কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের কারণে বিশ্বজুড়ে মেমোরি চিপের চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে এখন এই সংকট সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের দ্বারস্থ হচ্ছে একের পর এক শিল্পখাত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশাল তথ্যকেন্দ্রগুলো বিপুল পরিমাণ মেমোরি চিপ কিনে নেওয়ায় স্মার্টফোন, গাড়ি, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের মতো খাতগুলোতে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত এক বছরে ছোট এই চিপগুলোর দাম প্রায় চার গুণ বেড়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সরকারি প্রচেষ্টার ওপরও নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। বাণিজ্য সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছে, মেমোরি চিপের বাজারে তৈরি হওয়া এই ‘জরুরি ভারসাম্যহীনতা’ অর্থনীতির বড় অংশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য চাহিদার বিস্ফোরণ
মেমোরি চিপ বিভিন্ন পণ্যে তথ্য সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে গাড়ি এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম—প্রায় সব ধরনের আধুনিক প্রযুক্তিপণ্যেরই এর প্রয়োজন হয়। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য নির্মিত বিশাল তথ্যকেন্দ্রগুলো এখন বিপুল পরিমাণ চিপ কিনে নিচ্ছে।
এর ফলে অন্য শিল্পগুলো বাজারে প্রয়োজনীয় চিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক, গাড়ি নির্মাতা এবং ভোক্তা ইলেকট্রনিকস কোম্পানিগুলো সরকারকে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছে।
কিছু শিল্পগোষ্ঠী প্রস্তাব করেছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার চিপ নির্মাতাদের নির্দিষ্ট শিল্পের জন্য একটি অংশের সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাধ্য করুক। কেউ কেউ আবার ২০২২ সালের চিপস ও বিজ্ঞান আইনের আওতায় সরকারি অর্থ পাওয়ার শর্ত হিসেবে বিভিন্ন শিল্পের কাছে চিপ বিক্রির বাধ্যবাধকতা আরোপের কথা বলেছে।
আরও কঠোর একটি প্রস্তাবে কোরীয় যুদ্ধের সময়কার প্রতিরক্ষা উৎপাদন আইন ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাইরের শিল্পগুলোর জন্য মেমোরি চিপ বরাদ্দ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
‘মেমোরির দামে শতবর্ষের বন্যা’

অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক গত মাসে এক আয়বিষয়ক আলোচনায় মেমোরি চিপের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে ‘শতবর্ষের বন্যা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, মেমোরির দাম যে হারে বাড়ছে, তা নজিরবিহীন।
জুন মাসে বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ও বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিককে চিঠি দিয়ে সতর্ক করে বলেছে, মেমোরি চিপের বাজারে এই ভারসাম্যহীনতা অর্থনীতির বড় অংশকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ডায়ান সোয়ঙ্কের মতে, মেমোরি চিপের সংকট ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। মানুষ ভিডিও গেম খেলার যন্ত্র কেনা কমিয়ে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও দামি ইলেকট্রনিক পণ্যের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যেতে পারে।
তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান এত শক্তিশালী যে এটি অন্যান্য পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সরকারের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
তবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের জন্য বিষয়টি সহজ নয়। একদিকে চিপের দাম কমিয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার জন্য দেশটির তথ্যকেন্দ্রগুলোর চিপ সরবরাহ অব্যাহত রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। সরকারের নীতির কারণে এই খাতে শত শত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এসেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
কিন্তু সংকটের সমাধান দ্রুত সম্ভব নয়। মেমোরি চিপ নির্মাতারা উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করলেও নতুন কারখানা নির্মাণে বিপুল অর্থের পাশাপাশি কয়েক বছর সময় লাগে।
প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেকইনসাইটসের কৌশলবিষয়ক প্রধান ড্যান কিম মনে করেন, চিপের ঘাটতি আরও অন্তত দুই বছর চলতে পারে। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানিগুলো মেমোরি চিপের জন্য প্রায় সীমাহীন দাম দিতে প্রস্তুত। কিন্তু অন্যান্য ব্যবসার পক্ষে সেই একই দাম দেওয়া সম্ভব নয়।
এর প্রভাব সাধারণ মানুষের ব্যবহারের পণ্যের পাশাপাশি চিকিৎসা প্রযুক্তিতেও পড়তে পারে। স্মার্টফোনের দাম যেমন বাড়তে পারে, তেমনি চিকিৎসায় ব্যবহৃত চৌম্বকীয় অনুরণন যন্ত্রের দামও বেড়ে যেতে পারে।
উৎপাদন বাড়াতে নতুন সরকারি সহায়তার দাবি
মাইক্রন, স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের মতো বড় মেমোরি চিপ নির্মাতারাও উৎপাদন বাড়াতে সরকারের সহায়তা চাইছে। কয়েকটি কোম্পানি কংগ্রেসের কাছে আগের চিপস আইনের মতো নতুন করে সরকারি অর্থ বরাদ্দের আবেদন করেছে।
নতুন কারখানা দ্রুত নির্মাণের জন্য পরিবেশগত কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করার দাবিও উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা নির্মাণের প্রক্রিয়া অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি সময়সাপেক্ষ—এমন অভিযোগও করেছে শিল্পখাত।
মাইক্রনের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট মানিশ ভাটিয়া বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মেমোরি খাতে তাঁর কোম্পানি ২৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে উৎপাদন বাড়াতে নির্মাতা, সরবরাহকারী ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের উৎপাদনের বড় অংশ দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনে। সংকট সামাল দিতে চীনের কারখানাগুলোতেও উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
চীনকে ঘিরে নতুন দ্বন্দ্ব
চিপের সংকট যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি প্রতিযোগিতাকেও আরও জটিল করে তুলেছে।
অ্যাপলসহ ভোক্তা ইলেকট্রনিকস কোম্পানিগুলো চীন থেকে মেমোরি চিপ কেনার অনুমতি চাচ্ছে। চীনের ওপর থাকা কিছু বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত বিধিনিষেধের কারণে এমন কেনাকাটা সহজ নয়।
অ্যাপল ২০২২ সালে চীনের ইয়াংৎসে মেমোরি টেকনোলজিস করপোরেশন থেকে মেমোরি চিপ কেনার আলোচনা করেছিল। কিন্তু মার্কিন আইনপ্রণেতাদের চাপের কারণে সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত এগোয়নি।

এখন আবার চীন থেকে চিপ কেনার অনুমতি দেওয়ার দাবি উঠলেও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কর্মকর্তা এতে আগ্রহী নন। তাদের যুক্তি, অ্যাপল বহু বছর ধরে সরবরাহব্যবস্থার আরও বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে অগ্রগতি সীমিত।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদনকারী মাইক্রন চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর আরও বিধিনিষেধ আরোপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কোম্পানিটির যুক্তি, চীন থেকে চিপ কেনার সুযোগ বাড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
চিপ নির্মাতারাও সরকারের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ চান না
তবে সব চিপ নির্মাতা সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপ সমর্থন করছে না। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বাণিজ্য সংগঠন সেমি জুলাইয়ে মেমোরি চিপের দাম বা বণ্টন কীভাবে হবে, তা সরকার নির্ধারণের উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে।
সংগঠনটি বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো, নিয়ন্ত্রণমূলক বিধি কমানো এবং দেশীয় উৎপাদন উৎসাহিত করার জন্য কর সুবিধা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
এসকে হাইনিক্সও জানিয়েছে, বাড়তি চাহিদা মেটাতে উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে এবং এ বছর মূলধনী ব্যয় ৫০ শতাংশ বাড়ানো হবে।
সব মিলিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান এখন শুধু প্রযুক্তি খাতের প্রতিযোগিতার বিষয় নয়। এর প্রভাব স্মার্টফোন, গাড়ি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ভোক্তা ইলেকট্রনিকস এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়ছে। ফলে মেমোরি চিপের সংকট আগামী দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পনীতি, বাণিজ্যনীতি ও প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্যকেন্দ্রগুলো যত বেশি চিপ শুষে নেবে, অন্য শিল্পগুলো তত বেশি সরকারের কাছে সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি তুলবে। আর সেই চাপ সামলাতে গিয়ে ওয়াশিংটনকে একদিকে মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা—দুই দিকই একসঙ্গে সামলাতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















