সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ক্যান্সার হাড়ে ছড়িয়ে পড়ার খবর রাজনৈতিক অবস্থাননির্বিশেষে গভীরভাবে বেদনাদায়ক। তাঁর ছেলে হান্টার বাইডেন সম্প্রতি জানিয়েছেন, বাবার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত কষ্টকর ও দুর্বল করে দেওয়ার মতো। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, বাইডেন এখনো লড়াই চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে মানবিকভাবে তাঁর কষ্ট কমুক এবং তিনি শক্তি পান—এটাই কাম্য।
তবে বাইডেনের অবনতিশীল স্বাস্থ্য ডেমোক্র্যাটদের সামনে এমন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতাও হাজির করেছে, যেটি ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় দলটি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। বাইডেন যদি সেই নির্বাচনে পুনর্নির্বাচিত হতেন, তাহলে বর্তমান শারীরিক অবস্থার কারণে তাঁর পক্ষে আরেকটি পূর্ণ মেয়াদ শেষ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়তে পারত।
এই সম্ভাবনাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাইডেনের বয়স ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ শুধু রিপাবলিকান সমালোচকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যেই ৮৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করতেন, আরও চার বছর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য বাইডেন অতিরিক্ত বয়স্ক। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিভক্ত রাজনৈতিক পরিবেশে এত বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো বিষয়ে পাওয়া বিরল।
তারপরও বাইডেন, তাঁর পরিবার এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বড় একটি অংশ বিকল্প প্রার্থী নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে রাজি হয়নি। যেন ধরে নেওয়া হয়েছিল, বাইডেনের প্রার্থিতা চূড়ান্ত এবং তাঁকে সরিয়ে অন্য কাউকে বিবেচনা করার বাস্তব কোনো কারণ নেই।
বিতর্কের রাতেই বদলে গেল পরিস্থিতি

২০২৪ সালের ২৭ জুন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বিতর্কে বাইডেনের দুর্বল পারফরম্যান্স দীর্ঘদিনের উদ্বেগকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক সংকটে পরিণত করে। হান্টার বাইডেন পরে বলেছেন, তাঁর বাবার শরীরে তখনও শনাক্ত না হওয়া ক্যান্সার ওই রাতের খারাপ পারফরম্যান্সে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই দাবি বাইডেনের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও সক্ষমতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোকে দূর করে না।
এর পরের ঘটনাপ্রবাহও ডেমোক্র্যাটদের জন্য কম ক্ষতিকর ছিল না। বাইডেন আরও প্রায় তিন সপ্তাহ প্রার্থিতা ধরে রাখেন। শেষ পর্যন্ত যখন তিনি সরে দাঁড়ান, তখন তাঁর প্রত্যাহার অনেকের কাছেই প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।
এরপর দলটি দ্রুত ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিসের পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়। ফলে সাধারণ প্রাইমারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ডেমোক্র্যাট ভোটারদের সামনে বিকল্প প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ কার্যত থাকল না। দলীয় নেতৃত্বের বার্তা ছিল—সময় নেই, বাস্তব বিকল্পও নেই।
কিন্তু নির্বাচনের ফল সেই সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ দেয়নি।
হ্যারিস দলীয় কনভেনশনে নিজের পছন্দমতো রাজনৈতিক মঞ্চ পেয়েছিলেন। ট্রাম্পের সঙ্গে বিতর্কেও ভালো করেছিলেন। মাত্র ১৫ সপ্তাহের প্রচারে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা ১৫০ কোটি ডলার সংগ্রহ ও ব্যয় করে। তিনি জয়ী হলে ডেমোক্র্যাট নেতৃত্ব বলতে পারত, শেষ পর্যন্ত তাদের সিদ্ধান্ত সঠিক প্রমাণিত হয়েছে।
কিন্তু তিনি পরাজিত হন। শুধু ইলেক্টোরাল ফলেই নয়, জনপ্রিয় ভোটেও পিছিয়ে পড়েন। সাতটি গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যের একটিতেও জয় পাননি।
ফলে ডেমোক্র্যাট ভোটারদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে—দলীয় নেতৃত্ব যদি নিজেদের বিচারবুদ্ধির ওপর এতটাই আস্থাশীল ছিল, তাহলে সেই সিদ্ধান্তগুলো এত খারাপ ফলের দিকে নিয়ে গেল কেন?
নেতৃত্বের ওপর আস্থার সংকট

২০২৪ সালের ক্ষত শুধু বাইডেনকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতৃত্বের ওপরও পড়েছে। নতুন রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা খুঁজতে থাকা দলটির জন্য এটি আরও বড় সমস্যা।
সাধারণত একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের নেতাদের বেশ কিছু সুবিধা থাকে। দলীয় কাঠামো, অর্থদাতা ও বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক, প্রচারণার অভিজ্ঞতা এবং পরিচিতি—সবকিছুই তাদের পক্ষে কাজ করে।
কিন্তু ভোটাররা যখন নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেন, তখন এসব সুবিধার মূল্য কমে যায়।
ডেমোক্র্যাটরা দেখেছে, দলের নেতৃত্ব বাইডেনের বয়স নিয়ে জনমনে থাকা ব্যাপক উদ্বেগকে গুরুত্ব দেয়নি। এরপর তারা দেখেছে, বিতর্কের মঞ্চে প্রেসিডেন্ট মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। তারপর তাদের বলা হয়েছে, নতুন করে অর্থবহ প্রাইমারি আয়োজনের মতো সময় নেই এবং হ্যারিসই কার্যত একমাত্র বাস্তবসম্মত বিকল্প।
ডেমোক্র্যাট ভোটারদের কাছে এটি শুধু একটি নির্বাচনী পরাজয় ছিল না। এটি ছিল দলীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার ওপর আস্থার সংকট।
স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন আরও গভীর হলো
বাইডেনের প্রোস্টেট ক্যান্সারের খবর প্রকাশ্যে আসার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
দেশ জানতে পারে, সাবেক প্রেসিডেন্টের এই রোগ ছিল এবং সম্ভবত কয়েক বছর ধরে তা অজানাই ছিল। ২০১৪ সাল থেকে তাঁর চিকিৎসকেরা রক্তে পিএসএ পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এর ফলে একজন প্রবীণ প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য কতটা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়।
উদ্বেগ শুধু শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও ছিল না। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার চিকিৎসক জেফরি কুলম্যানও বলেছিলেন, বাইডেনের প্রেসিডেন্ট মেয়াদের শেষ বছরে তাঁর জ্ঞানীয় সক্ষমতা যাচাইয়ের পরীক্ষা করা উচিত ছিল।

সবকিছু মিলিয়ে ডেমোক্র্যাট ভোটারদের জন্য দলীয় নেতৃত্বকে প্রশ্ন করার যথেষ্ট কারণ তৈরি হয়েছে।
এর অর্থ এই নয় যে ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বের প্রতিটি সিদ্ধান্তই ভুল ছিল। আবার বাইডেনের অসুস্থতাও নিজে থেকে প্রমাণ করে না যে ২০২৪ সালে তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ অক্ষম ছিলেন। কিন্তু তাঁর বয়স ও স্বাস্থ্য নিয়ে স্পষ্ট উদ্বেগকে গুরুত্ব না দেওয়ার ফলে পরবর্তী সময়ে যখন সেই উদ্বেগগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ থাকল না, তখন দলের নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা বড় ধাক্কা খায়।
কেন বামপন্থীরা বাড়তি সুযোগ পাচ্ছেন
এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে কেন ডেমোক্র্যাট ভোটারদের একটি অংশ এখন দলের বামপন্থী প্রার্থীদের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এবং নিউইয়র্কের প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ ২০২৪ সালের ডেমোক্র্যাটিক সংকট তৈরির সিদ্ধান্তগুলোর জন্য দায়ী ছিলেন না। বাইডেনের প্রার্থিতা রক্ষা, তাঁর উত্তরসূরি নির্ধারণের তাড়াহুড়ো কিংবা পরবর্তী নির্বাচনী কৌশল—কোনোটির সঙ্গেই তাঁরা সরাসরি যুক্ত ছিলেন না।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
দলের প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের ওপর আস্থা কমতে থাকলে ডেমোক্র্যাটিক সমাজতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল প্রার্থীরা নিজেদের সাম্প্রতিক ব্যর্থতার বাইরে থাকা শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পারেন।
গুরুত্বপূর্ণ ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে আবদুল এল-সায়েদের মতো প্রার্থীদের সাফল্য সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তাঁদের জনপ্রিয়তার কারণ শুধু আদর্শগত অবস্থান নয়; এর পেছনে এমন একটি ভোটার মানসিকতাও কাজ করতে পারে, যেখানে মানুষ মনে করছে—সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ব্যর্থতার সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন না, এবার তাদের সুযোগ দেওয়া উচিত।

বাইডেনের পরও থেকে যাচ্ছে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
বাইডেন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়েন। কিন্তু তিনি যেভাবে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে বিদায় নিলেন, তার প্রভাব এখনো ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ওপর রয়েছে।
সমস্যাটি এখন আর শুধু একজন প্রবীণ প্রেসিডেন্ট বা একটি ব্যর্থ নির্বাচনী প্রচারণাকে ঘিরে নেই। এটি দলীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।
ভোটাররা যখন বারবার দেখেন, দলীয় নেতাদের সিদ্ধান্ত জনমতের স্পষ্ট উদ্বেগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তখন একসময় তারা সেই নেতাদের আশ্বাস গ্রহণ করা বন্ধ করে দেন। ডেমোক্র্যাটিক নেতৃত্ব এখন সেই আস্থার ঘাটতির মুখোমুখি।
বাইডেনের অসুস্থতা নিঃসন্দেহে একটি মানবিক ট্র্যাজেডি। কিন্তু রাজনৈতিক দিক থেকে এটি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে সেই প্রশ্নগুলো, যার উত্তর ডেমোক্র্যাটরা ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে দিতে পারেনি—কে প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করছিল, কে দলীয় নেতৃত্বের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে প্রস্তুত ছিল এবং কেন এত নেতা এমন একটি কৌশলকে সমর্থন করে গেছেন, যেটি শেষ পর্যন্ত ভোটারদের কাছেই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে?
বাইডেন নিজে রাজনীতির মঞ্চ থেকে সরে গেলেও এই প্রশ্নগুলো ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে আরও দীর্ঘ সময় প্রভাবিত করবে।
জিম গেরাটি 



















