পাকিস্তানের ব্যবসায়ী মীর রাজা আলী হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। তার ব্যবহৃত স্মার্টঘড়ির ফরেনসিক পরীক্ষা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে পরিবার। পরিবারের আইনজীবী জিবরান নাসির স্মার্টঘড়িটি জাতীয় সাইবার অপরাধ তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে পরীক্ষা না করে পাঞ্জাব ফরেনসিক বিজ্ঞান সংস্থায় পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন।
মীর রাজা আলী আইবিএ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গত ২৮ জুলাই নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর করাচির গুলিস্তান-ই-জওহর এলাকায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শুরু থেকেই তার বাবা দাবি করে আসছেন, ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি আত্মহত্যার সম্ভাবনার কথা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
স্মার্টঘড়ি নিয়ে পরিবারের সন্দেহ
আইনজীবী জিবরান নাসির জানিয়েছেন, মীর রাজা আলীর স্মার্টঘড়িটি কয়েক দিন ধরে তদন্ত কমিটির সাবেক প্রধানের কাছে ছিল। পরে বুধবার সেটি জাতীয় সাইবার অপরাধ তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ওই সংস্থার মাধ্যমে স্মার্টঘড়িটির ফরেনসিক পরীক্ষা চান না। বরং লাহোরভিত্তিক পাঞ্জাব ফরেনসিক বিজ্ঞান সংস্থায় এর পরীক্ষা করার দাবি জানানো হয়েছে।
আইনজীবী নাসিরের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় অন্যের কাছে থাকার কারণে স্মার্টঘড়িটির তথ্য বা যন্ত্রাংশে কোনো ধরনের পরিবর্তন বা কারসাজি হয়ে থাকতে পারে। তাই নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার মাধ্যমে ঘড়িটিতে থাকা তথ্য উদ্ধার ও যাচাই করতে চায় পরিবার।
ঘটনাস্থলে নতুন তদন্ত কমিটি
এদিকে মীর রাজা আলীর মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে গঠিত নতুন কমিটি ফেরোজাবাদ থানায় বৈঠক করেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বৈঠকে মামলার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয় এবং তদন্তের দায়িত্ব সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।
বৈঠক শেষে কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। সেখানে নতুন করে আলামত সংগ্রহ ও বিভিন্ন তথ্য যাচাই করা হয়। আগের তদন্ত কর্মকর্তা দলটির সঙ্গে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং তদন্তকারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন।
নতুন তদন্ত কমিটির প্রধান করাচি শাখার উপমহাপরিদর্শকও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। কমিটির দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল ওই কর্মকর্তার প্রথম ঘটনাস্থল পরিদর্শন।
তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলের আশপাশের একটি নার্সারির কর্মীদের সঙ্গেও কথা বলেন। মরদেহ উদ্ধারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় জানতে তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
জাতীয় সাইবার অপরাধ তদন্ত সংস্থাকে চার চিঠি
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, উপমহাপরিদর্শক আমির ফারুকির নেতৃত্বাধীন নতুন তদন্ত দল জাতীয় সাইবার অপরাধ তদন্ত সংস্থাকে চারটি পৃথক চিঠি দিয়েছে।
এসব চিঠিতে মীর রাজা আলীর স্মার্টঘড়ির ফরেনসিক পরীক্ষা করার পাশাপাশি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অন্যান্য ডিজিটাল হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়েছে।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, মৃত্যুর আগে মীর রাজা আলীর গতিবিধি, যোগাযোগ এবং অবস্থান সম্পর্কে ডিজিটাল তথ্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে। বিশেষ করে স্মার্টঘড়িতে থাকা সময়, অবস্থান, শারীরিক কার্যক্রম ও অন্যান্য তথ্য মামলার ঘটনাপ্রবাহ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
নতুন তদন্ত কমিটি শিগগিরই ফেরোজাবাদ থানায় দ্বিতীয় দফা বৈঠকে বসবে। এরপর তারা আবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবে বলে জানা গেছে।
মীর রাজা আলীর মৃত্যুর ঘটনায় যেসব তথ্য সামনে এসেছে
মীর রাজা আলী ২৮ জুলাই নিখোঁজ হন। তদন্তে জানা যায়, ভোর ৩টা ৫৭ মিনিটে তিনি একটি গাড়ি ভাড়া করেছিলেন বলে ওই গাড়ির চালক জানিয়েছেন। পরদিন ২৯ জুলাই গুলিস্তান-ই-জওহর এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক তদন্ত ও ময়নাতদন্তের ফল নিয়ে শুরু থেকেই পরিবারের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়। পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে মরদেহ কবর থেকে তোলা হয় এবং নতুন করে ময়নাতদন্ত করা হয়।
নতুন ময়নাতদন্তে তার পিঠে গুলির আঘাতসহ শরীরে আরও কয়েকটি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে তার পরনের জামায় অ্যাসিডের কণা এবং গুলির অবশিষ্টাংশের উপাদান পাওয়া যাওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া রক্তের পরীক্ষায় ঘুমের ওষুধ বা প্রশান্তিদায়ক ওষুধের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তার পরিচয় নিশ্চিত করতে করা ডিএনএ পরীক্ষায় বাবা-মায়ের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে।
তদন্তে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে ডিজিটাল আলামত
নতুন তদন্ত দল দায়িত্ব নেওয়ার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন, প্রত্যক্ষ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মীর রাজা আলীর স্মার্টঘড়ি, মুঠোফোনের তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাব এবং অন্যান্য ডিজিটাল যোগাযোগের তথ্য তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এসব তথ্য এখনো পুরোপুরি বিশ্লেষণ করা হয়নি।
ঘটনার আগে ও পরে তার অবস্থান নির্ধারণে ভূ-অবস্থানভিত্তিক তথ্য, মুঠোফোনের তথ্য এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত আলামতও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
আগের তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন
মীর রাজা আলীর মৃত্যুর প্রথম দিকের তদন্ত নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে নানা প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। প্রাথমিক ময়নাতদন্তে গুরুতর ত্রুটির অভিযোগ ওঠার পর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ডা. ওসামাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তদন্তে প্রাথমিক ময়নাতদন্তে গুরুতর কিছু ত্রুটি পাওয়া গেছে বলে জানা যায়।
এদিকে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আদালত ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মীর রাজা আলী ও তার ছেলের সঙ্গে ঘটনাটির যোগসূত্র রয়েছে—এমন দাবি ছড়ানোর ঘটনায় জাতীয় সাইবার অপরাধ তদন্ত সংস্থা চারজনকে তলব করেছে।
সব মিলিয়ে স্মার্টঘড়ির ফরেনসিক পরীক্ষা, নতুন ময়নাতদন্তের ফল, রাসায়নিক ও রক্ত পরীক্ষার তথ্য এবং ডিজিটাল আলামত—এসব বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত নতুন দিকে এগোচ্ছে। পরিবারের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ ফরেনসিক পরীক্ষার দাবি এবং নতুন তদন্ত দলের ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ মামলাটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
মীর রাজা আলী কীভাবে মারা গেলেন, তার মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং মৃত্যুর আগে তার সঙ্গে কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। নতুন তদন্তে এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর মিলবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















