যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসীদের ধরতে পরিচালিত ব্যাপক অভিযানে অভিবাসন কর্মকর্তারা জাতি ও গায়ের রঙকে লক্ষ্যবস্তু করার পাশাপাশি অবমাননাকর বর্ণবাদী শব্দ ব্যবহার করেছেন—এমন অভিযোগের পক্ষে নতুন নতুন প্রমাণ সামনে এসেছে। দেশটির বিভিন্ন আদালতে চলমান মামলায় দাখিল করা দেহে ধারণ করা ক্যামেরার ভিডিও, খুদে বার্তা, জবানবন্দি ও অন্যান্য নথিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, লস অ্যাঞ্জেলেস, শিকাগো, মিনিয়াপোলিসসহ বিভিন্ন শহরে পরিচালিত অভিযানে কর্মকর্তারা বিশেষ করে লাতিনো জনগোষ্ঠীর মানুষদের ওপর নজর দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে গায়ের রঙ, চেহারা, কথাবলার ধরন, জাতিগত পরিচয়ের অনুমান এবং কাজের পোশাক দেখে মানুষকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর আইনজীবীরা দাবি করছেন।
কর্মকর্তাদের মুখে বর্ণবিদ্বেষী শব্দ
আদালতে জমা দেওয়া কয়েকটি নথিতে দেখা যায়, কিছু ফেডারেল কর্মকর্তা মেক্সিকান অভিবাসীদের বোঝাতে অত্যন্ত অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করেছেন। ভিডিওতে কর্মকর্তাদের কথোপকথনেও এমন শব্দ শোনা গেছে।
একটি ভিডিওতে কর্মকর্তাদের একজন একটি ব্যাগ সম্পর্কে জানতে গিয়ে সেটিকে কারও সঙ্গে যুক্ত করে বর্ণবিদ্বেষী শব্দ ব্যবহার করেন। অন্য একটি ঘটনায় একজন কর্মকর্তা লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি এলাকায় অভিযান চালানোর পর সহকর্মীকে জানান, তারা তিনটি গাড়ি ভরে ফেলেছেন। পরে একই কর্মকর্তা এক ব্যক্তিকে দেখে তাকে অবৈধ অভিবাসী বোঝাতে আরেকটি অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করেন।
নাগরিক অধিকারকর্মীদের মতে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বরং মামলাগুলোতে জমা পড়া ভিডিও ও অন্যান্য প্রমাণ থেকে তারা মনে করছেন, অভিবাসন অভিযানে জাতিগত পরিচয়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাছাইয়ের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
মার্কিন নাগরিকও আটক হওয়ার অভিযোগ
বিতর্কের সবচেয়ে গুরুতর দিকগুলোর একটি হলো—অভিবাসন অভিযানে বৈধ মার্কিন নাগরিকরাও ভুলভাবে আটক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার আনাহাইমের বাসিন্দা অ্যাঞ্জেল সান্তিয়াগো তাফোলা নিজেকে মার্কিন নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পরও কর্মকর্তাদের হাতে আটক হওয়ার কথা আদালতে জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি একটি গাড়ি ধোয়ার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছিলেন। গায়ের রঙ অপেক্ষাকৃত গাঢ় হওয়ায় কর্মকর্তারা তাকে ধাওয়া করেন, অথচ তার হালকা গায়ের রঙের সহকর্মীদের এড়িয়ে যান।
এক পর্যায়ে একজন কর্মকর্তা তার দিকে বৈদ্যুতিক অস্ত্র তাক করেন। পরে তাকে হাতকড়া পরিয়ে একটি গাড়িতে তোলা হয় বলে আদালতে দেওয়া নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাফোলার ভাষ্য, তিনি বারবার নিজেকে মার্কিন নাগরিক বলে জানালেও কর্মকর্তারা তার জাতিগত পরিচয়ের কথা বলে তার কাগজপত্রকে মিথ্যা দাবি করেন এবং তাকে কথা বলা বন্ধ করতে বলেন।
অন্তত ৬৫ মার্কিন নাগরিকের আটকের অভিযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে দায়ের করা এক ডজনেরও বেশি মামলায় নাগরিক অধিকার আইনজীবীরা দাবি করেছেন, কৃষ্ণাঙ্গ ও লাতিনো জনগোষ্ঠীর অনেক বাসিন্দাকে কেবল তাদের চেহারা, গায়ের রঙ, কথার টান কিংবা কাজের পোশাক দেখে সন্দেহ করা হয়েছে।
আদালতের নথি অনুযায়ী, অন্তত ৬৫ জন মার্কিন নাগরিককে থামানো, জিজ্ঞাসাবাদ বা আটক করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তাদের সবাই মুক্তি পাওয়ায় তারা আইনজীবীদের কাছে নিজেদের অভিজ্ঞতার বিস্তারিত বর্ণনা দিতে পেরেছেন।
কয়েকজনের অভিযোগ, নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে বৈধ পাসপোর্ট বা চালকের লাইসেন্স দেখানোর পরও কর্মকর্তারা তা গ্রহণ করেননি। কয়েকজনকে বৈদ্যুতিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দেওয়া হয়েছে, কেউ কেউ মাটিতে ফেলে হাতকড়া পরানো হয়েছে এবং কয়েকজনকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছে বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

প্রতিদিন ৩ হাজার গ্রেপ্তারের চাপ
মামলাগুলোর নথিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। কর্মকর্তাদের ওপর প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক অভিবাসী গ্রেপ্তারের লক্ষ্য পূরণের চাপ ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এক পর্যায়ে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার অভিবাসী গ্রেপ্তারের জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে গ্রেপ্তারের লক্ষ্য আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বাড়ানো হয় বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনজীবীদের দাবি, এই চাপের ফলে কর্মকর্তারা ব্যক্তিভিত্তিক তদন্তের বদলে রাস্তায় বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে যত বেশি সম্ভব মানুষকে আটক করার দিকে ঝুঁকে পড়েন।
অভিযোগ রয়েছে, চিহ্নিত এলাকায় টহলরত দলগুলো পরিচয়বিহীন যানবাহনে করে লাতিনো অধ্যুষিত এলাকা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যেত। গাড়ি ধোয়ার প্রতিষ্ঠান, নির্মাণস্থল, বিপণিবিতানের পার্কিং এলাকা এবং ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় এসব অভিযান চালানো হয়েছে বলে আদালতের নথিতে বলা হয়েছে।
নাগরিক অধিকার সংগঠনের কঠোর অভিযোগ
লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি মামলায় কাজ করা নাগরিক অধিকার আইনজীবী মায়রা জোয়াকিনের বক্তব্য, যাদের থামানো হচ্ছিল তাদের সম্পর্কে কর্মকর্তাদের কাছে অনেক সময় নির্দিষ্ট তথ্য ছিল না। তারা মূলত ওই ব্যক্তিকে লাতিনো ও শ্রমজীবী বলে মনে করছেন—এমন জনমিতিক ধারণার ওপর নির্ভর করছিলেন।
নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, কারও জাতিগত পরিচয় বা গায়ের রঙকে অবৈধ অভিবাসনের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা সাংবিধানিক অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন হতে পারে।
সরকারের পাল্টা দাবি
মার্কিন সরকার অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারি আইনজীবীদের দাবি, অভিবাসন অভিযানগুলো নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়েছে। কোনো কোনো কর্মকর্তার অবমাননাকর বা উসকানিমূলক মন্তব্যকে পুরো সংস্থার নীতি কিংবা উদ্দেশ্যের প্রমাণ হিসেবে দেখানো যায় না বলেও তারা যুক্তি দিয়েছেন।
দেশটির স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের মুখপাত্র ক্যাথরিন কারি কর্মকর্তাদের বর্ণবিদ্বেষী শব্দ ব্যবহারের অভিযোগের সরাসরি জবাব না দিয়ে বর্ণবিদ্বেষীভাবে মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে অভিহিত করেছেন।
তার বক্তব্য, কোনো ব্যক্তিকে অভিবাসন প্রয়োগের লক্ষ্যবস্তু করার কারণ তার গায়ের রঙ, জাতি বা জাতিগত পরিচয় নয়; বরং তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে অবস্থান করছেন কি না, সেটিই মূল বিষয়।
আইনের পুরোনো ব্যাখ্যা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
অভিবাসন আইন প্রয়োগে জাতিগত পরিচয়ের ব্যবহার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ১৯৭৫ সালে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে বলেছিল, অবৈধ অভিবাসী থাকার সন্দেহে কোনো গাড়ি থামানোর সিদ্ধান্তে জাতি ও জাতিগত পরিচয় কিছুটা বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। তবে সেটি একমাত্র কারণ হতে পারবে না।
বর্তমান মামলাগুলোতে এখন প্রশ্ন উঠছে—প্রায় পাঁচ দশক আগের সেই আইনি অবস্থান এখনও কতটা কার্যকর এবং কর্মকর্তাদের আচরণ কখন অনুমোদিত সীমা অতিক্রম করছে।
অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক মামলাগুলো এবং সর্বোচ্চ আদালতের সাময়িক আদেশ এই পুরোনো আইনি সীমারেখাকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
সর্বোচ্চ আদালতের দিকেই নজর
মামলাগুলো বর্তমানে নিম্ন আদালতে চলমান। এসব মামলার রায় শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করতে পারে, অভিবাসন কর্মকর্তারা জাতি ও জাতিগত পরিচয়ের ওপর কতটা নির্ভর করে মানুষকে থামাতে, জিজ্ঞাসাবাদ করতে বা আটক করতে পারবেন।
আইন বিশেষজ্ঞ কেভিন আর জনসনের মতে, সর্বোচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক আদেশ কিছু ফেডারেল কর্মকর্তাকে দেশজুড়ে জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে সন্দেহ করার ক্ষেত্রে আরও উৎসাহিত করে থাকতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, ওই সাময়িক আদেশই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
শিকাগো ও লস অ্যাঞ্জেলেসে টহলরত গাড়ির ভেতর থেকে ধারণ করা নতুন ভিডিওগুলো মামলাগুলো সর্বোচ্চ আদালতে পৌঁছালে বিচারকদের সামনে পরিস্থিতির আরও স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরতে পারে।
ভিডিও ও আদালতের নথিতে যদি প্রমাণিত হয় যে কর্মকর্তারা সাদা চেহারার মানুষদের পাশ কাটিয়ে কাছাকাছি থাকা লাতিনোদের বেছে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ বা আটক করেছেন, তাহলে অভিবাসন প্রয়োগে বৈষম্যের অভিযোগ আরও জোরালো হতে পারে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন অভিযান শুধু অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও বহিষ্কারের প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে নাগরিক অধিকার, জাতিগত বৈষম্য, আইন প্রয়োগের সাংবিধানিক সীমা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহারের মতো গভীর প্রশ্ন। চলমান মামলাগুলোর রায় শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন কর্মকর্তাদের ক্ষমতার সীমারেখা আগামী দিনে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন অভিযানে জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগ নিয়ে নতুন প্রমাণ সামনে আসায় বিষয়টি দেশটির নাগরিক অধিকার ও সাংবিধানিক আইনের বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















