অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টিম কুক তাঁর দায়িত্ব ছাড়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে কোম্পানিটির একটি নতুন কারখানা পরিদর্শন করেছেন। সেখানে তিনি বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের সঙ্গে একটি নতুন উৎপাদন প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং ম্যাক মিনি কম্পিউটার তৈরির নতুন সংযোজন লাইন ঘুরে দেখেন। চলতি বছরের শেষ দিকে ওই সংযোজন লাইনে ম্যাক মিনি কম্পিউটার উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা।
বৃহস্পতিবারের এই পরিদর্শন অ্যাপল ও ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টিও সামনে এনেছে। ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বাড়ানোর প্রচেষ্টার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে অ্যাপলের দেশীয় বিনিয়োগের অঙ্গীকারকে তুলে ধরছে। একই সময়ে প্রশাসনের আরোপ করা কিছু কঠোর শুল্ক থেকেও অ্যাপল তুলনামূলকভাবে ছাড় পেতে সক্ষম হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষ কর্মী তৈরির উদ্যোগ
লুটনিক অ্যাপলের উৎপাদন কৌশল নিয়ে প্রশিক্ষণরত কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, উন্নত উৎপাদনব্যবস্থাই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ। তবে এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
টিম কুক বলেন, তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাবনায় বিশ্বাস করেন এবং নিজেদের অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে সেই বিশ্বাসের প্রমাণ দিতে পেরে তাঁরা গর্বিত।
অ্যাপলের সরবরাহব্যবস্থার বড় অংশ এখনো বিদেশে অবস্থান করছে। নতুন উৎপাদন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের মূল উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের ছোট ও মাঝারি আকারের ব্যবসাগুলোর সঙ্গে অ্যাপলের উৎপাদন-সংক্রান্ত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া। এর আগে ডেট্রয়েটে শ্রেণিকক্ষভিত্তিক একটি উৎপাদন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছিল অ্যাপল। টেক্সাসের নতুন কেন্দ্রটি তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেবে।
টেক্সাসে ম্যাক মিনি তৈরির প্রস্তুতি
ফক্সকনের কারখানা প্রাঙ্গণে নতুন করে তৈরি করা প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে ম্যাক মিনি সংযোজন লাইন স্থাপন করা হয়েছে। এই কারখানায় এরই মধ্যে অ্যাপলের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের উপযোগী সার্ভার তৈরি করা হচ্ছে।
গত এক বছরে ম্যাক মিনির বিক্রি বেড়েছে। বাড়িতে বসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন মডেল পরিচালনার জন্য গ্রাহকদের মধ্যে ছোট আকারের এই ডেস্কটপ কম্পিউটারটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
টেক্সাসের ফক্সকন কারখানায় লুটনিকের সফর ছিল যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বাড়ানোর পক্ষে প্রচারণার অংশ। এর আগে তিনি টয়োটা ও ফোর্ডের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরে গাড়ি উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
আইফোন উৎপাদন নিয়ে ট্রাম্পের চাপ
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অ্যাপলকে যুক্তরাষ্ট্রে আইফোন উৎপাদনের জন্য চাপ দিয়ে আসছেন। তবে এখন পর্যন্ত অ্যাপল যুক্তরাষ্ট্রে আইফোন উৎপাদনের কোনো পরিকল্পনা ঘোষণা করেনি। বরং কোম্পানিটি ভারতে আইফোন সংযোজনের পরিমাণ আরও বাড়াচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাপলের বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কোম্পানিটির সঙ্গে কাজ করছে। ডিভাইস তৈরির যন্ত্রাংশ কেনার ক্ষেত্রে অ্যাপলের বিপুল বাজেট থাকায় সরবরাহকারীদেরও যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে কোম্পানিটির যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।
অ্যাপল অন্যান্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির অ্যারিজোনার নতুন কারখানা থেকে চিপের জন্য ব্যবহৃত সিলিকন পাত কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ওই কারখানায় বিনিয়োগের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি ডলারের বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চলতি বছর অ্যাপল যুক্তরাষ্ট্রের চিপ নির্মাতা ইনটেলের সঙ্গেও একটি চুক্তি করেছে। এর আওতায় অ্যাপলের কিছু যন্ত্রাংশের চিপ তৈরি করবে ইনটেল। এই অংশীদারত্বের সঙ্গে লুটনিকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তিনি এমন একটি উদ্যোগের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ইনটেলে ৯০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে ১০ শতাংশ মালিকানা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল।
এ ছাড়া অ্যাপল জানিয়েছে, দেশীয়ভাবে ব্রডকমের তৈরি চিপ কিনতে তারা ৩ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করবে।
অ্যাপলের তুলনামূলক কম মূলধনী ব্যয়
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চিপ নির্মাণে বিপুল অর্থ ঢালছে এমন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় অ্যাপলের নিজস্ব মূলধনী ব্যয়ের বাজেট তুলনামূলকভাবে ছোট। টিম কুকের নেতৃত্বে অ্যাপল এমন একটি ব্যবসায়িক কাঠামো গড়ে তুলেছে, যেখানে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা পরিচালনার জন্য তুলনামূলক কম মূলধন ব্যবহার করে।
২০২৩ সাল থেকে অ্যাপলের মোট মূলধনী ব্যয়ের পরিমাণ অ্যামাজন, মাইক্রোসফট কিংবা গুগলের সর্বশেষ এক প্রান্তিকের ব্যয়ের চেয়েও কম।
৬০ হাজার কোটি ডলারের দেশীয় বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি
হিউস্টনের কারখানায় উৎপাদন লাইন তৈরির মূল মূলধনী বিনিয়োগ করছে ফক্সকন। অন্যদিকে অ্যাপল সেখানে উৎপাদিত পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
গত কয়েক বছরে হোয়াইট হাউসের কাছে অ্যাপল ক্রমবর্ধমান বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সর্বশেষ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, চার বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ৬০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে কোম্পানিটি।
এই বিনিয়োগের হিসাবের মধ্যে অ্যাপলের যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যমান কার্যক্রমের জন্য আগে থেকেই বরাদ্দ অর্থও রয়েছে। এর মধ্যে দেশটিতে কর্মরত করপোরেট ও খুচরা বিক্রয়কর্মীদের বেতন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কেনা যন্ত্রাংশের ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত।
গত শরতে টিম কুক হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করে অ্যাপলের দেশীয় বিনিয়োগের বর্তমান প্রতিশ্রুতিকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেছিলেন। সেই বৈঠকে কুক ট্রাম্পকে সোনালি ভিত্তিযুক্ত একটি কাচের স্মারক উপহার দেন।
এর বিনিময়ে ট্রাম্প এমন একটি সুবিধা দেন, যা অ্যাপলের শেয়ারহোল্ডারদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল—প্রশাসনের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শুল্কের চাপ থেকে অ্যাপলকে স্বস্তি।
টিম কুকের বিদায়, নতুন নেতৃত্বে অ্যাপল
টিম কুক আগামী মাসে অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এরপর তিনি কোম্পানিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন অ্যাপলের দীর্ঘদিনের হার্ডওয়্যার প্রকৌশল বিভাগের প্রধান জন টার্নাস। ফলে টিম কুকের বিদায়ের আগে টেক্সাসের এই কারখানা পরিদর্শনকে অ্যাপলের যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক উৎপাদন পরিকল্পনা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কোম্পানিটির সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















