যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় উপাসনাস্থলে যাওয়ার সময় মানুষের নিরাপত্তাহীনতা দিন দিন বাড়ছে। অনেক মানুষ এখন গির্জা, মসজিদ, ইহুদি উপাসনালয় কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রার্থনা করতে যাওয়ার আগে নিরাপত্তার কথা ভাবছেন। সাম্প্রতিক বিভিন্ন হামলা ও উপাসনাস্থলের বাইরে উত্তেজনাকর বিক্ষোভের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ভয় আরও গভীর হয়েছে।
এক জরিপে দেখা গেছে, নিয়মিত ধর্মীয় উপাসনায় অংশ নেওয়া মানুষের প্রায় অর্ধেকই মনে করেন, ব্যক্তিগতভাবে উপাসনায় অংশ নেওয়া এখন আগের তুলনায় কম নিরাপদ। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে ৩৯ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা কতবার উপাসনাস্থলে যান, সেই অভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে।
একের পর এক হামলায় বাড়ছে আতঙ্ক
গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় উপাসনাস্থলকে লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি গুরুতর হামলার ঘটনা ঘটেছে। সান দিয়েগোর একটি ইসলামি কেন্দ্রে এক বন্দুকধারীর গুলিতে তিনজন নিহত হন।
মিনিয়াপোলিসের একটি ক্যাথলিক গির্জায় স্কুলের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় হামলা চালানো হয়। সেখানে দুই শিশু নিহত এবং ১৮ জন আহত হয়।
মিশিগানের ওয়েস্ট ব্লুমফিল্ডে একটি ইহুদি উপাসনালয়ের দিকে এক সন্ত্রাসী গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যায় এবং সেখানে বিস্ফোরণ ঘটানোর চেষ্টা করে। মিশিগানের গ্র্যান্ড ব্ল্যাঙ্কে মরমন সম্প্রদায়ের একটি উপাসনালয়ে হামলায় চারজন নিহত এবং আটজন আহত হন।
এ ছাড়া নিউইয়র্কের একটি ইহুদি উপাসনালয়ে হামলার পরিকল্পনাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নস্যাৎ করেছে।
এসব হামলার ঘটনা সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হলেও এর বাইরে আরও একটি অপেক্ষাকৃত নীরব সমস্যা তৈরি হচ্ছে। অনেক উপাসনাস্থলের দরজার বাইরে বিক্ষোভ, স্লোগান ও উত্তেজনাকর কর্মকাণ্ডের কারণে মানুষ ভেতরে প্রবেশ করতেও ভয় পাচ্ছেন।
উপাসনাস্থলের বাইরে বিক্ষোভও বড় উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় সংগঠিত কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী ধর্মীয় উপাসনার সময় উপাসনাস্থলের বাইরে বিক্ষোভ করছে। কোথাও কোথাও বিক্ষোভকারীরা এমনভাবে স্লোগান দিচ্ছেন, যাতে উপাসনায় আসা মানুষ নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না।
লেখাটিতে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি গির্জায় বিক্ষোভকারী একটি বামপন্থী সংগঠনের কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বিক্ষোভকারীরা গির্জার ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ঢুকে পড়েন এবং উপস্থিত মানুষের উদ্দেশে, এমনকি ছোট শিশুদের সামনেও, চিৎকার ও স্লোগান দেন।
নিউইয়র্কের বিভিন্ন ইহুদি উপাসনালয়ের বাইরেও কয়েকটি সংগঠনের বিক্ষোভের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বিক্ষোভে হামাসের প্রতি সমর্থনসূচক এবং সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন স্লোগানও শোনা গেছে।
কিছু উপাসনাস্থলের সামনে আবার ‘আমেরিকার মৃত্যু’ এবং ‘ইন্তিফাদা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দাও’ ধরনের স্লোগানও দেওয়া হয়েছে বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রভাব শুধু ওই মুহূর্তের নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। উপাসনায় আসা মানুষকে নিয়মিত ভয় দেখানো হলে চরমপন্থী বা সহিংস মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিরাও মনে করতে পারে, ধর্মীয় মানুষকে ভয় দেখানো বা তাদের লক্ষ্যবস্তু বানানো সমাজে সহনীয় হয়ে উঠছে।
নিউইয়র্কের আইন নিয়েও প্রশ্ন
ধর্মীয় উপাসনালয়ের আশপাশে বিক্ষোভ ও হয়রানি ঠেকাতে নিউইয়র্কে বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মে মাসে অঙ্গরাজ্যটি উপাসনাস্থলের আশপাশে নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আইন করে।
কিন্তু লেখাটিতে বলা হয়েছে, এই আইন বাস্তবে খুব বেশি নতুন ক্ষমতা তৈরি করেনি। কারণ, উপাসনাস্থলের কাছে এমন আচরণ যা কাউকে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তিসঙ্গতভাবে ভয় পাওয়ার পরিস্থিতিতে ফেলে, তা আগে থেকেই বিদ্যমান আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
উপাসনাস্থলের ৫০ ফুটের মধ্যে এ ধরনের আচরণের জন্য আলাদা করে শাস্তির বিধান যুক্ত হলেও তা যথেষ্ট প্রতিরোধ তৈরি করতে পারছে না—এমন মত তুলে ধরা হয়েছে।
নিউইয়র্ক নগর পরিষদও এ ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আইন করার পর একই ধরনের রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো সেটিকে স্বাগত জানিয়েছিল। লেখাটির যুক্তি হলো, কোনো নতুন আইন করার পর যদি যাদের কর্মকাণ্ড ঠেকানোর জন্য আইনটি করা হয়েছে তারাই সেটিকে নিজেদের জন্য বড় কোনো হুমকি মনে না করে উল্টো স্বাগত জানায়, তাহলে বুঝতে হবে আইনটি যথেষ্ট কার্যকর হয়নি।
এবার কেন্দ্রীয় আইন করার দাবি
এই পরিস্থিতিতে লেখাটির লেখক যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে একটি নতুন কেন্দ্রীয় আইন পাস করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, স্থানীয় আইন দিয়ে সমস্যার পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বিভিন্ন রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ছেন। তাই দেশজুড়ে একই ধরনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা প্রয়োজন।
প্রস্তাবিত আইনটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘রাইট টু ওয়র্শিপ অ্যাক্ট’। এই আইনে উপাসনা চলার সময় ধর্মীয় উপাসনাস্থলের চারপাশে ১০০ ফুটের একটি সুরক্ষা এলাকা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এই এলাকায় এমন কোনো কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে, যা মানুষকে উপাসনাস্থলে প্রবেশ করতে বাধা দেয়, উপাসনায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে ভয় সৃষ্টি করে অথবা উপাসনাস্থলের ভেতরের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ব্যাহত করে।
লেখাটির যুক্তি হলো, বিদ্যমান আইন হয়রানি ও বাধা দেওয়ার মতো কিছু কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু সংগঠিতভাবে উপাসনাস্থলের বাইরে এমন পরিবেশ তৈরি করা, যাতে মানুষ ভেতরে যেতে ভয় পান, তা ঠেকাতে বর্তমান আইন সবসময় যথেষ্ট নয়।
আইনটির সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়েও যুক্তি
প্রস্তাবিত আইনের সমর্থকেরা বলছেন, এ ধরনের নিরাপত্তা এলাকা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না। কারণ, এর আগে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, ভোটকেন্দ্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থানের আশপাশে নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে মানুষের শান্তিপূর্ণ চলাচল ও কার্যক্রম নিশ্চিত করার জন্য আদালত বিভিন্ন ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা বহাল রেখেছে।
তাই ধর্মীয় উপাসনাস্থলের সামনে এমন কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের জন্যও আইন করা সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে বলে লেখাটিতে যুক্তি দেওয়া হয়েছে।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাড়ছে শত্রুতা
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গির্জার বিরুদ্ধে ২০১৮ সাল থেকে প্রায় ১ হাজার ৪০০টি শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডের হিসাব সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে এসব ঘটনার সংখ্যা প্রায় দশ গুণ বেড়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ধর্মীয় উপাসনাস্থলে ৩৭৭টি বিদ্বেষমূলক অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নয়, শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন ধর্মের ছোট শিশুদের অভিভাবকদের অর্ধেকেরও বেশি জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর কারণে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তাদের উপাসনায় অংশ নেওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন এনেছে।
একজন অভিভাবককে সন্তানকে নিয়ে প্রার্থনা করতে যাওয়ার আগে নিরাপদে ফিরতে পারবেন কি না—এই চিন্তা করতে হবে না, এমন পরিবেশই থাকা উচিত বলে লেখাটিতে জোর দেওয়া হয়েছে।
স্বাধীনভাবে প্রার্থনা করার অধিকার
ধর্মীয় বিশ্বাস ও উপাসনা যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ—এমন মত তুলে ধরে লেখাটিতে বলা হয়েছে, কোনো ঘৃণাভিত্তিক গোষ্ঠী বা উগ্র রাজনৈতিক সংগঠন ঠিক করে দিতে পারে না যে একজন মানুষ কোথায় এবং কীভাবে নিরাপদে নিজের ধর্ম পালন করবেন।
লেখাটির শেষ বক্তব্য হলো, ধর্মীয় স্বাধীনতা শুধু কাগজে-কলমে থাকা অধিকার নয়; মানুষ যাতে ভয় ছাড়াই উপাসনাস্থলে যেতে পারেন, সেই বাস্তব নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। তাই কংগ্রেসের উচিত প্রস্তাবিত ‘রাইট টু ওয়র্শিপ অ্যাক্ট’ পাস করা, যাতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক আমেরিকান নিরাপদে নিজের ধর্ম পালন ও প্রার্থনা করার সুযোগ পান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















