হাওরাঞ্চলে বোরো মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একসঙ্গে তিন দিকের চাপ তৈরি হয়েছে—অতিবৃষ্টি ও উজানের পানি, কালবৈশাখী ও শিলাবৃষ্টি, আর তীব্র শ্রমিক সংকট। এতে লাখো কৃষক এখন ধান নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। এপ্রিলের শুরু থেকেই আবহাওয়ার প্রতিকূলতায় নিচু জমির ধান তলিয়ে গেছে, আর যেগুলো রয়ে গেছে সেগুলো কাটতে গিয়ে নতুন নতুন সমস্যায় পড়ছেন চাষিরা।
ত্রিমুখী চাপে হাওরের চিত্র
অতিবৃষ্টির কারণে অনেক হাওরে কোমরসমান পানি জমে আছে। ফলে মেশিন দিয়ে ধান কাটার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে শিলাবৃষ্টিতে ক্ষেতে থাকা ধানের ফলন কমেছে। কাটার পর খলায় রাখা ধান শুকানোও সম্ভব হচ্ছে না টানা বৃষ্টির কারণে। এ অবস্থায় কৃষকের সামনে একদিকে ফসল বাঁচানোর লড়াই, অন্যদিকে ক্ষতি সামলানোর দুশ্চিন্তা।

শ্রমিক সংকট ও বাড়তি খরচ
বজ্রপাতের আশঙ্কা এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে হাওরে কাজ করতে অনীহা দেখাচ্ছেন অনেক শ্রমিক। ফলে শ্রমিকের সংকট তীব্র হয়েছে। যেসব জমিতে পানি জমে আছে, সেখানে মেশিন নয়, শ্রমিক দিয়েই ধান কাটতে হচ্ছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা মজুরি দিয়ে শ্রমিক নিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। খরচ বাড়লেও ফসল ঘরে তোলার নিশ্চয়তা নেই, যা আরও চাপ তৈরি করছে।
কৃষকের চোখে দুর্ভোগ
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, নিচু জমির ধান নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা। জমিতে পানি জমে থাকায় মেশিন নামানো যাচ্ছে না। আবার খলায় রাখা ধান শুকাতে না পারায় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। কেউ বলছেন, এমন বৈশাখ আগে দেখেননি—একদিকে ক্ষেতের ধান, অন্যদিকে কাটা ধান—দুই দিকেই ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। গত কয়েক বছর ভালো গেলেও এবার মৌসুমের শুরু থেকেই দুর্যোগে ভেঙে পড়েছে কৃষকের আশা।

নদীর পানি বাড়ছে, বন্যার আশঙ্কা
উজানের ঢল নামতে শুরু করায় সীমান্তবর্তী নদীগুলোতে পানির প্রবাহ দ্রুত বেড়েছে। এতে হাওর অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার শঙ্কা জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে সুরমা, কুশিয়ারা, ধনু ও বৌলাই নদীর পানি বাড়ায় নিচু এলাকা আরও ঝুঁকিতে পড়েছে। ইতোমধ্যে দ্রুত পাকা ধান কেটে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে বড় ক্ষতি এড়ানো যায়।
আবহাওয়ার নতুন সতর্কতা
আগামী কয়েকদিন দমকা হাওয়া, বৃষ্টি এবং বজ্রপাতের সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি উজানে বৃষ্টিপাত বাড়লে নদীর পানি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে হাওরের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

সরকারি উদ্যোগ ও সীমাবদ্ধতা
কৃষকদের সহায়তায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে শ্রমিক সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসঙ্গে কয়েকটি জেলায় ধান কাটার কাজ চলায় স্থানীয় শ্রমিক দিয়ে চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। তাই বাইরে থেকে শ্রমিক আনার চেষ্টা চলছে। তবে সময়মতো ফসল ঘরে তোলা না গেলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন কৃষকরা।
এই পরিস্থিতিতে হাওরের কৃষকদের চোখ এখন আকাশের দিকে। বৃষ্টি কমে গেলে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে, না হলে চলতি মৌসুমে বড় ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















