ভারতে বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধান আনার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ সংশোধনী বিল ২০২৬ নিয়ে সংসদে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের প্রবল আপত্তির মধ্যেই বুধবার লোকসভা বিলটি যৌথ সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, প্রস্তাবিত আইনটি বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে। তবে সরকার এই অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছে।
৩১ সদস্যের কমিটি গঠন
বিলটি পর্যালোচনার জন্য গঠিত যৌথ সংসদীয় কমিটিতে লোকসভা থেকে ২১ জন এবং রাজ্যসভা থেকে ১০ জন সদস্য থাকবেন। লোকসভার সদস্যদের মনোনয়ন দেবেন স্পিকার ওম বিড়লা এবং রাজ্যসভার সদস্যদের মনোনয়ন করবেন চেয়ারম্যান সি পি রাধাকৃষ্ণন।
চলতি বছরের শীতকালীন অধিবেশনের প্রথম সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে লোকসভায় তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
বুধবার দুপুরে লোকসভা পুনরায় বসার ঠিক আগে বিলটি যৌথ কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব কার্যসূচির অতিরিক্ত তালিকায় যুক্ত করা হয়। এর আগে সকাল ১১টায় অধিবেশন শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিরোধীদের বিক্ষোভের কারণে সভা মুলতবি হয়ে যায়। পরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পরিবর্তে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই প্রস্তাবটি সংসদে উপস্থাপন করেন।
সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এমন একটি কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলা হয়েছে, যা কোনো প্রতিষ্ঠানের বিদেশি অনুদান গ্রহণের অনুমতি বা লাইসেন্স বাতিল হলে সেই প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও নিষ্পত্তির দায়িত্ব নিতে পারবে।
এই বিধান নিয়েই মূল আপত্তি বিরোধীদের। তাদের আশঙ্কা, এর ফলে বৈধভাবে বিদেশি অর্থ নিয়ে কাজ করা খ্রিস্টান সংগঠনসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরিচালিত সামাজিক কল্যাণ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমস্যায় পড়তে পারে।
কংগ্রেস নেতা কে সি ভেনুগোপাল সংসদে বিলটি প্রত্যাহারের দাবি জানান। তাঁর অভিযোগ, প্রস্তাবিত আইনটি মূলত বেসরকারি সংস্থাগুলোকে লক্ষ্য করে আনা হয়েছে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরিচালিত সংগঠনগুলোর ওপর এর প্রভাব বেশি পড়তে পারে।
সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবও বিলটি প্রত্যাহারের দাবি জানান। তাঁর বক্তব্য, পুরো বিরোধী শিবিরই এই বিলের বিরোধিতা করছে। তিনি সরকারের কাছে জানতে চান, এখন পর্যন্ত এমন কোনো বিল আনা হয়েছে কি না, যার বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ ওঠেনি।
দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগমের নেতা টি আর বালুও বিলটি প্রত্যাহারের দাবি জানান।

‘সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে একটি ধারা দেখান’
সরকার অবশ্য বিরোধীদের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ করে বলেন, বিলের কোন ধারা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে—তা তারা দেখিয়ে দিক।
তিনি বলেন, বিল নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে যৌথ সংসদীয় কমিতে তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এই বিল কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন।
রিজিজুর বক্তব্য, বিলটি যৌথ সংসদীয় কমিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তকে বিরোধীদের স্বাগত জানানো উচিত ছিল। কারণ কমিটিতে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে। তাঁর অভিযোগ, বিলটি নিয়ে দেশে বিভ্রান্তিকর প্রচার চালানো হচ্ছে এবং এ ধরনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকা প্রয়োজন।
বাজেট অধিবেশনেও এগোয়নি বিল
বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ সংশোধনী বিলটি চলতি বছরের ২৫ মার্চ লোকসভায় উত্থাপন করা হয়েছিল। তবে বাজেট অধিবেশনে এটি পাসের জন্য আর এগোয়নি। এবার বর্ষাকালীন অধিবেশনে বিলটি যৌথ সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।
এদিকে বুধবার বিলটি নিয়ে প্রস্তাব অনুমোদনের পর লোকসভা কিছু সময়ের জন্য আবার মুলতবি করা হয়। পরে বিকেল ৩টায় সভা বসলে কোনো আলোচনা ছাড়াই খনি ও খনিজ সংক্রান্ত একটি বিল পাস করা হয়।
সংসদ সচল রাখার আহ্বান স্পিকারের
বিরোধীদের বিক্ষোভ ও স্লোগানের কারণে সংসদের কার্যক্রম বারবার ব্যাহত হওয়ায় স্পিকার ওম বিড়লা সকালে সব দলের সদস্যদের সংসদ সচল রাখার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, সরকার ও বিরোধীদের মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেই কারণে সংসদের কার্যক্রম অচল করে দেওয়া উচিত নয়। বিক্ষোভ ও স্লোগানের মাধ্যমে সংসদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা দেশের জন্যও ভালো নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ সংশোধনী বিল এখন যৌথ সংসদীয় কমিটির পর্যালোচনার মুখে। ফলে বিলটির বিতর্কিত বিধানগুলো নিয়ে আগামী শীতকালীন অধিবেশনের আগে বিস্তারিত আলোচনা ও রাজনৈতিক দর-কষাকষির সুযোগ তৈরি হলো।
বিদেশি অনুদান গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ কতটা বাড়ানো হবে এবং সেই নিয়ন্ত্রণে সংখ্যালঘু ও বেসরকারি সামাজিক সংগঠনগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম কতটা প্রভাবিত হবে—এই প্রশ্নই এখন বিলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে মূল বিতর্ক হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















