চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনার মাত্র এক মাস আগে ওই জাহাজভাঙা ইয়ার্ডের বিরুদ্ধে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। বারবার নির্দেশনা ও তাগাদা দেওয়া হলেও কর্তৃপক্ষ সেগুলো বাস্তবায়ন করেনি বলে জানিয়েছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর।
গত ১৫ জুলাই ফেরদৌস করপোরেশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে মামলা করে অধিদপ্তর। এর ঠিক এক মাসের মাথায় সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফেরদৌস স্টিলের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে প্রাণ হারান ৯ শ্রমিক।
অভিযোগ রয়েছে, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই ইয়ার্ডে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল কর্তৃপক্ষ। আর সেই অব্যবস্থাপনার মধ্যেই ঘটে গেল প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
পুরোনো জাহাজে কাটার কাজ, হঠাৎ গ্যাসের বিস্তার
সকাল প্রায় ৮টার দিকে ইয়ার্ডে নোঙর করা একটি পুরোনো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজের ভেতরে লোহালক্কড় কাটার কাজ করছিলেন শ্রমিকেরা। কাজের একপর্যায়ে জাহাজের ভেতরে হঠাৎ গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। এতে সেখানে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা ভয়াবহভাবে বেড়ে যায়।
অক্সিজেনের অভাবে শ্রমিকদের শ্বাস নিতে তীব্র কষ্ট হয়। একপর্যায়ে কয়েকজন অচেতন হয়ে পড়েন। ঘটনাস্থলেই পাঁচ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চার শ্রমিক মারা যান।
এ ঘটনায় আরও ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন অথবা গুরুতর আহত হন। তাঁদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
আগেই ধরা পড়েছিল নিরাপত্তার ঘাটতি
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর জানিয়েছে, এর চট্টগ্রাম কার্যালয় অতীতেও ওই জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে একাধিকবার পরিদর্শন চালিয়েছিল। সেসব পরিদর্শনে বিভিন্ন নিরাপত্তা অনিয়ম ধরা পড়েছিল এবং কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছিল।
চট্টগ্রামে অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান জানান, নিয়মিত পরিদর্শনের সময় ইয়ার্ডটিতে বেশ কিছু অনিয়ম পাওয়া যায়।
তিনি জানান, ওই পরিদর্শনের পর চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি ফেরদৌস স্টিলকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এরপর একাধিকবার তাগাদা দেওয়া হলেও কারখানা কর্তৃপক্ষ নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন করেনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে মামলা করা হয়।
অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. সাহেদ পারভেজ তালুকদার মামলাটি করেন।
তিন দফায় নির্দেশ, তবু হয়নি নিরাপত্তা নিশ্চিত
অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২ ফেব্রুয়ারির পরিদর্শনে বেশ কিছু নিরাপত্তাগত ঘাটতি শনাক্ত করা হয়েছিল। এসব ঘাটতি সংশোধনের জন্য কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়।
এরপর ৪ মে আবারও পরিদর্শন করা হয়। কিন্তু তখনও আগের নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে কর্তৃপক্ষকে আবার তাগাদা দেওয়া হয়।
পরে ৮ জুন দেওয়া হয় চূড়ান্ত নোটিশ ও তাগাদা। সেখানে অগ্নিনিরাপত্তা ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু এসব নির্দেশনা কার্যকর হওয়ার আগেই ঘটে গেল ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
দুর্ঘটনার পর পরিদর্শনে গিয়ে হামলার শিকার দুই পরিদর্শক
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের একটি দল। এ সময় একটি বিক্ষুব্ধ জনতা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে দুই শ্রম পরিদর্শক গুরুতর আহত হন।
পরে স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি যৌথ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
জাহাজে ঢোকার আগে গ্যাস পরীক্ষা করা হয়নি?
স্থানীয় শ্রমিক নেতা ফজলুর কবির মিন্টু অভিযোগ করেন, জাহাজের ভেতরে জমে থাকা তরল বর্জ্য কিংবা গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা না করেই শ্রমিকদের সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
তাঁর ভাষ্য, এটি মালিকপক্ষের অবহেলা। শুধু তা-ই নয়, যেদিন ইয়ার্ড বন্ধ থাকার কথা ছিল, সেদিনও সেখানে কাজ চলছিল। এসব বিষয় তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
জাহাজটি ভাঙার অনুমতি ছিল কি না, তদন্তে বের হবে
দুর্ঘটনার পর আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—যে জাহাজটি ভাঙার কাজ চলছিল, সেটি ভাঙার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি ছিল কি না।
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান জানান, শুধু পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছ থেকেই এ ধরনের অনুমতি নেওয়া হয় না। বিস্ফোরক অধিদপ্তরসহ একাধিক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন।
তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির কোন কোন জাহাজের অনুমোদন রয়েছে এবং কোনগুলোর নেই, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। কারণ পুরো এলাকা ঘিরে রাখায় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শকেরা সেখানে প্রবেশ করতে পারেননি। তদন্ত শেষ হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।
নিরাপত্তা নিয়ে একের পর এক সতর্কবার্তা, নোটিশ ও তাগাদার পরও যদি কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়ে থাকে, তাহলে সীতাকুণ্ডের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়—কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাব্যবস্থার ভয়াবহ ব্যর্থতারও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এখন তদন্তে বেরিয়ে আসতে হবে, কার অবহেলায় ৯টি প্রাণ অকালে ঝরে গেল এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আগের নির্দেশনাগুলো কেন বাস্তবায়ন করা হয়নি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















