১৯৮৬ সালের শীতল যুদ্ধের উত্তাল সময়ে আইসল্যান্ডের রাজধানী রেকিয়াভিকে মুখোমুখি বসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ও সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ। বিশ্ব তখন পারমাণবিক অস্ত্রের আতঙ্কে কাঁপছে। দুই পরাশক্তির হাতে জমে থাকা বিপুল পারমাণবিক অস্ত্র যে কোনো ভুল সিদ্ধান্তে মানবসভ্যতার জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল সর্বত্র।
সেই ঐতিহাসিক বৈঠককে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে নতুন চলচ্চিত্র ‘দ্য ব্রিঙ্ক অব ওয়ার’। ছবিটি শুধু দুই নেতার রাজনৈতিক দর-কষাকষি তুলে ধরেনি, বরং এমন এক মুহূর্তকে সামনে এনেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক অস্ত্র সম্পূর্ণভাবে বিলোপের মতো অভাবনীয় একটি সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।
রেকিয়াভিকের সেই অদ্ভুত বৈঠক
ছবির শুরুতেই রিগ্যানকে রসিকতা করতে দেখা যায়। পররাষ্ট্রসচিব জর্জ শুল্টজকে তিনি প্রশ্ন করেন, মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার জন্য পৃথিবীর এত জায়গা থাকতে আইসল্যান্ডের একটি ভূতুড়ে বাড়িকেই কেন বেছে নেওয়া হলো।
চলচ্চিত্রে রিগ্যানের চরিত্রে অভিনয় করেছেন জেফ ড্যানিয়েলস। ভারী সাজসজ্জা ও চুলের পরিবর্তনের মাধ্যমে তিনি রিগ্যানের চেহারা ধারণের চেষ্টা করেছেন। পুরোপুরি রিগ্যানের মতো দেখতে না হলেও তার কথা বলার ভঙ্গি, মাথা কাত করার অভ্যাস এবং ব্যক্তিত্বের কিছু দিক বেশ বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।
ছবিতে রিগ্যানকে একজন বুদ্ধিমান, মনোযোগী, কৌশলী, রসিক এবং আত্মবিশ্বাসী নেতা হিসেবে দেখানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রিগ্যানকে সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ যে সরল বা অগভীর রাজনীতিক হিসেবে উপস্থাপন করেছিল, চলচ্চিত্রটি সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ বিলোপের দিকে
রেকিয়াভিকের বৈঠক শুরু হয়েছিল পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের আলোচনা দিয়ে। কিন্তু খুব দ্রুত তা আরও উচ্চাভিলাষী পর্যায়ে চলে যায়। দুই নেতা এমন একটি সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আলোচনা করেন, যার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক অস্ত্র পুরোপুরি বিলোপ করা।
শীতল যুদ্ধের সেই সময়ে এমন প্রস্তাব ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য। কারণ দুই দেশের মধ্যে তখন সামরিক প্রতিযোগিতা চরমে। উভয় পক্ষই বিপুল পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিল।
চলচ্চিত্রটি এই আলোচনার নাটকীয়তা তুলে ধরেছে। রিগ্যানকে দেখানো হয়েছে অস্ত্রের প্রযুক্তিগত বিষয় সম্পর্কেও যথেষ্ট জ্ঞানসম্পন্ন হিসেবে। তিনি যখন অস্ত্রের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান প্রদর্শন করেন, তখন বৈঠকে উপস্থিত অন্যদের মধ্যেও তার প্রতি সম্মানের ছাপ ফুটে ওঠে।
শুল্টজের একটি বক্তব্য এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ—কোনো প্রতিপক্ষ আপনাকে অবমূল্যায়ন করলে সেটিই কৌশলগত সুবিধায় পরিণত হতে পারে।
গর্বাচেভের দৃষ্টিতে আমেরিকার ভয়ংকর শক্তি
চলচ্চিত্রে গর্বাচেভের চরিত্রে অভিনয় করেছেন জ্যারেড হ্যারিস। তার অভিনয়ে কিছুটা অতিরঞ্জন থাকলেও সোভিয়েত নেতার দৃষ্টিভঙ্গি বেশ কার্যকরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
গর্বাচেভের কাছে যুক্তরাষ্ট্র ছিল এক বিশাল শক্তিধর রাষ্ট্র। যে দেশ অল্প সময়ের মধ্যে মানুষকে চাঁদে পাঠাতে পারে এবং পারমাণবিক বোমা তৈরির মতো প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, তার সামরিক শক্তিকে সোভিয়েত নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখত।
আলোচনার সবচেয়ে বড় বিরোধগুলোর একটি ছিল রিগ্যানের কৌশলগত প্রতিরক্ষা উদ্যোগ। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিল, যা আকাশে থাকা অবস্থাতেই শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে পারবে।
গর্বাচেভের আশঙ্কা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র যদি এমন একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে সক্ষম হয়, যা তার ভূখণ্ডকে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত থেকে কার্যত নিরাপদ করে দেয়, তাহলে দেশটি সামরিকভাবে বিপুল সুবিধা পেয়ে যাবে। তখন আক্রমণ করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ঝুঁকিও অনেক কমে যেতে পারে।
রিগ্যানকে নতুনভাবে দেখানোর চেষ্টা
ছবিটির অন্যতম বড় সাফল্য হলো রিগ্যানকে একমাত্রিক চরিত্র হিসেবে না দেখানো। তাকে শুধু বক্তৃতা দেওয়া জনপ্রিয় নেতা বা ঠান্ডা যুদ্ধের কঠোর যোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।
বরং তাকে এমন একজন নেতা হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি একই সঙ্গে সামরিক শক্তির ওপর জোর দেন এবং পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করেন। আলোচনার টেবিলে তার কৌশল, রসবোধ এবং রাজনৈতিক বিচক্ষণতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি রিগ্যানের ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককেও নতুন করে সামনে আনে। একদিকে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন, অন্যদিকে তার সময়েই দুই পরাশক্তির মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র কমানোর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এগিয়ে যায়।
ছবির দুর্বলতাও কম নয়
তবে চলচ্চিত্রটি পুরোপুরি সফল হয়নি। মূল আলোচনার তীব্রতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের মাঝখানে নির্মাতারা বেশ কিছু পার্শ্বকাহিনি ঢুকিয়েছেন, যা অনেক সময় মূল গল্পের গতি কমিয়ে দিয়েছে।
রিগ্যানের স্ত্রী ন্যান্সি রিগ্যানের চরিত্রও রয়েছে ছবিতে। তবে তিনি মূলত বাড়িতেই ছিলেন। অন্যদিকে গর্বাচেভের স্ত্রী রাইসাকে আইসল্যান্ডে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক উপস্থিতিতে দেখা যায়। সোভিয়েত সংবাদমাধ্যমে সে সময় তাকে খুব বেশি প্রকাশ্যে না আনা হলেও এই সফরে তিনি অনেকটা পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
এ ছাড়া গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের নিয়ে হাস্যরসাত্মক কিছু দৃশ্যও রাখা হয়েছে। এমনকি বৈঠকের ভবনের নিচে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বিবাদ দেখানো হয়েছে।
কিন্তু এসব দৃশ্য অনেক সময় ছবির মূল রাজনৈতিক উত্তেজনাকে দুর্বল করেছে। পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে দুই দেশের নেতাদের ঐতিহাসিক দর-কষাকষির তুলনায় এসব কৌতুক অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে।

তথ্য বোঝানোর চেষ্টায় অতিরিক্ত সরলতা
ছবির আরেকটি সমস্যা হলো দর্শকদের ঐতিহাসিক ও সামরিক প্রেক্ষাপট বোঝানোর ক্ষেত্রে নির্মাতার কিছুটা কৃত্রিম পদ্ধতি। অনেক চরিত্র এমন তথ্য ও পরিসংখ্যান মুখে বলে, যা ওই বৈঠকে উপস্থিত নেতারা ও বিশেষজ্ঞরা স্বাভাবিকভাবেই জানতেন।
ফলে কিছু সংলাপ বাস্তব আলোচনার অংশের বদলে দর্শকদের জন্য তথ্য ব্যাখ্যা করার কৃত্রিম প্রচেষ্টা বলে মনে হয়।
চলচ্চিত্রটি একই সঙ্গে দুই ধরনের দর্শকের কথা ভাবতে গিয়ে কিছুটা দ্বিধায় পড়েছে। একদিকে যারা রেকিয়াভিক বৈঠকের ইতিহাস জানেন, তারা বৈঠকের অন্তরঙ্গ পরিবেশ দেখতে চান। অন্যদিকে তরুণ দর্শকদের জন্য রিগ্যানের রাজনৈতিক পরিচয়ও তুলে ধরতে চেয়েছে ছবিটি।
এই দুই উদ্দেশ্যের মধ্যে ভারসাম্য সব সময় ঠিকভাবে বজায় রাখা সম্ভব হয়নি।
ইতিহাসের কয়েকটি শক্তিশালী মুহূর্ত
তারপরও ছবিতে এমন কিছু দৃশ্য রয়েছে, যা দীর্ঘ সময় মনে থাকার মতো।
একটি দৃশ্যে রিগ্যান শুল্টজের সামনে নিজের জামা খুলে ফেলেন। এতে ১৯৮১ সালে আততায়ীর গুলিতে আহত হওয়ার ভয়াবহ চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দৃশ্যটি কোনো দীর্ঘ ব্যাখ্যা ছাড়াই রিগ্যানের ব্যক্তিগত দুর্বলতা ও রাজনৈতিক জীবনের ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দেয়।
আরেকটি হালকা মুহূর্তে গর্বাচেভ একটি ইংরেজি বাগধারা বুঝতে না পারলে রিগ্যান রসিকতা করে বলেন, তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন যে সোভিয়েতরা নাস্তিক।
এই ধরনের মুহূর্তেই চলচ্চিত্রটি সবচেয়ে স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
রেকিয়াভিক কেন আজও গুরুত্বপূর্ণ
রেকিয়াভিক বৈঠক শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু সেই বৈঠক পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করেছিল।
দুই নেতা এমন পর্যায়ে আলোচনা করেছিলেন, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যাপক হ্রাস, এমনকি সম্পূর্ণ বিলোপের সম্ভাবনাও বাস্তব আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির পথ তৈরিতে এই আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাই রেকিয়াভিকের বৈঠক শুধু দুই নেতার একটি ব্যর্থ বৈঠক ছিল না। বরং এটি দেখিয়েছিল, দীর্ঘদিনের শত্রুতার মধ্যেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব চাইলে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি কমানোর জন্য কতদূর এগোতে পারে।
‘দ্য ব্রিঙ্ক অব ওয়ার’ সেই ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। ছবিটি নিখুঁত নয়; এর মধ্যে অপ্রয়োজনীয় হাস্যরস, অতিরিক্ত ব্যাখ্যা এবং কিছু অসম্পূর্ণ চরিত্রায়ন রয়েছে। তবু এর কেন্দ্রীয় বিষয়টি শক্তিশালী—বিশ্ব যখন পারমাণবিক সংঘাতের ভয়াবহতার মুখোমুখি ছিল, তখন দুই পরাশক্তির নেতা অস্ত্র কমানো নয়, বরং একসময় সব পারমাণবিক অস্ত্র বিলোপের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেছিলেন।
এই কারণেই ছবিটি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আর রিগ্যানের চরিত্রায়নের মধ্য দিয়ে এটি একটি পুরোনো রাজনৈতিক ধারণাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়—জনপ্রিয়, রসিক ও জনবান্ধব কোনো নেতা একই সঙ্গে গভীর কৌশলী এবং কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো সক্ষম হতে পারেন না, এমন ধারণা ইতিহাস সব সময় সমর্থন করে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















