১১:৫০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
গ্রিনল্যান্ডের বরফের নিচে আগ্নেয়গিরির মতো নড়াচড়া, বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির শঙ্কা বার্ধক্যকে হার মানাচ্ছে স্টেম সেল থেরাপি: নতুন গবেষণায় শারীরিক দুর্বলতা কমার আশাবাদ কণাত্বরকের ভেতরে জোনাকির আলো, বিজ্ঞানের কঠিন জগতে প্রকৃতির কোমল বিস্ময় সবুজ ‘চাদরে’ মোড়া পোকা—আসলে মৃত্যুফাঁদ, মাটির ছত্রাকের ভয়ংকর আক্রমণ অতিরিক্ত বড় স্তন কীভাবে স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে? হাজার আলোকবর্ষ দূরে ‘ডিম নীহারিকা’: মৃত্যুপথযাত্রী তারার রহস্যময় রূপ উন্মোচন মণিপুরে নতুন সহিংসতা: পাঁচজন নিহত, এখনো গ্রেপ্তার শূন্য—অবরুদ্ধ সড়কে থমকে তদন্ত এলপিজির দাম বাড়তে বাড়তে কোথায় গিয়ে ঠেকবে? জি-টু-এর অনুপস্থিত সংযোগ: কেন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের জন্য আসিয়ান জরুরি জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারী হতে চেয়েছিলেন

জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারী হতে চেয়েছিলেন

সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন (বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের স্ত্রী) তখন আওয়ামী লীগের কনভেনর। অন্যদিকে চিফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ও রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান তখনও রাজনৈতিক দল করেননি।

এ সময়ে একদিন রাতে জোহরা তাজউদ্দিনের ধানমন্ডির বাসায় যান জিয়াউর রহমান। এবং জিয়াউর রহমান সেদিন জোহরা তাজউদ্দিনকে যা বলেন তা ছিল এমনই, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। আমি আওয়ামী লীগের বাইরে যেতে চাই না। বরং আপনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট থাকুন আমি আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি হই। এবং দেশে নির্বাচন দিয়ে দেই। আওয়ামী লীগই তো নির্বাচনে জিতে আসবে। আপনি দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকবেন। আমি দেশের প্রেসিডেন্ট থাকব।

জোহরা তাজউদ্দিন তার উত্তরে বলেছিলেন, দেখুন জিয়া আওয়ামী লীগ এইভাবে সরকারে যাবে না, এই পথে রাজনীতিও করবে না। বরং আপনি আপনার পথে যান, আমরা আমাদের পথে হাঁটি।

জিয়াউর রহমান তার উত্তরে বলেছিলেন, ভাবী আপনি তো জানেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে এ দেশে রাজনৈতিক দল করতে হলে রাজাকার, আলবদরদের নিয়ে করতে হবে। এবং আপনারা না এলে আমাকে তাই করতে হবে। আপনি একটু চিন্তা করেন। আমি আগামী সপ্তাহে আবার আসব।

পরের সপ্তাহেও এক রাতে জিয়াউর রহমান গিয়েছিলেন, এবং জোহরা তাজউদ্দিন তাঁকে একই উত্তর দিয়েছিলেন।

জোহরা তাজউদ্দিনের কাছে তাঁর ধানমন্ডির বাসায় বসে এই ঘটনা শোনার পরে কৌতূহল বশত তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন তিনি জিয়াউর রহমানকে ওভাবে মুখের ওপর না বলে দিয়েছিলেন। এবং জিয়াউর রহমানের প্রস্তাব শুনলে কি, দেশে রাজাকার আলবদরদের উত্থান কমত না?

জোহরা তাজউদ্দিনকে যারা কাছের থেকে জানেন— সকলেই জানেন অত্যন্ত রাশভারী মানুষ ছিলেন। আবার খুবই স্নেহপ্রবণ মানুষও ছিলেন। তিনি অত্যন্ত স্নেহের কণ্ঠে উত্তর দেন, দেখ আওয়ামী লীগকে কখনও কনভেনশনাল মুসলিম লীগ (মুসলিম লীগের একটি অংশ যারা দলের সঙ্গে বেঈমানি করে কনভেনশন ডেকে একটি মুসলিম লীগ বানিয়ে আইয়ুব খানের সঙ্গে গিয়েছিল । তাই ওই মুসলিম লীগকে বলা হতো কনভেনশনাল মুসলিম লীগ) বানানো যায় না। আওয়ামী লীগ জন-মানুষের দল। এটা কর্মীদের দল। এই দল কখনও সামরিক শাসনের অংশ হয় না। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা হত্যা সহ অসংখ্য হত্যার ভেতর দিয়ে যারা রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ঘটিয়েছে, তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ যোগ দিলে আর বাংলাদেশ থাকে না। বাঙালি জাতিও থাকে না।

পরবর্তীতে বিষয়গুলো আরও উপলব্ধি করার অনেক সুযোগ ও তথ্য দীর্ঘ সময় ধরে পেয়েছি। সে অন্য প্রসঙ্গ। তবে জিয়াউর রহমান তাঁর প্রথম উদ্যোগে ব্যর্থ হলেও তিনি যে খুবই বুদ্ধিমান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল বুঝতেন— তা তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপে বোঝা যায়। জিয়াউর রহমান সামরিক বাহিনীর মানুষ হলেও রাজনৈতিক দল বোঝার অবশ্য একটা যৌক্তিক কারণ ছিল। যেহেতু সার্ভিসে তাঁর দায়িত্বের মধ্যে ছিল রাজনৈতিক দলগুলোকে জানা।

যাহোক, আওয়ামী লীগকে সরকারি দল না বানাতে পারলেও তিনি এই সত্য বুঝেছিলেন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখলে ওই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সরকার আসবে তা বেশিদিন টিকবে না। এবং প্রকৃত বৈধতাও পাবে না।

যে কারণে ১৯৭৯’র সংসদ নির্বাচনের আগে জিয়াউর রহমান যখন খবর পান— আওয়ামী লীগ নেতারা বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারত করে গোয়ালন্দের পথে মানিকগঞ্জ হয়ে ফেরার সময় সাভার জাতীয় স্মৃতি সৌধে যান। এবং সেখানে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন জাতীয় স্মৃতি সৌধ স্পর্শ করিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রতিজ্ঞা করান, তারা নির্বাচনে যাবার সিদ্ধান্ত নেবে না। ওই সময়ে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন আওয়ামী লীগের কনভেনর ছিলেন না, সহসভাপতি ছিলেন। কিন্তু দলে তাঁর প্রভাব ছিল অনেক বেশি। তিনি এই শপথ করিয়েছিলেন, সে কথাও তাঁর কাছ থেকে নিশ্চিত করার সুযোগ হয়েছিল।

সাংবাদিক এম আর আকতার মুকুল ও দাউদ খান মজলিশ সে সময়ে জিয়াউর রহমানের সরকারে কাজ করেন। এম আর আকতার মুকুল ব্যক্তিগত আলোচনায় বলেন, নির্বাচনে যাবার প্রশ্নে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং শুরু হবার আগেই জিয়াউর রহমান ওই ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং মনিটর করার দায়িত্ব দেন দাউদ খান মজলিশকে। এবং সেখানে প্রতিদিন কী সিদ্ধান্ত হয় তা প্রতিদিনই তাকে জানাতে নির্দেশ দেন। দাউদ খান মজলিশ ওইভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে অতটা ঘনিষ্ঠ ছিলেন না যতটা ছিলেন এম আর আকতার মুকুল। তাই দাউদ খান মজলিশ তাঁর বন্ধু এম আর আকতার মুকুলের শরণাপন্ন হন।

আওয়ামী লীগের ওই ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং-এ প্রথম দিকে সকলেই নির্বাচনে না যাবার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু তখনকার আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারী ও বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে হঠাৎ জনপ্রিয় হয়ে ওঠা নেতা আব্দুর রাজ্জাক তৃতীয় দিনের সভায় দলকে নির্বাচনে যাবার পক্ষে সিদ্ধান্ত পাস করাতে সমর্থ হন।

কেন আব্দুর রাজ্জাক একাজ করেছিলেন, সে প্রসঙ্গ লিখতে গেলে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের পর কেরানীগঞ্জের এমপি বোরহান উদ্দিন গগনের বাসা থেকে আব্দুর রাজ্জাকের গ্রেফতার হওয়া থেকে শুরু করে ১৯৮৪-তে আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ভাঙা অবধি যাবতীয় কর্মকাণ্ড লিখতে হয়। সে আরেক সপ্তকাণ্ড রামায়ণ।

যাহোক, এম আর আকতার মুকুল যখন দ্রুত বের হয়ে এসে দাউদ খান মজলিশকে এই খবর দেন। দাউদ খান মজলিশ তখন এম আর আকতার মুকুলকে গাড়িতে তুলে নিয়ে জিয়াউর রহমানের কাছে যান। তারা গিয়ে দেখেন জিয়াউর রহমান রুমের এ মাথা ও মাথা পায়চারি করছেন। এম আর আকতার মুকুলের ভাষায়, দাউদের মুখ থেকে ওই খবর শোনার পরে তিনি পায়চারি থামিয়ে স্থির হন। এর পরে তিনি তার চরমপত্রের ভাষায় বলেন, “ঘাম ছাইড়্যা তাঁর জ্বর গেল।”

তবে বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসের দিকে তাকালে বলা যায়, রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় জিয়াউর রহমান সঠিক ছিলেন। কারণ আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে ১৯৮৮ সালে রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদ নির্বাচন করেছিলেন, ওই নির্বাচনের পরে তিনি ক্ষমতায় থাকতে পেরেছিলেন মাত্র ১৭ মাস কয়েক দিন। খালেদা জিয়া ১৯৯৬-তে আওয়ামী লীগ বাদ দিয়ে নির্বাচন করেছিলেন, ক্ষমতায় থাকতে পেরেছিলেন মাত্র ১২ দিন। ২০০৭ এর ২২ ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করার চেষ্টা করতে গিয়ে বিএনপি দেশকে ভিন্ন যাত্রায় ঠেলে দেয়।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.

 

জনপ্রিয় সংবাদ

গ্রিনল্যান্ডের বরফের নিচে আগ্নেয়গিরির মতো নড়াচড়া, বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির শঙ্কা

জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারী হতে চেয়েছিলেন

০৮:৩৪:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন (বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের স্ত্রী) তখন আওয়ামী লীগের কনভেনর। অন্যদিকে চিফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ও রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান তখনও রাজনৈতিক দল করেননি।

এ সময়ে একদিন রাতে জোহরা তাজউদ্দিনের ধানমন্ডির বাসায় যান জিয়াউর রহমান। এবং জিয়াউর রহমান সেদিন জোহরা তাজউদ্দিনকে যা বলেন তা ছিল এমনই, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। আমি আওয়ামী লীগের বাইরে যেতে চাই না। বরং আপনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট থাকুন আমি আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি হই। এবং দেশে নির্বাচন দিয়ে দেই। আওয়ামী লীগই তো নির্বাচনে জিতে আসবে। আপনি দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকবেন। আমি দেশের প্রেসিডেন্ট থাকব।

জোহরা তাজউদ্দিন তার উত্তরে বলেছিলেন, দেখুন জিয়া আওয়ামী লীগ এইভাবে সরকারে যাবে না, এই পথে রাজনীতিও করবে না। বরং আপনি আপনার পথে যান, আমরা আমাদের পথে হাঁটি।

জিয়াউর রহমান তার উত্তরে বলেছিলেন, ভাবী আপনি তো জানেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে এ দেশে রাজনৈতিক দল করতে হলে রাজাকার, আলবদরদের নিয়ে করতে হবে। এবং আপনারা না এলে আমাকে তাই করতে হবে। আপনি একটু চিন্তা করেন। আমি আগামী সপ্তাহে আবার আসব।

পরের সপ্তাহেও এক রাতে জিয়াউর রহমান গিয়েছিলেন, এবং জোহরা তাজউদ্দিন তাঁকে একই উত্তর দিয়েছিলেন।

জোহরা তাজউদ্দিনের কাছে তাঁর ধানমন্ডির বাসায় বসে এই ঘটনা শোনার পরে কৌতূহল বশত তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন তিনি জিয়াউর রহমানকে ওভাবে মুখের ওপর না বলে দিয়েছিলেন। এবং জিয়াউর রহমানের প্রস্তাব শুনলে কি, দেশে রাজাকার আলবদরদের উত্থান কমত না?

জোহরা তাজউদ্দিনকে যারা কাছের থেকে জানেন— সকলেই জানেন অত্যন্ত রাশভারী মানুষ ছিলেন। আবার খুবই স্নেহপ্রবণ মানুষও ছিলেন। তিনি অত্যন্ত স্নেহের কণ্ঠে উত্তর দেন, দেখ আওয়ামী লীগকে কখনও কনভেনশনাল মুসলিম লীগ (মুসলিম লীগের একটি অংশ যারা দলের সঙ্গে বেঈমানি করে কনভেনশন ডেকে একটি মুসলিম লীগ বানিয়ে আইয়ুব খানের সঙ্গে গিয়েছিল । তাই ওই মুসলিম লীগকে বলা হতো কনভেনশনাল মুসলিম লীগ) বানানো যায় না। আওয়ামী লীগ জন-মানুষের দল। এটা কর্মীদের দল। এই দল কখনও সামরিক শাসনের অংশ হয় না। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা হত্যা সহ অসংখ্য হত্যার ভেতর দিয়ে যারা রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ঘটিয়েছে, তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ যোগ দিলে আর বাংলাদেশ থাকে না। বাঙালি জাতিও থাকে না।

পরবর্তীতে বিষয়গুলো আরও উপলব্ধি করার অনেক সুযোগ ও তথ্য দীর্ঘ সময় ধরে পেয়েছি। সে অন্য প্রসঙ্গ। তবে জিয়াউর রহমান তাঁর প্রথম উদ্যোগে ব্যর্থ হলেও তিনি যে খুবই বুদ্ধিমান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল বুঝতেন— তা তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপে বোঝা যায়। জিয়াউর রহমান সামরিক বাহিনীর মানুষ হলেও রাজনৈতিক দল বোঝার অবশ্য একটা যৌক্তিক কারণ ছিল। যেহেতু সার্ভিসে তাঁর দায়িত্বের মধ্যে ছিল রাজনৈতিক দলগুলোকে জানা।

যাহোক, আওয়ামী লীগকে সরকারি দল না বানাতে পারলেও তিনি এই সত্য বুঝেছিলেন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখলে ওই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সরকার আসবে তা বেশিদিন টিকবে না। এবং প্রকৃত বৈধতাও পাবে না।

যে কারণে ১৯৭৯’র সংসদ নির্বাচনের আগে জিয়াউর রহমান যখন খবর পান— আওয়ামী লীগ নেতারা বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারত করে গোয়ালন্দের পথে মানিকগঞ্জ হয়ে ফেরার সময় সাভার জাতীয় স্মৃতি সৌধে যান। এবং সেখানে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন জাতীয় স্মৃতি সৌধ স্পর্শ করিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রতিজ্ঞা করান, তারা নির্বাচনে যাবার সিদ্ধান্ত নেবে না। ওই সময়ে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন আওয়ামী লীগের কনভেনর ছিলেন না, সহসভাপতি ছিলেন। কিন্তু দলে তাঁর প্রভাব ছিল অনেক বেশি। তিনি এই শপথ করিয়েছিলেন, সে কথাও তাঁর কাছ থেকে নিশ্চিত করার সুযোগ হয়েছিল।

সাংবাদিক এম আর আকতার মুকুল ও দাউদ খান মজলিশ সে সময়ে জিয়াউর রহমানের সরকারে কাজ করেন। এম আর আকতার মুকুল ব্যক্তিগত আলোচনায় বলেন, নির্বাচনে যাবার প্রশ্নে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং শুরু হবার আগেই জিয়াউর রহমান ওই ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং মনিটর করার দায়িত্ব দেন দাউদ খান মজলিশকে। এবং সেখানে প্রতিদিন কী সিদ্ধান্ত হয় তা প্রতিদিনই তাকে জানাতে নির্দেশ দেন। দাউদ খান মজলিশ ওইভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে অতটা ঘনিষ্ঠ ছিলেন না যতটা ছিলেন এম আর আকতার মুকুল। তাই দাউদ খান মজলিশ তাঁর বন্ধু এম আর আকতার মুকুলের শরণাপন্ন হন।

আওয়ামী লীগের ওই ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং-এ প্রথম দিকে সকলেই নির্বাচনে না যাবার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু তখনকার আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারী ও বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে হঠাৎ জনপ্রিয় হয়ে ওঠা নেতা আব্দুর রাজ্জাক তৃতীয় দিনের সভায় দলকে নির্বাচনে যাবার পক্ষে সিদ্ধান্ত পাস করাতে সমর্থ হন।

কেন আব্দুর রাজ্জাক একাজ করেছিলেন, সে প্রসঙ্গ লিখতে গেলে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের পর কেরানীগঞ্জের এমপি বোরহান উদ্দিন গগনের বাসা থেকে আব্দুর রাজ্জাকের গ্রেফতার হওয়া থেকে শুরু করে ১৯৮৪-তে আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ভাঙা অবধি যাবতীয় কর্মকাণ্ড লিখতে হয়। সে আরেক সপ্তকাণ্ড রামায়ণ।

যাহোক, এম আর আকতার মুকুল যখন দ্রুত বের হয়ে এসে দাউদ খান মজলিশকে এই খবর দেন। দাউদ খান মজলিশ তখন এম আর আকতার মুকুলকে গাড়িতে তুলে নিয়ে জিয়াউর রহমানের কাছে যান। তারা গিয়ে দেখেন জিয়াউর রহমান রুমের এ মাথা ও মাথা পায়চারি করছেন। এম আর আকতার মুকুলের ভাষায়, দাউদের মুখ থেকে ওই খবর শোনার পরে তিনি পায়চারি থামিয়ে স্থির হন। এর পরে তিনি তার চরমপত্রের ভাষায় বলেন, “ঘাম ছাইড়্যা তাঁর জ্বর গেল।”

তবে বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসের দিকে তাকালে বলা যায়, রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় জিয়াউর রহমান সঠিক ছিলেন। কারণ আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে ১৯৮৮ সালে রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদ নির্বাচন করেছিলেন, ওই নির্বাচনের পরে তিনি ক্ষমতায় থাকতে পেরেছিলেন মাত্র ১৭ মাস কয়েক দিন। খালেদা জিয়া ১৯৯৬-তে আওয়ামী লীগ বাদ দিয়ে নির্বাচন করেছিলেন, ক্ষমতায় থাকতে পেরেছিলেন মাত্র ১২ দিন। ২০০৭ এর ২২ ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করার চেষ্টা করতে গিয়ে বিএনপি দেশকে ভিন্ন যাত্রায় ঠেলে দেয়।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.