দীর্ঘদিন ধরে নেপালের রাজনীতি এমন এক বৃত্তে আটকে ছিল, যেখানে ভোটারদের সামনে নতুন রাজনৈতিক স্বপ্নের চেয়ে পুরোনো দলগুলোর প্রতি আনুগত্যই ছিল বড় বাস্তবতা। বছরের পর বছর ক্ষমতায় থাকা নেতারা রাষ্ট্র পরিচালনা করলেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। ফলে ‘পরিবর্তন’ ধীরে ধীরে একটি রাজনৈতিক স্লোগান থেকে জনমনের প্রধান আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়।
এই হতাশার আবহেই ২০২২ সালে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টি বা আরএসপির আবির্ভাব। সুস্পষ্ট পুরোনো মতাদর্শের বাইরে থাকা নতুন মুখ, প্রচলিত রাজনীতির প্রতি অনাস্থা এবং মধ্যবিত্তের ক্ষোভ—সব মিলিয়ে দলটি দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে শহর ও শহরতলির মধ্যবিত্তরা আরএসপির মধ্যে নিজেদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হতাশার বিকল্প খুঁজে পেয়েছিল।
কিন্তু একটি নতুন রাজনৈতিক দল জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এবং সত্যিকার অর্থে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করা এক বিষয় নয়। ক্ষমতায় আসার পর আরএসপির সামনে এখন সেই কঠিন পার্থক্যটিই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
জেন-জি আন্দোলন বদলে দিল সমীকরণ
২০২৫ সালের ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বরের জেন-জি আন্দোলন নেপালের রাজনৈতিক ব্যবস্থার গভীর অসন্তোষকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। প্রবীণ নেতৃত্বের আধিপত্য, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার মতো সিদ্ধান্ত তরুণদের ক্ষোভকে বিস্ফোরণে পরিণত করে। আন্দোলনে ৭৬ জন নিহত হন এবং আনুমানিক ৮৫ বিলিয়ন নেপালি রুপির ক্ষয়ক্ষতি হয়।
এই আন্দোলনের পর পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। নেপালি কংগ্রেস, ইউএমএল এবং মাওবাদী রাজনীতির উত্তরসূরি ন্যাশনাল কমিউনিস্ট পার্টির দীর্ঘদিনের প্রভাব প্রশ্নের মুখে পড়ে। দ্রুত নির্বাচনের দাবি জোরালো হয় এবং আরএসপি নিজেকে পরিবর্তনের সবচেয়ে স্বাভাবিক রাজনৈতিক বাহন হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ পায়।
তবে জেন-জি আন্দোলনের পুরো চেতনাকে আরএসপি নিজেদের রাজনৈতিক কাঠামোয় ধারণ করতে পারেনি। দলটির মতাদর্শিক ভিত্তি দুর্বল এবং রাজনৈতিক পদ্ধতি এখনো যথেষ্ট সুসংহত নয়। ফলে আন্দোলনের তৈরি শূন্যতার একটি বড় অংশ দখল করে নেন শহুরে অভিজাত ও জনপ্রিয় নতুন মুখেরা।
সেখানেই সামনে আসেন বালেন্দ্র শাহ।
বালেনের জনপ্রিয়তা ছিল বড় রাজনৈতিক সম্পদ
নেপালের বৃহত্তম মহানগরের মেয়র বালেন্দ্র শাহ—‘বালেন’ নামে পরিচিত—প্রচলিত রাজনীতির বাইরে থেকে উঠে আসা এক জনপ্রিয় মুখ। তিনি সংস্কৃতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া তরুণ প্রজন্মের কাছে আলাদা আবেদন তৈরি করেছিলেন।
মধেশি সম্প্রদায় থেকে উঠে আসা শাহকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে সামনে আনা আরএসপির জন্য কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নেপালের জাতীয় ভোটের প্রায় ৫৮ শতাংশ মধেশ প্রদেশ থেকে আসায় তার পরিচয় ও জনপ্রিয়তা দলটির নির্বাচনী কৌশলে বাড়তি সুবিধা তৈরি করে।
বালেনের উপস্থিতি আরএসপির ‘নতুন রাজনীতি’ ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে। প্রবীণ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে জনমনে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তার প্রতীক হিসেবেও তাকে দেখা হয়।
ফলাফল ছিল অভাবনীয়। ২৭৫ সদস্যের প্রতিনিধি সভায় আরএসপি ১৮২টি আসন পেয়ে বিপুল জয় অর্জন করে।
কিন্তু এখানেই শুরু হয়েছে আসল পরীক্ষা।
মধ্যবিত্তের সংকটই এখন আরএসপির বড় চ্যালেঞ্জ
নেপালের মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক প্রত্যাশা কোনো বিমূর্ত আদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা চায় মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ খাদ্য, সাশ্রয়ী জ্বালানি এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা।
আরএসপি যে শ্রেণির আকাঙ্ক্ষা থেকে শক্তি পেয়েছে, সেই মধ্যবিত্তই এখন দলের প্রতি সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন তুলছে। যাতায়াত ব্যয় বাড়ছে, বাড়িভাড়া বেড়েছে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য চাপ তৈরি করছে, রান্নার গ্যাসের জন্য মানুষকে অতিরিক্ত ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
এসব সমস্যাকে কেবল বৈশ্বিক পরিস্থিতি বা বাইরের অর্থনৈতিক ধাক্কার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করলে আস্থা আরও কমতে পারে। কারণ মানুষ পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি শুনে ভোট দিয়েছে; তারা সমস্যার ব্যাখ্যা নয়, সমাধান দেখতে চায়।
এর প্রভাব অর্থনীতিতেও পড়ছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরছে না, আবার ভোক্তারাও ব্যয় করতে সতর্ক হয়ে উঠছে। অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিশীলতা যেন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে আটকে গেছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরএসপির অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন। দলের ভেতর ও বাইরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সন্দেহ, মন্ত্রীদের পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং নানা বিষয়ে অস্পষ্ট অবস্থান দলের কর্মী ও ভোটার—দুই পক্ষকেই বিভ্রান্ত করছে।

শত দিনের পরিকল্পনায় সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নগুলো অনুপস্থিত
ক্ষমতায় আসার পর আরএসপির শত দিনের কর্মপরিকল্পনা দ্রুত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি হিসেবে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। কিন্তু পরিকল্পনাটি নিয়ে এখন যে প্রশ্নগুলো সামনে আসছে, সেগুলো কেবল কী করা হবে তা নিয়ে নয়; বরং কার জন্য করা হবে, কারা বাদ পড়বে এবং সিদ্ধান্ত নেবে কারা—এসব নিয়েও।
প্রশাসনে বিশেষজ্ঞের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিশেষজ্ঞ জ্ঞান গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিকল্প হতে পারে না। কারিগরি দক্ষতাকে যদি রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার সমার্থক হিসেবে তুলে ধরা হয়, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক প্রশ্নগুলো আড়ালে চলে যেতে পারে।
কোন খাতে অর্থ বরাদ্দ হবে, কোন জনগোষ্ঠী অগ্রাধিকার পাবে, সম্পদ কীভাবে বণ্টিত হবে এবং সামাজিক ন্যায়বিচার কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসব প্রশ্নের কোনো উত্তরই নিছক কারিগরি দক্ষতার মাধ্যমে পাওয়া যায় না।
আরএসপির টেকনোক্র্যাটিক ভাবমূর্তি তাই এখন উল্টো চাপ তৈরি করছে। দক্ষ প্রশাসন দরকার, কিন্তু গণতন্ত্রে দক্ষতার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিতর্ক, প্রতিনিধিত্ব এবং জবাবদিহিও অপরিহার্য।
‘সুশাসন’ শব্দ দিয়ে সব রাজনৈতিক প্রশ্ন ঢেকে রাখা যায় না
নির্বাচনের আগে আরএসপি যে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং ক্ষমতায় আসার পর জনগণের যে অভিজ্ঞতা হচ্ছে, তার মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দীর্ঘ লাইন, বাড়তি বিল এবং জীবনযাত্রার ব্যয় আবারও রাজনৈতিক হতাশার কারণ হয়ে উঠছে।
এভাবে চলতে থাকলে আরএসপির সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিচয়—প্রতিষ্ঠানবিরোধী নতুন শক্তি—ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
দলের আরেকটি সমস্যা তার রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যেই নিহিত। আরএসপি কোনো সুস্পষ্ট মতাদর্শিক কাঠামোর ওপর পুরোপুরি দাঁড়ানো দল নয়। বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি, নতুন রাজনৈতিক মুখ এবং প্রচলিত ব্যবস্থায় অসন্তুষ্ট ভোটারদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই প্ল্যাটফর্মের জন্য সবাইকে সন্তুষ্ট রাখার চাপ স্বাভাবিকভাবেই বেশি।
দলের সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করলে সেটিকে গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যকর লক্ষণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের ক্ষেত্রে ভিন্নমতের সঙ্গে রাজনৈতিক সততা, স্বার্থের সংঘাত এবং জবাবদিহির প্রশ্নও জড়িত। সবাইকে মানিয়ে চলার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত দলের অবস্থানকে আরও অস্পষ্ট করে তুলতে পারে।
তরুণদের প্রত্যাশা শুধু নতুন মুখ নয়
নেপালের তরুণরা দ্রুত রাজনৈতিক শিক্ষা নিচ্ছে। তারা এখন শুধু নতুন নেতা বা নতুন দলের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে না; তারা স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সমতা, অন্তর্ভুক্তি, নৈতিক প্রশাসন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ন্যায্য অংশগ্রহণ দাবি করছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তরুণরা শুধু রাস্তায় প্রতিবাদ করার ভাষা নয়, আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায়ের পদ্ধতিও শিখছে। অর্থাৎ তারা রাজনীতিকে অস্বীকার করছে না; বরং রাজনীতির আরও দায়িত্বশীল রূপ চাইছে।
এটাই আরএসপির সামনে সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
গণতন্ত্রকে বিশেষজ্ঞের হাতে তুলে দেওয়া গণতান্ত্রিক সংস্কার নয়। বরং বিশেষজ্ঞ জ্ঞানকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে এসে তাকে জনসম্মুখে যাচাই, বিতর্ক এবং জবাবদিহির আওতায় রাখা প্রয়োজন।
ফেডারেল ব্যবস্থা, আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ, ধর্মনিরপেক্ষতা, লিঙ্গসমতা, বৈষম্য, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, সম্পদ বণ্টন, জাতপাত এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো প্রশ্নগুলোকে শুধু ‘সুশাসন’ বা প্রশাসনিক দক্ষতার আলোচনায় সীমাবদ্ধ করা যাবে না।
আরএসপির রাজনৈতিক স্বপ্ন হয়তো আগের মতো আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে না। কিন্তু যে সমস্যাগুলো থেকে দলটির জন্ম, সেগুলো এখনো নেপালের সমাজে জীবন্ত। সেগুলোকে উপেক্ষা করার সুযোগ দলটির নেই।
নেপালের মানুষ পরিবর্তনে ক্লান্ত নয়; তারা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি শুনে বারবার হতাশ হতে ক্লান্ত। তাই আরএসপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নতুন কোনো স্লোগান তৈরি করা নয়। প্রশ্ন হলো, তারা কি নির্বাচনী বিজয়কে এমন একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে রূপ দিতে পারবে, যেখানে ‘নতুন’ শুধু নেতাদের মুখে নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতেও প্রতিফলিত হবে?
তা না হলে নেপালের মানুষ আবার পরিবর্তনের সন্ধানে বের হবে। এবার সেই প্রশ্ন শুধু পুরোনো দলগুলোর দিকে নয়, নতুন রাজনৈতিক তারকাদের দিকেও ছুটে আসবে।
লেখক: বিকাশ ভট্ট ছেত্রী। তিনি একজন স্বাধীন গবেষক এবং ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি।
বিকাশ ভট্ট ছেত্রী 


















