মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে বৈঠকে দেশটির প্রতি চীনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক এমন সময়ে হলো, যখন দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছে মিয়ানমার।
চীনের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে আনুষ্ঠানিক স্বাগত অনুষ্ঠানের পর শি জিনপিং বলেন, চীনের প্রতিবেশী কূটনীতিতে মিয়ানমার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। তিনি দুই দেশের ঐতিহ্যগত ‘পক-ফ’ বা ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার করার এবং কৌশলগত সহযোগিতা গভীর করার আহ্বান জানান।
শি জিনপিং মিয়ানমারকে চীনের “বিশ্বস্ত বন্ধু ও অবিচল অংশীদার” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা ও পরিবর্তনের এই সময়ে উভয় দেশের উচিত পারস্পরিক সহযোগিতা এবং কৌশলগত সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা।
প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে বেইজিং
এটি প্রেসিডেন্ট হিসেবে মিন অং হ্লাইংয়ের প্রথম চীন সফর এবং দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্বিতীয় বিদেশ সফর। গত এপ্রিল মাসে তিন ধাপের সংসদীয় নির্বাচনের পর তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তবে পশ্চিমা দেশ ও সমালোচকদের একটি অংশ ওই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছে।
বৈঠকের পর দুই নেতা বিভিন্ন সহযোগিতা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সাক্ষী হন। মোট ১৮টি সমঝোতা স্মারকে সীমান্তবর্তী পরিবহন ব্যবস্থা, মুক্ত বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, গণমাধ্যম, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং বৃহত্তর মেকং অঞ্চলের সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অর্থনৈতিক করিডর ও বাণিজ্যে জোর
বৈঠকে শি জিনপিং চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানান। এই প্রকল্প চীনের বহুল আলোচিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যার লক্ষ্য দক্ষিণ-পশ্চিম চীনকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করা।
জবাবে মিন অং হ্লাইং বলেন, মিয়ানমার চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অবকাঠামোগত সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে আগ্রহী। তিনি দেশটিতে থাকা চীনা প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেন।
চীন বর্তমানে মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার, প্রধান আমদানির উৎস এবং অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী। তবে চলমান সংঘাতের কারণে বহু বিনিয়োগ ও অবকাঠামো প্রকল্প স্থবির হয়ে আছে।
সীমান্ত নিরাপত্তা ও সাইবার অপরাধ
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে। সেনাবাহিনী, প্রতিরোধ বাহিনী এবং বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ বিশেষ করে চীন সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে শি জিনপিং সীমান্ত অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সব পক্ষের মধ্যে সংলাপভিত্তিক সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অন্যদিকে মিন অং হ্লাইং সীমান্তজুড়ে সক্রিয় সাইবার জালিয়াতি ও অনলাইন অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে চীনের সঙ্গে যৌথভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়ছে
মিয়ানমারে চীনের অর্থায়নে গড়ে ওঠা গ্যাস ও তেল পাইপলাইনসহ বিভিন্ন কৌশলগত অবকাঠামো প্রকল্প রয়েছে। বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প সম্পন্ন হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহে চীনের বিকল্প রুট হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলার পাশাপাশি মিন অং হ্লাইং রাশিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করছেন। পারমাণবিক জ্বালানি, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং বন্দর উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে দুই দেশ। এর অংশ হিসেবে একটি ক্ষুদ্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও এগিয়ে চলছে, যদিও ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে প্রকল্পটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















