্পনাসব মিলিয়ে শেষ হয় নয় মাসের দুঃস্বপ্ননির্যাতনধর্ষণ ও অমানবিকতার অধ্যায়।

এটাই ছিল স্বাধীনতার মূল্যরক্তযন্ত্রণা আর অসীম ত্যাগ।

নীলফামারীতে শিয়ালের হামলা: মাঠে কাজ করতে গিয়ে বৃদ্ধসহ আহত ৭, আতঙ্কে গ্রামবাসী

স্বাধীনতার মূল্য

০৬:২৩:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬

চল্লিশ বছরেরও বেশি আগে খবর পেলামপূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থীদের ঢল দ্রুত বাড়ছে এবং তা একপ্রকার গণপলায়নের রূপ নিচ্ছে। আমি ব্যাগ গুছিয়ে সকালে ফ্লাইটে কলকাতায় পৌঁছালাম এবং সোজা যশোর রোড ধরে সেই সীমান্তের দিকে রওনা দিলামযা আজকের বাংলাদেশ নামে পরিচিত।

সময়টা ছিল আগস্ট মাসবর্ষা তখন তুঙ্গে। আকাশ ছিল গভীর ধূসরটানা বৃষ্টি হচ্ছিল। সীমান্ত শুধু অরক্ষিতই ছিল নাচারদিক দিয়ে উপচে পড়ছিল মানুষ। শরণার্থীরা তাদের সামান্য সম্বল নিয়ে ভিড় করছিল। খুব কম মানুষের কাছে গরুর গাড়ি ছিলবৃষ্টিতে ভিজেক্লান্ত ও বিপর্যস্ত তারা এগিয়ে আসছিল। এক ধরনের নিস্তব্ধতা ছিলকেউ কথা বলছিল না। কারণযা ঘটছে তা সবারই জানা। এটি ছিল এক অভিন্ন জাতীয় বিপর্যয়।

ভারতের দিকের ছোট গ্রাম বাঙ্গাঁও এত মানুষের চাপ সামাল দিতে পারছিল না। হাজার হাজার শরণার্থী শুধু খাবার ও কাপড় নয়মাথা গোঁজার ঠাঁইও চাইছিল। ভারত এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল না। অনেকেই নর্দমার পাইপে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল।

বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের জন্য পথটা যেন আরও দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। শিবির তখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনিভবিষ্যৎ ছিল অনিশ্চিত। আবেগের অভিঘাত ছিল অসহনীয়। এক বৃদ্ধাযিনি শোকে পাথর হয়ে গিয়েছেনএক শিশু খাবারের জন্য চিৎকার করছেচোখ ভরা জল। কয়েকদিন ধরে তার মা তিন বছরের ছেলেকে নিয়ে বসে আছে তার দিকে তাকাতেই, ব্যথিত মুখে আমাকে জিজ্ঞেস করল—“কেন?”

কিন্তু এটি ছিল মাত্র শুরুসোনার বাংলার মানুষের ওপর নেমে আসা এক ভয়াবহ গণহত্যার। পূর্ব পাকিস্তানযা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে হাজার মাইল দূরে ছিলসেখানে মুসলমান বাঙালিরা সাংস্কৃতিকভাবে ভারতের বাঙালিদের কাছাকাছি হলেও রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বারা।

ভারত স্বাধীনতা পাওয়ার সময় ব্রিটিশরা ধর্মের ভিত্তিতে দেশকে ভাগ করে দেয়ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রে। ভৌগোলিক কারণে পাঞ্জাব ও বাংলাএই দুই বৃহৎ অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা বেশি ছিল। পশ্চিম পাঞ্জাব ও বালুচিস্তানের একাংশ পাকিস্তান হয়। অপরদিকেদক্ষিণ বাংলার একাংশ হয় পূর্ব পাকিস্তানযা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে বিচ্ছিন্ন ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষ ছিল বাংলাভাষী মুসলমানযারা সংস্কৃতিগতভাবে ভারতের বাঙালিদের কাছাকাছি হলেও রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চস্বায়ত্তশাসনের আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতা শুরু হয়। নয় মাসের দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় বাংলাদেশ।

এই সময়ের নৃশংসতার কাহিনি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনার মধ্যে পড়ে। হাজার হাজার নারী ধর্ষণের শিকার হনঅসংখ্য শিশু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। একটি পুরো প্রজন্ম যেন নির্মমভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়।

পাকিস্তানি সেনাদের দ্বারা নির্যাতিত তরুণীরা জীবন্ত মৃতের মতো হেঁটে বেড়াচ্ছিলঅনেককে বাঙ্কারে আটকে রেখে তাদের দিয়ে রান্না ও সেবা করানো হতো। তারা এতটাই ক্লান্ত ছিল যে এগিয়ে যাওয়ার শক্তিও ছিল না। তবুও একজন নারী তার শিশুকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলভয়েআতঙ্কে।

প্রায় এক কোটি বাঙালি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয়। অন্তত ২০ লাখ মানুষ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে প্রাণ হারায়এক উন্মত্ত প্রতিশোধস্পৃহায়। অথচ এই সেনাবাহিনীর কাছেই তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ তুলে দিয়েছিল।

১৯৬৯ সালে এক নিবেদিত বাঙালি নেতাশেখ মুজিবুর রহমানতার জনগণকে একটি নতুন সূচনা ও স্বতন্ত্র পরিচয়ের স্বপ্ন দেখানবাংলাদেশ। পাকিস্তানি জেনারেলরা বিদ্রোহের আভাস পান। মুজিবুর রহমান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে অনুরোধ করেনপাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই বাঙালিদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ দিতে। তিনি সরাসরি অস্বীকার করেননিকিন্তু সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেন—“যেকোনো মূল্যে বিদ্রোহ দমন করো।

পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের প্রতি এই অমানবিক আচরণ বিশ্বকে নাড়া দেয়। ভারত তখন প্রতিবেশী হিসেবে এই মানবিক বিপর্যয়ের ভার বহন করছিলঅপর পাশ থেকে নির্যাতিতক্ষতবিক্ষত মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে আসছিল।

১৯৭১ সালের এপ্রিলেই ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেট থেকে ওয়াশিংটনে একটি গোপন বার্তা পাঠানো হয়যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানানো হয়। সেখানে বলা হয়এই নীতি নৈতিক ও জাতীয় স্বার্থদুটোরই পরিপন্থী। গণতন্ত্র দমননির্যাতন ও হত্যার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কোনো দৃঢ় অবস্থান নেয়নিবরং পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের তুষ্ট রাখতে ব্যস্ত ছিল। এটিকে অনেকেই নৈতিক দেউলিয়াত্ব হিসেবে দেখবেযখন সোভিয়েত ইউনিয়নও গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।

বাংলাদেশের ভেতরে তরুণরা দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়। মুক্তিবাহিনী ছিল রিকশাবাস কিংবা পায়ে হেঁটে চলা যোদ্ধাদের দলযাদের অস্ত্র ছিল পুরনোশত্রুপক্ষের তুলনায় দুর্বল। তবুও তারা লড়াই চালিয়ে যায়। পরে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে পরিস্থিতির গভীরতা উপলব্ধি করেন। এই শিবিরগুলো ভারতের অর্থনীতির ওপর বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে বিশ্ব তখনও পুরো পরিস্থিতির সত্যতা বিশ্বাস করতে চাইছিল না।

৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতের সীমান্তবর্তী কয়েকটি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়। শুরু হয় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ। ৪ ডিসেম্বর জেনারেল মানেকশ ভারতীয় সেনাবাহিনীকে আক্রমণের নির্দেশ দেন।

আমি প্রথম আক্রমণকারী বাহিনীর সঙ্গে যশোর রোড ধরে খুলনার দিকে অগ্রসর হই। প্রথম ৪০-৪৫ কিলোমিটার পথ তুলনামূলক সহজ ছিলকিন্তু খুলনার কাছাকাছি পৌঁছাতেই গোলাবর্ষণ শুরু হয়। শত্রুপক্ষ ওয়্যারলেসের মাধ্যমে তথ্য পেয়ে আমাদের অবস্থান নির্ধারণ করছিল। আমরা হামলার মুখে পড়িখোলা জায়গায় থাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটে। আমি আহত সৈন্যদের ছবি তুলছিলামকিন্তু বুঝতে পারছিলামপরবর্তী শিকার আমরাও হতে পারি।

আমাকে নিরাপদ স্থানে যেতে বলা হয়। আমরা আধা কিলোমিটার দৌড়ে একটি চায়ের দোকানে আশ্রয় নিই। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলামহঠাৎ একটি গুলি আমার পাশ দিয়ে ছুটে যায়। মাটিতে শুয়ে পড়তেই আরেকটি গুলি বেরিয়ে যায়। দোকানদার জানায়পাকিস্তানি সেনারা রেললাইনের ওপারেমাত্র আধা কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে।

 

এই যুদ্ধ ইতিহাসের অন্যতম স্বল্পসময়ের মধ্যে সমাপ্ত হওয়া যুদ্ধগুলোর একটি। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১মাত্র ১২ দিনের মাথায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করে।

আমি সেনা হেলিকপ্টারে ঢাকায় পৌঁছাইদেখি বিজয়ের উল্লাস এবং পরাজয়ের অপমান একসঙ্গে। ইন্দিরা গান্ধীর দৃঢ় সিদ্ধান্তজেনারেল মানেকশর কৌশল এবং জেনারেল জ্যাকবের পরিকল্পনাসব মিলিয়ে শেষ হয় নয় মাসের দুঃস্বপ্ননির্যাতনধর্ষণ ও অমানবিকতার অধ্যায়।

এটাই ছিল স্বাধীনতার মূল্যরক্তযন্ত্রণা আর অসীম ত্যাগ।