দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে তীব্র গ্যাস সংকটে ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন। দিনের ১৮ থেকে ১৯ ঘণ্টাই প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় কোনো কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে, আবার কোথাও যন্ত্রপাতি বন্ধ রেখে শ্রমিক-কর্মচারীদের বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে। উৎপাদন কমলেও শ্রমিকের মজুরি, ব্যাংকঋণের সুদ, কারখানা রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য ব্যয় কমেনি। ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে লোকসানের বোঝা।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে কারখানা সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। এর প্রভাবে ভবিষ্যতে শ্রমিক ছাঁটাই ও কর্মসংস্থান সংকটও দেখা দিতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত গ্যাস সংকটের কারণে রূপগঞ্জে কোনো নির্দিষ্ট কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং ব্যাপক লোকসান সত্ত্বেও মালিকরা প্রতিষ্ঠানগুলো চালু রাখার চেষ্টা করছেন।
উৎপাদন কমেছে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ
শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, স্বল্পচাপের গ্যাসের কারণে রূপগঞ্জসহ নারায়ণগঞ্জের অন্তত ২২টি শিল্পকারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সুতা, বুনন, রং ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, বস্ত্র এবং পোশাকশিল্প।
গ্যাসনির্ভর যন্ত্রপাতি ও নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী যন্ত্র স্বাভাবিকভাবে চালাতে না পারায় অনেক কারখানাই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারছে না। কেউ কেউ বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করছেন। তবে এতে উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।
রূপগঞ্জের ভুলতা এলাকার লিটল স্টার স্পিনিং মিলের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খোরশেদ আলম জানান, প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে তাদের কারখানায় গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম। উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রতি পাউন্ড সুতায় তাদের সর্বোচ্চ ২৭ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে।
কারখানাটিতে অনুমোদিত গ্যাসচাপ ১০ পিএসআই হলেও ব্যস্ত সময়ে তা নেমে আসে মাত্র এক থেকে দেড় পিএসআইয়ে। কখনও কখনও লাইনে গ্যাসও থাকে না। ফলে দৈনিক ২৬ হাজার পাউন্ড সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে উৎপাদন কমে প্রায় ১৫ হাজার পাউন্ডে দাঁড়িয়েছে।
বোতলে গ্যাস এনে চালাতে হচ্ছে কারখানা
রূপগঞ্জের কাতরারচকের গ্রামটেক নিট ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক আইয়ুব হোসেন বলেন, গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে স্বাভাবিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী যন্ত্র চালানো যাচ্ছে না। কারখানা সচল রাখতে সিএনজি স্টেশন থেকে বোতলে করে গ্যাস কিনে এনে পাইপের সঙ্গে সংযোগ দিয়ে যন্ত্র চালাতে হচ্ছে। এরপরও মাঝেমধ্যে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
বরপা এলাকার একটি বুনন, রং ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, গ্যাসের চাপ কম থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী যন্ত্র চালাতে ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে প্রতি মাসে প্রায় এক কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। এত বাড়তি খরচের পরও উৎপাদন কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।
গ্যাস সংকটে ফিলিং স্টেশনও বিপর্যস্ত
শুধু শিল্পকারখানা নয়, গ্যাস সংকটে রূপগঞ্জের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোর কার্যক্রমও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। উপজেলার চারটি ফিলিং স্টেশনের কোনোটিতেই স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কোনো কোনো দিন গভীর রাতে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। দিনের বাকি ১৮ থেকে ১৯ ঘণ্টা স্টেশনগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে মালিকদের যেমন লোকসান হচ্ছে, তেমনি গ্যাসের জন্য চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে অন্য এলাকায় গিয়ে গ্যাস সংগ্রহ করছেন।
রংধনু ফিলিং স্টেশনের প্রকৌশলী মশিউর রহমান জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে ১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। দীর্ঘ সময় স্টেশন বন্ধ থাকলেও এখন পর্যন্ত কাউকে ছাঁটাই করা হয়নি। মালিকপক্ষ লোকসান বহন করেই প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। গ্যাস সংকট কেটে গেলে প্রতিষ্ঠানটি আবার লাভজনক অবস্থায় ফিরবে—এই আশাতেই কর্মীদের ধরে রাখা হয়েছে।
রূপগঞ্জের অন্য তিনটি ফিলিং স্টেশনের পরিস্থিতিও প্রায় একই। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় আয় কমে গেলেও মালিকরা কর্মীদের চাকরি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। তবে সংকট দীর্ঘ হলে কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
শ্রমিক বসে, তবু দিতে হচ্ছে বেতন
নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক নাঈম ভূঁইয়া জানান, তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টাই উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। প্রায় এক হাজার ২০০ শ্রমিকের হাতে পর্যাপ্ত কাজ না থাকলেও তাদের নিয়মিত বেতন দিতে হচ্ছে। এভাবে লোকসান চলতে থাকলে প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
শাহরিয়ার টেক্সটাইলের মালিক তারিকুল ইসলাম শাকিল ভূঁইয়া বলেন, গ্যাস সংকট এখন জাতীয় দুর্যোগের মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। দ্রুত সংকটের সমাধান না হলে দীর্ঘদিন কারখানা সচল রাখা সম্ভব হবে না। মাস শেষে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বর্তমানে তাদের কারখানার চার ভাগের মাত্র এক ভাগ চালু রেখে বাকি অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে কোনো শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়নি। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দ্রুত পুরো কারখানা চালু করার প্রত্যাশা করছেন তিনি।
মশিউর স্পিনিং অ্যান্ড টেক্সটাইলের মালিক মশিউর রহমান ভূঁইয়া জানান, গ্যাস না থাকায় তাদের গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী যন্ত্র প্রায় সারাদিন বন্ধ থাকে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। এর সঙ্গে লোডশেডিং যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
প্রায় দুই হাজার শ্রমিকের কাউকেই এখন পর্যন্ত ছাঁটাই করা হয়নি। কিন্তু প্রায় ১২ ঘণ্টা কাজ না থাকলেও তাদের বসিয়ে রেখে বেতন দিতে হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে একসময় রূপগঞ্জের অনেক কারখানা বন্ধ করে দিতে মালিকরা বাধ্য হতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

উৎপাদন অর্ধেকে, বাড়ছে উদ্বেগ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এম জেড স্পিনিংয়ের এক প্রকৌশলী জানান, গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী যন্ত্র চালানো যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। মালিকপক্ষ শ্রমিকদের কাজ না থাকলেও বেতন দিচ্ছেন। এতে প্রতি মাসে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
এভাবে আর কতদিন কর্মীদের বসিয়ে রেখে বেতন দেওয়া সম্ভব হবে, তা নিয়ে মালিকপক্ষও উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে নিজেদের কর্মসংস্থান নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন অনেক শ্রমিক-কর্মচারী।
এ-ওয়ান পোলার লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. শাহেদ হোসাইন বলেন, গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে শ্রমিকদের আয়েও। উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় অতিরিক্ত সময়ের কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে শ্রমিকদের বাড়তি আয়ও কমে গেছে।
উৎপাদন কমলেও ব্যয় কমছে না
শিল্প মালিকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, উৎপাদন কমলেও স্থায়ী ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই। শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণের সুদ, কারখানা রক্ষণাবেক্ষণ, কাঁচামাল ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় নিয়মিতই বহন করতে হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিকল্প জ্বালানির অতিরিক্ত খরচ। ফলে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
রপ্তানি নিয়েও বাড়ছে শঙ্কা
গ্যাস সংকটের কারণে রপ্তানিমুখী শিল্পেও উদ্বেগ বাড়ছে। নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার হারানোর আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।
বিশেষ করে সুতা, বুনন ও রং-প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হলে এর প্রভাব পড়ে তৈরি পোশাকশিল্পের পুরো সরবরাহব্যবস্থায়। একটি ধাপের উৎপাদন ব্যাহত হলে পরবর্তী ধাপেও সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি মো. সালেউদ জামান খান বলেন, রূপগঞ্জ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি। এখানকার উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব রপ্তানি আয় ও জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়বে। গ্যাস সংকটে পরিবহন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই দ্রুত সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
সাময়িক সমাধান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকট কাটবে না
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, সাময়িকভাবে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে কারখানা সচল রাখা সম্ভব হলেও দীর্ঘদিন এভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে এবং রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর সঙ্গে কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফলে রূপগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের বর্তমান সংকট আর শুধু গ্যাসের সংকট নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে উৎপাদন, বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ।
সংস্কারকাজ শেষে চাপ স্বাভাবিকের আশা
সংশ্লিষ্ট গ্যাস বিতরণকারী সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং লাইনের সংস্কারকাজ চলার কারণে সাময়িকভাবে গ্যাসের চাপ কমেছে। সংস্কারকাজ শেষ হলে ধীরে ধীরে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছেন তারা।
তবে উদ্যোক্তাদের দাবি, লোকসান দিয়ে হলেও তারা এখন পর্যন্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের ধরে রেখেছেন। কিন্তু স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হলে এই অবস্থান কতদিন ধরে রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
শিল্পকারখানা ও কর্মসংস্থান রক্ষায় তাই দ্রুত প্রয়োজনীয় চাপসহ নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দ্রুত সমাধান না হলে আজকের উৎপাদন সংকটই আগামী দিনে শিল্প বন্ধ ও কর্মসংস্থান হারানোর বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















