০৯:০৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
গ্যাস সংকটে হবিগঞ্জে ১৭১ কারখানা বন্ধ, কর্মহীন লক্ষাধিক শ্রমিক কুষ্টিয়ায় বালুবাহী যান পদ্মায়, নিখোঁজ ৮ বছরের শিশু ১৫ আগস্ট ঘিরে ঢাকায় কঠোর নিরাপত্তা, মাঠে ডিএমপির বিশেষ ইউনিট নেপালের নতুন রাজনৈতিক তারকার আলো কেন ম্লান হয়ে আসছে সেন্ট্রাল পার্কে শেক্সপিয়রের ‘শীতের কাহিনি’, পুরোনো আবহে নতুন মুগ্ধতা উপাসনা করতে গিয়ে কোনো আমেরিকান যেন ভয়ে পিছিয়ে না যান জেন-জি রাজনীতির ভাষা বুঝতে পারছে না প্রচলিত দলগুলো? ট্রাম্পের গোপন বিমানযাত্রা: ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য কতটা বাড়ছে গ্রিসের দ্বীপভ্রমণের স্বপ্ন, নাকি ‘বমির ধূমকেতু’? উত্তাল সাগরে পর্যটকদের নাজেহাল দশা অ্যাপলের টেক্সাসে নতুন কারখানা: ম্যাক মিনি উৎপাদন ও কর্মীদের প্রশিক্ষণে বড় বিনিয়োগ

গ্রিসের দ্বীপভ্রমণের স্বপ্ন, নাকি ‘বমির ধূমকেতু’? উত্তাল সাগরে পর্যটকদের নাজেহাল দশা

গ্রিসের দ্বীপে দ্বীপে ঘুরে বেড়ানো—সাদা রঙের বাড়ি, নীল সমুদ্র, সোনালি সৈকত, মনোরম সূর্যাস্ত আর প্রাচীন ইতিহাসের টানে প্রতি গ্রীষ্মেই লাখো পর্যটক ছুটে যান দেশটিতে। কিন্তু সেই স্বপ্নের ভ্রমণ সব সময় যে মসৃণ হয়, তা নয়। বিশেষ করে দ্রুতগতির ছোট ফেরিতে এজিয়ান সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক পর্যটকের কাছে আনন্দের যাত্রাই পরিণত হচ্ছে চরম দুর্ভোগে।

অস্টিন ক্রোটো স্বামী ও চার সন্তানকে নিয়ে গ্রিসের সাইরোস দ্বীপ থেকে এথেন্সের উদ্দেশে ফেরিতে উঠেছিলেন। যাত্রা শুরুর সময় এজিয়ান সাগর ছিল শান্ত। কিন্তু বন্দর ছাড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়তে থাকে ফেরিতে। জাহাজটি প্রচণ্ডভাবে দুলতে শুরু করে এবং জানালার বাইরে পানি উঠে আসতে দেখা যায়।

ক্রোটোর ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মীরা যাত্রীদের সাহায্য করতে ছুটে আসেন। কেউ কেউ যাত্রীদের হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছিলেন, আবার অনেকে একের পর এক বমির ব্যাগ বিলি করছিলেন। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, বাথরুমে যাওয়ার চেষ্টা করাও যেন অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

আনন্দের বদলে বমিভাব ও আতঙ্ক

ক্রোটো জানান, মনে হচ্ছিল যাত্রীদের প্রায় অর্ধেকই আগের রাতের পার্টির পর ক্লান্ত বা অস্বস্তিতে ছিলেন। চারপাশে অনেককে ফ্যাকাশে মুখে মাথা হাতে নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। সবার চোখেমুখে ছিল বমি করার প্রবল আশঙ্কা।

নিজের সন্তানকে এমন অবস্থায় আগে কখনো দেখেননি ক্রোটো। তিনি বলেন, তার সন্তানের মুখ পুরোপুরি সবুজ হয়ে যেতে দেখে তিনি বুঝতে পারেন, কার্টুনে বমিভাবের সময় মানুষের মুখ সবুজ দেখানোর ধারণাটি সম্ভবত বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই এসেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অসংখ্য ভিডিও ও পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে পর্যটকেরা দ্রুতগতির এসব ফেরিকে কখনো ‘বমির ধূমকেতু’, কখনো আবার ‘দুঃস্বপ্নের যাত্রা’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।

ন্যাক্সোস থেকে মিলোস: ছয় ঘণ্টার দুঃসহ যাত্রা

২৫ বছর বয়সী এমিলি স্যাভেজ তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর সঙ্গে গ্রিসে একটি শান্তিপূর্ণ ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ন্যাক্সোস থেকে মিলোস যাওয়ার পথে উত্তাল ফেরিযাত্রা তার সেই পরিকল্পনাকে পুরোপুরি বদলে দেয়।

তার ভাষায়, ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌযানটি এমনভাবে লাফিয়ে উঠছিল যে যাত্রীরা কয়েক ইঞ্চি পর্যন্ত বাতাসে উঠে যাচ্ছিলেন। এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে।

ফেরি পথে যাত্রী ওঠানামার সময়ও অনেকে চোখ বন্ধ করে বসে ছিলেন এবং সমুদ্রযাত্রাজনিত অসুস্থতা কমানোর ওষুধ একে অন্যের মধ্যে ভাগ করে নিচ্ছিলেন। স্যাভেজের কাছে পরিস্থিতিটি শেষ পর্যন্ত এক ধরনের সম্মিলিত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছিল।

ভ্রমণ সংস্থা হেলেনিক হলিডেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পেট্রোস জিসিমোস বলেন, মিলোসগামী যাত্রীদের জন্য এমন অভিজ্ঞতা অস্বাভাবিক নয়। ন্যাক্সোস থেকে মিলোস যাওয়ার পথে এজিয়ান সাগরের বাণিজ্যিক বায়ুর প্রবাহের বিপরীতে চলতে হয় বলে নৌযান যেটিই হোক, সমুদ্র অনেক সময় উত্তাল থাকবেই।

গ্রীষ্মে বাড়ে ঝুঁকি

গ্রীষ্মকালে প্রবল বাতাস সাইক্লেডিস দ্বীপপুঞ্জের চারপাশের সমুদ্রকে আরও উত্তাল করে তোলে। অথচ এই সময়ই পর্যটকের ঢল নামে মাইকোনোস, ন্যাক্সোস ও মিলোসের মতো জনপ্রিয় দ্বীপগুলোতে।

গ্রিসের পশ্চিম উপকূলের আইওনিয়ান দ্বীপগুলোতে অবশ্য তুলনামূলক শান্ত সমুদ্র পাওয়া যায়।

সোনালি সৈকত, সাদা ধবধবে গ্রাম, অসাধারণ সূর্যাস্ত এবং হাজার বছরের ইতিহাসের কারণে গ্রিসের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত দেশটিতে আগত পর্যটকের সংখ্যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ২১ শতাংশ বেশি হয়েছে। গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্রিসে আসা পর্যটকের সংখ্যাও প্রায় চার গুণ বেড়েছে।

এথেন্স, মাইকোনোস ও সান্তোরিনির বন্দরে এখন নিয়মিত ভিড় করছে প্রমোদতরী। ভ্রমণ বিশেষজ্ঞ জিসিমোসের মতে, মহামারির পর গ্রিস খুব দ্রুত পর্যটন খাতকে ঘুরে দাঁড় করাতে পেরেছে এবং গত তিন বছর ধরে দেশটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

High-speed boats ferrying tourists between idyllic islands have turned  Odyssean for some travelers. https://on.wsj.com/3UvydMF

উত্তাল সমুদ্র মানেই বিপজ্জনক নয়

১৯৬৬ সালে প্রবল বাতাসের কারণে এজিয়ান সাগরে একটি গ্রিক ফেরি ডুবে যাওয়ার পর দেশটিতে নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তা বিধি চালু করা হয়।

পারোসের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ফেরি বিশেষজ্ঞ স্পাইরিডন রুসোসের মতে, কোনো জাহাজ যদি যাত্রা শুরু করে, তার অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নাবিকেরা মনে করছেন পরিস্থিতি যাত্রার জন্য যথেষ্ট নিরাপদ। পানি যতই উত্তাল মনে হোক না কেন, সেটি সব সময় বিপদের লক্ষণ নয়।

রুসোস বলেন, গ্রিক ফেরির অধিনায়কেরা অত্যন্ত দক্ষ এবং প্রতিদিনই এমন সমুদ্র পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।

অভিজ্ঞ পর্যটকের পরামর্শ

আমস্টারডামের ৩৩ বছর বয়সী সোফি ইয়ানসেন বছরে পাঁচবারের বেশি গ্রিসে যান এবং এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০টি দ্বীপের ফেরিতে ভ্রমণ করেছেন। একটি দুর্ভাগ্যজনক যাত্রা বাদ দিলে তার প্রায় সব অভিজ্ঞতাই ভালো ছিল।

ইয়ানসেনের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ সাধারণত সবচেয়ে বিশৃঙ্খল ও আতঙ্কজনক ভিডিওগুলোই প্রকাশ করে। ফলে দেখে মনে হতে পারে প্রতিদিনই এমন ঘটনা ঘটছে, বাস্তবে তা নয়।

তিনি গ্রিসের বিস্তৃত ফেরি ব্যবস্থার প্রশংসা করেন। তার মতে, দেশটির অধিকাংশ জনবসতিপূর্ণ দ্বীপকে সংযুক্ত করা এই ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে বিমানে যাওয়ার চেয়েও কার্যকর।

যারা সমুদ্রযাত্রায় সহজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাদের তুলনামূলক বড় নৌযানে ভালোভাবে সংযুক্ত দ্বীপ বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। কারণ জনপ্রিয় পথ হলেও, যেমন পারোস থেকে মিলোস, বছরের নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে মাত্র একটি ছোট সরাসরি ফেরি চলতে পারে এবং সেটিও দিনে একবার।

ইয়ানসেনের পরামর্শ, ভ্রমণের আগে ভালোভাবে তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি। নিজের মাথায় থাকা পরিকল্পনা অনুযায়ী না ভেবেই সরাসরি যাত্রা শুরু করলে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

দ্রুতগতির ছোট নৌযান এড়ানোর পরামর্শ

পেট্রোস জিসিমোসও পর্যটকদের দ্রুতগতির কিন্তু ছোট নৌযান বেছে না নেওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ এসব নৌযানে ঢেউয়ের ধাক্কা তুলনামূলক বেশি অনুভূত হয়।

সমুদ্রযাত্রাজনিত অসুস্থতা কমাতে তিনি বিশেষ ধরনের ওষুধযুক্ত ত্বক-লেপন ব্যবহার অথবা চুইংগাম চিবানোর পরামর্শ দেন।

তারপরও উত্তাল ফেরিযাত্রা অস্টিন ক্রোটোর কাছে শেষ পর্যন্ত গ্রিস ভ্রমণের আনন্দকে ম্লান করতে পারেনি। তিন বছর পরিবার নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ঘোরার পর গত সেপ্টেম্বরে নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে সাইরোসে চলে আসেন তিনি।

তার কাছে গ্রিসের দ্বীপগুলোর আকর্ষণ এতটাই গভীর যে ভয় পেলেও এই অভিজ্ঞতা নেওয়া উচিত। কারণ তার ভাষায়, গ্রিক দ্বীপগুলোর মতো আর কিছুই নেই।

গ্রিসের দ্বীপভ্রমণ তাই নিঃসন্দেহে স্বপ্নের মতো—তবে সেই স্বপ্নের পথে এজিয়ান সাগরের ঢেউ কখনো কখনো পর্যটকদের এমন এক পরীক্ষার মুখোমুখি করে, যার কথা তারা ছুটির পরিকল্পনা করার সময় কল্পনাও করেননি।

জনপ্রিয় সংবাদ

গ্যাস সংকটে হবিগঞ্জে ১৭১ কারখানা বন্ধ, কর্মহীন লক্ষাধিক শ্রমিক

গ্রিসের দ্বীপভ্রমণের স্বপ্ন, নাকি ‘বমির ধূমকেতু’? উত্তাল সাগরে পর্যটকদের নাজেহাল দশা

০৭:৪৪:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

গ্রিসের দ্বীপে দ্বীপে ঘুরে বেড়ানো—সাদা রঙের বাড়ি, নীল সমুদ্র, সোনালি সৈকত, মনোরম সূর্যাস্ত আর প্রাচীন ইতিহাসের টানে প্রতি গ্রীষ্মেই লাখো পর্যটক ছুটে যান দেশটিতে। কিন্তু সেই স্বপ্নের ভ্রমণ সব সময় যে মসৃণ হয়, তা নয়। বিশেষ করে দ্রুতগতির ছোট ফেরিতে এজিয়ান সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক পর্যটকের কাছে আনন্দের যাত্রাই পরিণত হচ্ছে চরম দুর্ভোগে।

অস্টিন ক্রোটো স্বামী ও চার সন্তানকে নিয়ে গ্রিসের সাইরোস দ্বীপ থেকে এথেন্সের উদ্দেশে ফেরিতে উঠেছিলেন। যাত্রা শুরুর সময় এজিয়ান সাগর ছিল শান্ত। কিন্তু বন্দর ছাড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়তে থাকে ফেরিতে। জাহাজটি প্রচণ্ডভাবে দুলতে শুরু করে এবং জানালার বাইরে পানি উঠে আসতে দেখা যায়।

ক্রোটোর ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মীরা যাত্রীদের সাহায্য করতে ছুটে আসেন। কেউ কেউ যাত্রীদের হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছিলেন, আবার অনেকে একের পর এক বমির ব্যাগ বিলি করছিলেন। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, বাথরুমে যাওয়ার চেষ্টা করাও যেন অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

আনন্দের বদলে বমিভাব ও আতঙ্ক

ক্রোটো জানান, মনে হচ্ছিল যাত্রীদের প্রায় অর্ধেকই আগের রাতের পার্টির পর ক্লান্ত বা অস্বস্তিতে ছিলেন। চারপাশে অনেককে ফ্যাকাশে মুখে মাথা হাতে নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। সবার চোখেমুখে ছিল বমি করার প্রবল আশঙ্কা।

নিজের সন্তানকে এমন অবস্থায় আগে কখনো দেখেননি ক্রোটো। তিনি বলেন, তার সন্তানের মুখ পুরোপুরি সবুজ হয়ে যেতে দেখে তিনি বুঝতে পারেন, কার্টুনে বমিভাবের সময় মানুষের মুখ সবুজ দেখানোর ধারণাটি সম্ভবত বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই এসেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অসংখ্য ভিডিও ও পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে পর্যটকেরা দ্রুতগতির এসব ফেরিকে কখনো ‘বমির ধূমকেতু’, কখনো আবার ‘দুঃস্বপ্নের যাত্রা’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।

ন্যাক্সোস থেকে মিলোস: ছয় ঘণ্টার দুঃসহ যাত্রা

২৫ বছর বয়সী এমিলি স্যাভেজ তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর সঙ্গে গ্রিসে একটি শান্তিপূর্ণ ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ন্যাক্সোস থেকে মিলোস যাওয়ার পথে উত্তাল ফেরিযাত্রা তার সেই পরিকল্পনাকে পুরোপুরি বদলে দেয়।

তার ভাষায়, ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌযানটি এমনভাবে লাফিয়ে উঠছিল যে যাত্রীরা কয়েক ইঞ্চি পর্যন্ত বাতাসে উঠে যাচ্ছিলেন। এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে।

ফেরি পথে যাত্রী ওঠানামার সময়ও অনেকে চোখ বন্ধ করে বসে ছিলেন এবং সমুদ্রযাত্রাজনিত অসুস্থতা কমানোর ওষুধ একে অন্যের মধ্যে ভাগ করে নিচ্ছিলেন। স্যাভেজের কাছে পরিস্থিতিটি শেষ পর্যন্ত এক ধরনের সম্মিলিত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছিল।

ভ্রমণ সংস্থা হেলেনিক হলিডেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পেট্রোস জিসিমোস বলেন, মিলোসগামী যাত্রীদের জন্য এমন অভিজ্ঞতা অস্বাভাবিক নয়। ন্যাক্সোস থেকে মিলোস যাওয়ার পথে এজিয়ান সাগরের বাণিজ্যিক বায়ুর প্রবাহের বিপরীতে চলতে হয় বলে নৌযান যেটিই হোক, সমুদ্র অনেক সময় উত্তাল থাকবেই।

গ্রীষ্মে বাড়ে ঝুঁকি

গ্রীষ্মকালে প্রবল বাতাস সাইক্লেডিস দ্বীপপুঞ্জের চারপাশের সমুদ্রকে আরও উত্তাল করে তোলে। অথচ এই সময়ই পর্যটকের ঢল নামে মাইকোনোস, ন্যাক্সোস ও মিলোসের মতো জনপ্রিয় দ্বীপগুলোতে।

গ্রিসের পশ্চিম উপকূলের আইওনিয়ান দ্বীপগুলোতে অবশ্য তুলনামূলক শান্ত সমুদ্র পাওয়া যায়।

সোনালি সৈকত, সাদা ধবধবে গ্রাম, অসাধারণ সূর্যাস্ত এবং হাজার বছরের ইতিহাসের কারণে গ্রিসের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত দেশটিতে আগত পর্যটকের সংখ্যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ২১ শতাংশ বেশি হয়েছে। গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্রিসে আসা পর্যটকের সংখ্যাও প্রায় চার গুণ বেড়েছে।

এথেন্স, মাইকোনোস ও সান্তোরিনির বন্দরে এখন নিয়মিত ভিড় করছে প্রমোদতরী। ভ্রমণ বিশেষজ্ঞ জিসিমোসের মতে, মহামারির পর গ্রিস খুব দ্রুত পর্যটন খাতকে ঘুরে দাঁড় করাতে পেরেছে এবং গত তিন বছর ধরে দেশটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

High-speed boats ferrying tourists between idyllic islands have turned  Odyssean for some travelers. https://on.wsj.com/3UvydMF

উত্তাল সমুদ্র মানেই বিপজ্জনক নয়

১৯৬৬ সালে প্রবল বাতাসের কারণে এজিয়ান সাগরে একটি গ্রিক ফেরি ডুবে যাওয়ার পর দেশটিতে নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তা বিধি চালু করা হয়।

পারোসের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ফেরি বিশেষজ্ঞ স্পাইরিডন রুসোসের মতে, কোনো জাহাজ যদি যাত্রা শুরু করে, তার অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নাবিকেরা মনে করছেন পরিস্থিতি যাত্রার জন্য যথেষ্ট নিরাপদ। পানি যতই উত্তাল মনে হোক না কেন, সেটি সব সময় বিপদের লক্ষণ নয়।

রুসোস বলেন, গ্রিক ফেরির অধিনায়কেরা অত্যন্ত দক্ষ এবং প্রতিদিনই এমন সমুদ্র পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।

অভিজ্ঞ পর্যটকের পরামর্শ

আমস্টারডামের ৩৩ বছর বয়সী সোফি ইয়ানসেন বছরে পাঁচবারের বেশি গ্রিসে যান এবং এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০টি দ্বীপের ফেরিতে ভ্রমণ করেছেন। একটি দুর্ভাগ্যজনক যাত্রা বাদ দিলে তার প্রায় সব অভিজ্ঞতাই ভালো ছিল।

ইয়ানসেনের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ সাধারণত সবচেয়ে বিশৃঙ্খল ও আতঙ্কজনক ভিডিওগুলোই প্রকাশ করে। ফলে দেখে মনে হতে পারে প্রতিদিনই এমন ঘটনা ঘটছে, বাস্তবে তা নয়।

তিনি গ্রিসের বিস্তৃত ফেরি ব্যবস্থার প্রশংসা করেন। তার মতে, দেশটির অধিকাংশ জনবসতিপূর্ণ দ্বীপকে সংযুক্ত করা এই ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে বিমানে যাওয়ার চেয়েও কার্যকর।

যারা সমুদ্রযাত্রায় সহজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাদের তুলনামূলক বড় নৌযানে ভালোভাবে সংযুক্ত দ্বীপ বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। কারণ জনপ্রিয় পথ হলেও, যেমন পারোস থেকে মিলোস, বছরের নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে মাত্র একটি ছোট সরাসরি ফেরি চলতে পারে এবং সেটিও দিনে একবার।

ইয়ানসেনের পরামর্শ, ভ্রমণের আগে ভালোভাবে তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি। নিজের মাথায় থাকা পরিকল্পনা অনুযায়ী না ভেবেই সরাসরি যাত্রা শুরু করলে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

দ্রুতগতির ছোট নৌযান এড়ানোর পরামর্শ

পেট্রোস জিসিমোসও পর্যটকদের দ্রুতগতির কিন্তু ছোট নৌযান বেছে না নেওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ এসব নৌযানে ঢেউয়ের ধাক্কা তুলনামূলক বেশি অনুভূত হয়।

সমুদ্রযাত্রাজনিত অসুস্থতা কমাতে তিনি বিশেষ ধরনের ওষুধযুক্ত ত্বক-লেপন ব্যবহার অথবা চুইংগাম চিবানোর পরামর্শ দেন।

তারপরও উত্তাল ফেরিযাত্রা অস্টিন ক্রোটোর কাছে শেষ পর্যন্ত গ্রিস ভ্রমণের আনন্দকে ম্লান করতে পারেনি। তিন বছর পরিবার নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ঘোরার পর গত সেপ্টেম্বরে নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে সাইরোসে চলে আসেন তিনি।

তার কাছে গ্রিসের দ্বীপগুলোর আকর্ষণ এতটাই গভীর যে ভয় পেলেও এই অভিজ্ঞতা নেওয়া উচিত। কারণ তার ভাষায়, গ্রিক দ্বীপগুলোর মতো আর কিছুই নেই।

গ্রিসের দ্বীপভ্রমণ তাই নিঃসন্দেহে স্বপ্নের মতো—তবে সেই স্বপ্নের পথে এজিয়ান সাগরের ঢেউ কখনো কখনো পর্যটকদের এমন এক পরীক্ষার মুখোমুখি করে, যার কথা তারা ছুটির পরিকল্পনা করার সময় কল্পনাও করেননি।