বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনগুলো একদিকে যেমন নতুন স্বপ্ন, স্বাধীনতা আর উত্তেজনায় ভরা, অন্যদিকে তেমনই তৈরি করতে পারে নানা প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা। স্কুলজীবনের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার ধরন আলাদা। এখানে দৈনন্দিন রুটিন অনেক কম বাঁধাধরা, আর নিজের শেখার দায়িত্বও অনেক বেশি নিজের কাঁধে নিতে হয়।
তবে প্রথম বছর নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা বলছে, শুরু থেকেই কিছু ভালো অভ্যাস তৈরি করতে পারলে পড়াশোনা, বন্ধুত্ব এবং আনন্দ—তিনটিকেই সুন্দরভাবে সামলে নেওয়া সম্ভব।
বিশ্ববিদ্যালয় মানেই যে স্কুলের চেয়ে কঠিন, এমন নয়
আবুধাবির সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাদাল্লাহ বেনজেলুন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি তিনি জানতে চাইতেন, তা হলো একাডেমিক পরিবর্তন নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।
তার ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা সব সময় উচ্চবিদ্যালয়ের তুলনায় কঠিন হবে—এমন নয়। ধীরে ধীরে পড়াশোনার মান বাড়ে। নিয়মিত পড়াশোনা করা এবং আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া গেলে উদ্বিগ্ন হওয়ার তেমন কারণ থাকে না।
প্রথম কয়েক সপ্তাহ কিছুটা কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মনে রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় মূলত তাদের আগের শিক্ষাজীবনেরই একটি স্বাভাবিক পরবর্তী ধাপ।
পড়াশোনার চাপ হবে ভিন্ন ধরনের
স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পড়াশোনার রুটিনেও বড় পরিবর্তন আসে।
আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব শারজাহর শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আল কাদি বলেন, একসঙ্গে বেশি পড়াশোনার চাপ সামলানো ছিল তার জন্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি।
একটি সেমিস্টারে পাঁচটি বিষয় পড়তে হতে পারে এবং প্রতিটি বিষয়ের জন্য আলাদা পরীক্ষা, কাজ ও জমা দেওয়ার সময় থাকতে পারে। ফলে কয়েকটি বিষয়ের কাজ একই সপ্তাহে এসে পড়লে চাপ অনেক বেড়ে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে শুরু থেকেই কোন কাজ কখন জমা দিতে হবে, কোন পরীক্ষা কবে এবং কোন বিষয়ের জন্য কতটা প্রস্তুতি প্রয়োজন—এসবের হিসাব রাখা খুব জরুরি। তা না হলে একসময় সব কাজ একসঙ্গে জমে গিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
কাজ হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু করুন
দুই শিক্ষার্থীই প্রথম বছর থেকেই ভালো পড়াশোনার অভ্যাস তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
মোহাম্মদ আল কাদির পরামর্শ, কোনো কাজ হাতে পাওয়ার পর শেষ সময়ের জন্য অপেক্ষা না করে যত দ্রুত সম্ভব সেটি শুরু করা উচিত। বড় পরীক্ষার ক্ষেত্রেও অন্তত কয়েক দিন আগে, সম্ভব হলে এক সপ্তাহ আগে প্রস্তুতি শুরু করা ভালো।
আগে থেকে কাজ শুরু করলে কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে শিক্ষক বা সহপাঠীর সাহায্য নেওয়ার সময় পাওয়া যায়। পাশাপাশি নিজের কাজ সংশোধন করার এবং আরও ভালো করার সুযোগও থাকে।
জাদাল্লাহ বেনজেলুনও প্রথম বছরকে নিয়মিত পড়াশোনার অভ্যাস তৈরির সময় হিসেবে দেখেন। তার মতে, প্রথম বছরে কিছুটা সময় ও আনন্দ বিসর্জন দিয়ে শক্ত ভিত্তি তৈরি করা, একটি নির্দিষ্ট রুটিন গড়ে তোলা এবং নিয়মিত কাজ করার অভ্যাস তৈরি করা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের কাজ নিজে করার ওপরও তিনি জোর দেন। প্রয়োজনে গ্রন্থাগার বা এমন কোনো জায়গায় বসে পড়াশোনা করা যেতে পারে, যেখানে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ।
শুধু মুখস্থ নয়, বুঝে শেখার চেষ্টা করুন
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বড় সুযোগ হলো নিজের শেখার পদ্ধতিকে আরও স্বাধীন ও গভীর করে তোলা।
জাদাল্লাহ বেনজেলুনের মতে, শুধু পাঠ্যসূচির বিষয় মুখস্থ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নিজের পছন্দের বিষয় সম্পর্কে আরও জানতে আগ্রহী হতে হবে।
তার মূল পরামর্শ হলো, শুধু মুখস্থ করার বদলে বোঝাকে শিক্ষাজীবনের প্রধান নীতি হিসেবে গ্রহণ করা।
শ্রেণিকক্ষে যা পড়ানো হয়, তার মধ্যেই নিজেকে আটকে না রেখে শিক্ষার্থীদের নিজেদের মতো করে গবেষণা করারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। কোনো বিষয় সম্পর্কে আগে থেকেই নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি না করে কৌতূহলী মন নিয়ে আরও জানার চেষ্টা করতে হবে।
বন্ধু তৈরি করুন, তবে সঙ্গী বেছে নিন বুঝে
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়। নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, নতুন আগ্রহ খুঁজে পাওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের অংশ হওয়াও শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জাদাল্লাহ বেনজেলুন শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের বাইরের বিভিন্ন সুযোগ কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন। সম্মেলন, শিক্ষার্থী উদ্যোগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠনে যুক্ত হওয়া নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
মোহাম্মদ আল কাদির মতে, বন্ধুত্বও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নতুন বন্ধু তৈরি করতে হবে, নিজের পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে যে কারও কাছে সাহায্য চাইতে দ্বিধা করা উচিত নয়।
তবে অনেক বড় বন্ধুমহল তৈরি করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। বরং সঠিক মানুষদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এমন বন্ধু বেছে নেওয়া ভালো, যারা নিজেরাও দায়িত্বশীল, পরিশ্রমী এবং ইতিবাচকভাবে এগিয়ে যেতে চায়।

পড়াশোনার পাশাপাশি আনন্দও থাকুক
ভালো ফলাফল করতে হলে আনন্দ বিসর্জন দিতে হবে—এমন ধারণাও ঠিক নয়।
মোহাম্মদ আল কাদি মনে করেন, প্রথম বছরটি একাডেমিকভাবে শক্ত ভিত্তি তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আনন্দও উপভোগ করা সম্ভব।
তার মতে, প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক বেশি আনন্দ করার দিকে মনোযোগ দেয়। আনন্দ করা ভুল নয়, কিন্তু প্রথম বছরই ভালো ফলাফলের ভিত্তি তৈরি করার এবং নিজের জন্য একটি উচ্চ মানদণ্ড নির্ধারণ করার গুরুত্বপূর্ণ সময়। তাই দুটোর মধ্যে ভারসাম্য রাখা সম্ভব।
পড়াশোনার বাইরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও অংশ নেওয়া যেতে পারে। এতে নিজের ব্যক্তিত্ব বিকশিত হওয়ার পাশাপাশি নিজের পড়ার বিষয়ের বাইরে নতুন আগ্রহ ও দক্ষতা আবিষ্কার করার সুযোগ পাওয়া যায়।
সবকিছু সঙ্গে সঙ্গে ঠিক হয়ে যাবে—এমন আশা করবেন না
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন থেকেই সবকিছু নিজের মতো করে সাজানো হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা না রাখাই ভালো।
জাদাল্লাহ বেনজেলুন নতুন শিক্ষার্থীদের ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ভয়, দুশ্চিন্তা কিংবা মানসিক চাপকে নিজের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়া উচিত নয়।
নিজের জন্য সময় রাখতে হবে। দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী সহপাঠীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে এবং প্রয়োজনে সাহায্য চাইতে হবে।
একই সঙ্গে নিজের স্বকীয়তাও ধরে রাখতে হবে। নিজের পরিচয়, পথচলা এবং অতীত নিয়ে আত্মবিশ্বাসী থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে হবে।
প্রথম বছর শুধু ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য নয়
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছর আসলে শুধু ভালো ফলাফল করার সময় নয়। এটি নিজের জন্য কার্যকর পড়াশোনার পদ্ধতি খুঁজে বের করা, ভালো অভ্যাস তৈরি করা, নতুন বন্ধু পাওয়া এবং ভবিষ্যতের বছরগুলোর জন্য আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার সময়।
নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগতেই পারে। তবে নিয়মিত পড়াশোনা, বাস্তবসম্মত রুটিন, প্রয়োজনের সময় সাহায্য চাওয়া এবং সামাজিক জীবনের জন্যও কিছুটা সময় রাখলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন অনেক সহজ ও আনন্দময় হয়ে উঠতে পারে।
প্রথম দিন থেকেই সবকিছু জানতে বা বুঝতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। বরং ধীরে ধীরে এমন অভ্যাস, বন্ধুত্ব ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ, যা পুরো বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছর তাই শুধু পরীক্ষার ফলাফলের গল্প নয়; এটি নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার, নিজের পথ তৈরি করার এবং ভবিষ্যতের ভিত্তি শক্ত করার সময়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছর, পড়াশোনার চাপ, বন্ধুত্ব, সময় ব্যবস্থাপনা ও আনন্দ—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রেখে কীভাবে সফলভাবে এগিয়ে যাওয়া যায়, তা নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















