যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ একসময় শেষ হতে পারে, যুদ্ধবিরতি হতে পারে, এমনকি দুই দেশ আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরতে পারে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে ইরানের দীর্ঘদিনের হুমকি ও প্রতিশোধের আশঙ্কা সহজে শেষ হবে না—তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনের সময় ট্রাম্পকে গোপনে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় এমন বাস্তবতাই সামনে এসেছে।
গত জুলাইয়ে তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলন শেষে ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে সম্ভাব্য ইরানি হামলার গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর মার্কিন কর্মকর্তারা নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেন। প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠানো হলেও পরে বিমানবন্দরের একটি খাবার সরবরাহকারী গাড়ির মাধ্যমে তাকে গোপনে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর অন্য একটি সামরিক বিমানে তাকে ব্রিটেনে পাঠানো হয়। একই সময়ে এয়ার ফোর্স ওয়ানকে বিভ্রান্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ট্রাম্পকে ঘিরে ব্যক্তিগত সংঘাত
ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের বিরোধ শুধু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের ভূরাজনৈতিক সংঘাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এতে ব্যক্তিগত প্রতিশোধের বিষয়টিও দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত হয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরুর পর ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তাকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন। এর আগে ২০২০ সালে ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান মেজর জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। ওই হত্যাকাণ্ডের পর ইরান প্রতিশোধের ঘোষণা দেয় এবং ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হুমকি অব্যাহত থাকে।
এরপর মার্কিন কর্তৃপক্ষ ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে ইরান-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কথিত ষড়যন্ত্রের তথ্যও সামনে আনে। চলমান যুদ্ধে খামেনি ও ইরানের আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার নিহত হওয়ার ঘটনায় সেই পুরোনো সংঘাত নতুন মাত্রা পায়।
![]()
দুর্বল ইরান, তবু বড় হুমকি
ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, যুদ্ধের ফলে ইরানের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে একটি দেশের সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা আর সেই দেশের ব্যক্তিগত পর্যায়ে হামলা চালানোর সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ করে দেওয়া এক বিষয় নয়।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং সীমান্তের বাইরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এখনো সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মার্কিন কংগ্রেস সদস্য ন্যাথানিয়েল মোরানও বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতায় বড় ধরনের ক্ষতি হলেও হুমকি এখনো রয়েছে।
এদিকে যুদ্ধের বৃহত্তর পরিণতিও পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। হরমুজ প্রণালির কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত রয়েছে, যদিও ট্রাম্প এটি উন্মুক্ত থাকার দাবি করেছেন। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনাও এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি।
যুদ্ধের পরও প্রতিশোধের আশঙ্কা
দীর্ঘ সংঘাতের ফলে মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়া ভবিষ্যতে ইউক্রেন ও উপসাগরীয় মিত্রদের সহায়তার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতাকে চাপে ফেলতে পারে।
ট্রাম্প জুলাইয়ে হুমকি দিয়েছিলেন, ইরান তাকে হত্যার চেষ্টা করলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। ফলে ওয়াশিংটন ও তেহরান শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ থামালেও দুই দেশের মধ্যকার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বৈরিতা দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
সোলেইমানি হত্যার পর শুরু হওয়া প্রতিশোধের অধ্যায়, ২০২৬ সালে খামেনির নিহত হওয়া এবং এরপর তুরস্ক থেকে ট্রাম্পকে গোপনে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা দেখাচ্ছে—যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলেও শত্রুতা, ক্ষোভ ও প্রতিশোধের আশঙ্কা আরও দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ, ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইরানের হুমকি ও প্রতিশোধের আশঙ্কা নিয়ে নতুন করে সামনে এসেছে তুরস্ক থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে গোপনে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















