ইরানের হামলার আশঙ্কায় গত মাসে তুরস্কের আঙ্কারায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গোপনে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একই সময় বিমানটিতে থাকা সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক সদস্য ও সাংবাদিকদের অধিকাংশকে সেই ঝুঁকির কথা জানানো হয়নি। ফলে প্রেসিডেন্টকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার গোপন কৌশলটি অন্য যাত্রীদের অজান্তেই সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল কি না, তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।
আঙ্কারায় নজিরবিহীন গোপন অভিযান
৮ জুলাই আঙ্কারা থেকে ব্রিটেনের উদ্দেশে উড্ডয়নের আগে ট্রাম্পকে গোপনে বিমান থেকে সরিয়ে অন্য একটি সামরিক বিমানে তোলা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে এমনকি ক্যাটারিংয়ের একটি কনটেইনার ব্যবহারের মতো গোপন কৌশল নেওয়া হয়েছিল। এরপর এয়ার ফোর্স ওয়ানেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট, জ্যেষ্ঠ সহযোগী স্টিফেন মিলার ও স্টিভেন চিউংসহ সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক সদস্য ও সাংবাদিকরা ব্রিটেনে উড়ে যান। ট্রাম্প পরে গোপনে আবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে উঠে ক্যামেরার সামনে এমনভাবে নামেন, যেন তিনি পুরো যাত্রাটিই ওই বিমানে ছিলেন।
সাংবাদিকদের জানানো হয়নি ঝুঁকির মাত্রা
বিমানটি মাটিতে থাকা অবস্থায় সাংবাদিকদের জানালার পর্দা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল। তবে তাদের অনেকেই জানতেন না যে প্রেসিডেন্টকে বিমান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কিংবা বিমানের ওপর হামলার আশঙ্কা কতটা গুরুতর ছিল। কর্মকর্তাদের মতে, রুবিও হুমকির বিষয়ে অবগত ছিলেন। কিন্তু হোয়াইট হাউসের অন্তত কিছু কর্মী এবং সাংবাদিকরা বিষয়টি জানতেন না।

এ নিয়েই সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাবেক হোয়াইট হাউস প্রেস সেক্রেটারি জো লকহার্টের মতে, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে অন্যদের সম্ভাব্য ‘মানবঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত নয়। বিপরীতে সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা জোসেফ ডব্লিউ হ্যাগিন বলেছেন, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এমন গোপনীয়তা প্রয়োজন হতে পারে এবং ঝুঁকিপূর্ণ হোয়াইট হাউস সফরে থাকা ব্যক্তিরা এমনিতেই বাড়তি ঝুঁকি গ্রহণ করেন।
আগেও প্রেসিডেন্টদের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে ছদ্মকৌশল
মার্কিন প্রেসিডেন্টদের নিরাপত্তায় বিভ্রান্তিমূলক কৌশল নতুন নয়। মোটরকেডে একই ধরনের দুটি গাড়ি এবং মেরিন ওয়ানের সঙ্গে একাধিক অভিন্ন হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয় সম্ভাব্য হামলাকারীদের বিভ্রান্ত করতে। যুদ্ধক্ষেত্রে জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা ও ট্রাম্পের সফরেও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে সাধারণত সফরের ঝুঁকি সম্পর্কে নির্বাচিত সাংবাদিকদের কিছুটা জানানো হতো।
বিল ক্লিনটনের পাকিস্তান সফরেও বিমান বদলের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সে সময় অন্তত একজন সাংবাদিককে আগে জানানো হয়েছিল এবং পরে পুরো বিষয়টি প্রকাশ করা হয়। ট্রাম্পের আঙ্কারা অভিযানের ক্ষেত্রে বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পায় ঘটনার বেশ পরে।

নিরাপত্তা বনাম জানার অধিকার
সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা জন এফ. কিরবি বলেছেন, প্রেসিডেন্টকে নিরাপদ রাখতে গোয়েন্দা তথ্য গোপন রাখা বোধগম্য। কিন্তু প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ভ্রমণকারী অন্যদের নিরাপত্তার বিষয়টিও প্রশাসনের দায়িত্ব। ঝুঁকি যদি আগে থেকেই জানা থাকে, তাহলে অন্তত সেই ঝুঁকির সাধারণ মাত্রা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।
অন্যদিকে হ্যাগিনের মতে, এমন গোপন অভিযান ফাঁস হয়ে যাওয়াই সবচেয়ে বড় সমস্যা। কারণ একবার কোনো কৌশল প্রকাশ হয়ে গেলে ভবিষ্যতে একই পদ্ধতিতে প্রেসিডেন্টকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে।
ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, তিনি সিক্রেট সার্ভিসের পরামর্শ মেনেই বিমান বদল করেছিলেন এবং অন্য যাত্রীদের বেশি ঝুঁকিতে ফেলার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন। হোয়াইট হাউস অবশ্য এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















