থাইল্যান্ডে ভয়াবহ বিদ্যালয় হামলার পর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল আগ্নেয়াস্ত্র কেনার অনুমতি সাময়িকভাবে স্থগিত করার পাশাপাশি নতুন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন দ্রুত প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে অপরাধবিজ্ঞানী ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, শুধু নতুন আইন কিংবা সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থাইল্যান্ডের দীর্ঘদিনের অস্ত্র-সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।
বিদ্যালয়ে ভয়াবহ হামলার পর নড়েচড়ে বসেছে সরকার
গত ৭ আগস্ট ব্যাংককের বাইরে দেবসিরিন ননথাবুরি বিদ্যালয়ে এক কিশোরের বন্দুক হামলায় ছয়জন নিহত হন। পুলিশ জানিয়েছে, বিদ্যালয়ে হামলা চালানোর আগে ওই কিশোর নিজের বাড়িতে তার দাদা-দাদিকেও গুলি করে হত্যা করে। পরে সে নিজেও গুলিতে মারা যায়। হামলায় আরও ২৩ জন আহত হন।
প্রায় চার বছর পর এটিই থাইল্যান্ডে সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যার ঘটনা হিসেবে সামনে এসেছে। ঘটনার পর দেশজুড়ে অস্ত্রের সহজলভ্যতা, পরিবারের সদস্যদের অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ এবং তরুণদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, পুলিশ জানিয়েছে, হামলায় ব্যবহৃত বন্দুকটি কিশোরটির দাদার বৈধ মালিকানাধীন অস্ত্র ছিল। অর্থাৎ অস্ত্রটি অবৈধভাবে কেনা হয়নি; বরং বৈধভাবে মালিকানাধীন একটি অস্ত্রই শেষ পর্যন্ত একজন অপ্রাপ্তবয়স্কের হাতে চলে যায়।
আইন আছে, কিন্তু অস্ত্র পৌঁছে যাচ্ছে সহজেই
অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, থাইল্যান্ডের সমস্যা মূলত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনের অভাব নয়। বড় সমস্যা হলো, বেসামরিক মানুষের হাতে থাকা বিপুলসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে।
মাহিদোল বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞানী ত্রিন ফোরাকসা মনে করেন, দেশে আগ্নেয়াস্ত্রসংক্রান্ত আইন ইতিমধ্যে যথেষ্ট কঠোর। কিন্তু কেউ অপরাধ করার উদ্দেশ্যে অস্ত্র খুঁজলে তা পাওয়া কঠিন নয়। এমনকি ইন্টারনেটের মাধ্যমে অবৈধ বা পুরোনো অস্ত্রও তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
অনলাইনে অস্ত্র ও গুলি বিক্রির বিজ্ঞাপনও এই সমস্যার গভীরতা তুলে ধরছে। বৈধ অস্ত্রের দোকান যেখানে নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে পরিচালিত হয়, সেখানে অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল পরিসর অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচার জন্য সহজ পথ তৈরি করেছে।
বেসামরিক মানুষের হাতে বিপুল অস্ত্র
২০১৭ সালের আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ডেই বেসামরিক মানুষের হাতে সবচেয়ে বেশি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। দেশটির প্রায় ৭ কোটি ১০ লাখ মানুষের হাতে আনুমানিক ১ কোটি ৩০ হাজার আগ্নেয়াস্ত্র ছিল।
প্রতি ১০০ জন মানুষের বিপরীতে অস্ত্রের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৫টি। এর মধ্যে প্রায় ৬২ লাখ অস্ত্র বৈধভাবে নিবন্ধিত। অর্থাৎ আনুমানিক ৪১ লাখ অস্ত্র নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে শুধু নতুন করে অস্ত্র কেনার অনুমতি সীমিত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ইতিমধ্যে মানুষের হাতে থাকা অস্ত্রগুলোর হিসাব, ব্যবহার, সংরক্ষণ, মালিকানা পরিবর্তন এবং উত্তরাধিকার—সবকিছুর ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে।
আজীবন অস্ত্রের অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন
থাইল্যান্ডে ২০ বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিক বৈধভাবে আগ্নেয়াস্ত্র কিনতে ও মালিক হতে পারেন। তবে অনুমোদন ছাড়া অস্ত্র বহনের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার বাত পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
সরকার এখন অস্ত্রের অনুমতিপত্র ব্যবস্থা আধুনিক করার পরিকল্পনা করছে। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্যের সঙ্গে অস্ত্রের অনুমতি ও বিক্রির তথ্য যুক্ত করে একটি সমন্বিত বৈদ্যুতিন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অস্ত্র ব্যবসায়ীদের ওপর নজরদারি এবং শাস্তির বিধানও আরও কঠোর করার কথা বলা হয়েছে। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে নতুন আইন প্রস্তাব আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নতুন আইন করলেই হবে না। অস্ত্র বৈধভাবে কার হাতে গেল, সেটি কোথায় রাখা হচ্ছে, পরিবারের অন্য কেউ সেটি ব্যবহার করতে পারছে কি না, অস্ত্র হারিয়েছে বা চুরি হয়েছে কি না, মালিক মারা গেলে কার হাতে যাচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

কয়েক বছর পরপর নবায়নের প্রস্তাব
অপরাধবিজ্ঞানী পিয়াপর্ন তুননিকুল মনে করেন, আগ্নেয়াস্ত্রের অনুমতি আজীবনের জন্য বহাল রাখা উচিত নয়। তার প্রস্তাব হলো, প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর পরপর অস্ত্রের অনুমতিপত্র নবায়ন বাধ্যতামূলক করা।
এর সঙ্গে মালিকের মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা যাচাই এবং অস্ত্র নিরাপদে সংরক্ষণ করা হচ্ছে কি না, তা পরিদর্শনের ব্যবস্থাও যুক্ত করার কথা বলেছেন তিনি।
আরেক অপরাধবিজ্ঞানী ক্রিসানাফং ফুথাকুলও অস্ত্র নিরাপদে সংরক্ষণের জন্য কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতার পক্ষে মত দিয়েছেন। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির অবহেলার কারণে অপ্রাপ্তবয়স্কের হাতে অস্ত্র পৌঁছে গেলে তার জন্য জবাবদিহির ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
তরুণদের অনলাইন আচরণেও নজর জরুরি
সাম্প্রতিক হামলার তদন্তে কিশোরটির কম্পিউটার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সে সহিংসতামূলক অনলাইন উপাদান ব্যাপকভাবে দেখত। তদন্তকারীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র ব্যবহারের প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।
পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হামলাকারী প্রায় এক থেকে দুই বছর ধরে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে আগ্রহী ছিল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে অস্ত্র পরিচালনার কৌশল শেখার চেষ্টা করেছিল।
তবে তার স্বাভাবিক পারিবারিক আচরণের আড়ালে এসব প্রবণতা অনেকটাই ঢাকা পড়ে ছিল। এর আগে তার ব্যাগ থেকে একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়েছিল এবং এক শিক্ষক আগের বছর তার কাছ থেকে একটি খেলনা ধরনের বায়ুচালিত বন্দুক জব্দ করেছিলেন।
শাস্তির বদলে আগাম সতর্কতার ওপর জোর
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী বারবার হত্যার কথা বললে, আগের বিদ্যালয় হামলাকারীদের নিয়ে অনুসন্ধান করলে কিংবা অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করলে সেটিকে শুধু শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে দেখলে চলবে না।
এ ধরনের আচরণকে সম্ভাব্য ঝুঁকির সংকেত হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত মানসিক ও আচরণগত মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বিদ্যালয়ের ভেতরে বিশেষ ঝুঁকি মূল্যায়ন দল গঠনের প্রস্তাবও এসেছে।
সরকার ইতিমধ্যে সব বিদ্যালয়ের জন্য একটি অভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করেছে, যা নভেম্বরের শুরু নাগাদ কার্যকর করার কথা। এতে ভয়ভীতি ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, অস্ত্র শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং ভয়াবহ ঘটনার পর মানসিক আঘাতের মূল্যায়নের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা
তবে থাইল্যান্ডের অতীত অভিজ্ঞতার কারণে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সংশয়ও রয়েছে। বড় ধরনের সহিংসতার পর জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়, সরকার দ্রুত কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে অনেক উদ্যোগই দুর্বল হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কোনো একটি সরকার বা মন্ত্রীর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। অস্ত্রের মালিকানা থেকে শুরু করে সংরক্ষণ, পরিবারের সদস্যদের প্রবেশাধিকার, মালিকানা হস্তান্তর, উত্তরাধিকার এবং শেষ পর্যন্ত অস্ত্র ধ্বংস বা অপসারণ—পুরো ব্যবস্থাটিকে নতুন করে সাজাতে হবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো, একজন ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি যেন বন্দুক হাতে বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর সুযোগই না পায়।
স্বপ্ন হারাল একটি কিশোর বন্ধুমহল
হামলার পর নিহতদের পরিবার ও সহপাঠীদের মধ্যে গভীর শোক নেমে এসেছে। হামলাকারীর ১৪ বছর বয়সী এক বন্ধু, যিনি নিজের পরিচয় শুধু ‘বোট’ নামে প্রকাশ করেছেন, জানিয়েছেন, তারা একসঙ্গে বড় হয়ে ভ্রমণে যাওয়ার স্বপ্ন দেখত।
তার ভাষায়, এখন সেই পরিকল্পনা আর কখনো পূরণ হবে না। কারণ তাদের বন্ধুমহল থেকে একজন চিরতরে হারিয়ে গেছে।
থাইল্যান্ডে নতুন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন কতটা কার্যকর হবে, তা এখন সময়ই বলে দেবে। তবে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য স্পষ্ট—শুধু নতুন আইন নয়, বৈধ ও অবৈধ অস্ত্রের বিশাল মজুত, নিরাপদ সংরক্ষণ, মালিকদের নিয়মিত যাচাই এবং তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ শনাক্ত করার সমন্বিত ব্যবস্থা ছাড়া এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















