মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা আরও জটিল রূপ নিয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি দাবি, জাহাজে হামলা, মার্কিন নৌ অবরোধ এবং নতুন সামরিক তৎপরতায় পুরো অঞ্চলজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর সঙ্গে গাজায় ইসরায়েলি হামলা, ইয়েমেনের হুতিদের সামরিক তৎপরতা এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন নতুন সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোটের কার্যক্রম পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলেছে।
১৪ আগস্টের সর্বশেষ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকের তুলনায় কমে গেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরানের ওপর নৌ অবরোধ দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখনো তাদের হাতেই এবং নিজেদের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি বদলাবে না।
হরমুজ নিয়ে মুখোমুখি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে দুই দেশের বক্তব্যে এখন স্পষ্ট বিরোধ দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তবে ইরানের সামরিক বাহিনী এ দাবিকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইরানের সামরিক কমান্ডের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি বলেছেন, ইরানের অনুমতি ও তদারকি ছাড়া কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ বা তেলবাহী ট্যাংকারের নিরাপদে প্রণালি অতিক্রমের সুযোগ নেই। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেয়েদ আব্বাস আরাগচিও ট্রাম্পের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে সতর্ক করেছেন, ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্র আরও বড় ভুল করতে পারে।
সাম্প্রতিক হিসাবেও প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকের তুলনায় কম দেখা গেছে। ১৩ আগস্ট মাত্র নয়টি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করে, যেখানে আগস্টে দৈনিক গড় ছিল প্রায় ১২টি।
দুই আমিরাতি জাহাজে হামলা
উত্তেজনার মধ্যে বৃহস্পতিবার রাতে আবুধাবির রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান আদনকের দুটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় হামলার শিকার হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, হামলায় কোনো নাবিক আহত হননি এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত এ হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে এ অভিযোগের তাৎক্ষণিক কোনো স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়নি। হামলার ঘটনা প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে।
ইরানের ওপর অবরোধ আরও কঠোর করছে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে সমুদ্রপথে নজরদারি ও জাহাজ আটকের কার্যক্রম জোরদার করেছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১২ আগস্ট পর্যন্ত ৫৯টি বাণিজ্যিক জাহাজকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তিনটি জাহাজ অচল করা হয়েছে এবং দুটি জাহাজে ওঠা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই ব্যবস্থা মূলত ইরানমুখী বা ইরান থেকে আসা জাহাজের বিরুদ্ধে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও জাহাজ চলাচল নিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। একই সময়ে তেলবাহী জাহাজের চলাচল কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দামও বেড়েছে। শুক্রবার ব্রেন্ট তেলের দাম প্রায় ৮৮ ডলার ৫০ সেন্টে উঠে যায়।
সৌদি আরবে হুতিদের হামলার দাবি
হরমুজের পাশাপাশি ইয়েমেনের হুতিদের তৎপরতাও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
হুতিরা দাবি করেছে, তারা দক্ষিণ সৌদি আরবের জিজান অঞ্চলে আরামকোর একটি শোধনাগারে দুটি চালকবিহীন উড়োজাহাজ দিয়ে হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, সৌদি আরবের ইয়েমেনের সাদা ও হাজ্জাহ অঞ্চলে কর্মকাণ্ডের জবাব হিসেবে এ হামলা চালানো হয়েছে।
এর আগে হুতিরা লোহিত সাগরেও সৌদি সামরিক অবস্থান, অস্ত্রভাণ্ডার ও কমান্ডকেন্দ্রে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন উড়োজাহাজ দিয়ে হামলার দাবি করেছে।
এদিকে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিতেও জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সাম্প্রতিক এক হুতি হামলায় একটি ইয়েমেনি বাণিজ্যিক জাহাজে ছয়জন নিহত ও অন্তত নয়জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামুদ্রিক জোট
অন্যদিকে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট এখন কার্যক্রম শুরুর দিকে এগোচ্ছে। জেদ্দায় অনুষ্ঠিত তৃতীয় পরিকল্পনা বৈঠকে ৩৯টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন।
জোটের ১৫টি দেশ যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছে এবং ১৩টি দেশ নিজ নিজ দেশের অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষ করে আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে যোগ দিয়েছে। বাকি দেশগুলোও নিজেদের অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষ করছে।
এর অর্থ হলো, জোটটি শুধু পরিকল্পনার পর্যায়ে থাকছে না; ধীরে ধীরে যৌথ সামুদ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সামরিক সক্ষমতা সমন্বয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ
চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে নতুন একটি বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হচ্ছে, যাতে দীর্ঘদিন ধরে মোতায়েন থাকা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের জায়গা নেওয়া যায়।
লিংকন টানা প্রায় ২০০ দিন কোনো বন্দরে না থেমে সমুদ্রে অবস্থান করেছে। দীর্ঘ সময়ের এই মোতায়েনের কারণে জাহাজটির নাবিকদের খাবার, পানি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রশ্ন উঠেছে।
জাহাজটির দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন নিয়ে কয়েকজন মার্কিন আইনপ্রণেতা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। এদিকে নতুন যুদ্ধজাহাজের মধ্যপ্রাচ্যমুখী যাত্রা থেকে বোঝা যাচ্ছে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি এখনো কমেনি।
প্রথমবারের মতো বহুজাতিক চালকবিহীন যুদ্ধবাহিনী
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ‘ফ্যালকন স্ট্রাইক’ নামে একটি বহুজাতিক চালকবিহীন যুদ্ধবাহিনী। এতে আকাশ, সমুদ্র ও পানির নিচে পরিচালিত বিভিন্ন ধরনের চালকবিহীন যুদ্ধব্যবস্থা ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, এ বাহিনীতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আঞ্চলিক অংশীদারদের সামরিক সদস্যরাও যুক্ত থাকবেন।
এর নয় মাস আগে মধ্যপ্রাচ্যে একমুখী হামলায় ব্যবহৃত চালকবিহীন যুদ্ধব্যবস্থার জন্য আরেকটি বিশেষ বাহিনী গঠন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

গাজায় আবারও ইসরায়েলি হামলা
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার পাশাপাশি গাজাতেও নতুন করে হামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি হামলায় দুইজন নিহত হয়েছেন বলে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, খান ইউনিস এলাকায় হামাসের একজন কমান্ডারকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, ওই ব্যক্তি ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা করছিলেন।
আরব লীগের মহাসচিব নাবিল ফাহমি ইসরায়েলের গাজা, পশ্চিম তীর ও দক্ষিণ লেবাননে সামরিক তৎপরতার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি তৈরি করতে পারে।
ইরানের তেল ছড়িয়ে পড়া নিয়েও বিরোধ
হরমুজ সংকটের মধ্যে ইরানের কেশম দ্বীপের উপকূলে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। ইরান বলছে, বিদেশি একটি পণ্যবাহী জাহাজ থেকে তেল ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর ফলে উপকূলীয় পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেহরান এ ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।
তবে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী একটি প্রতিষ্ঠানের দাবি, তেল ছড়িয়ে পড়ার উৎস হতে পারে ওমানের জলসীমায় ৩ আগস্ট ইরানের হামলার শিকার হওয়া ‘মিনোয়ান পাইওনিয়ার’ নামের একটি পণ্যবাহী জাহাজ। তাদের মতে, সেখান থেকে তেল স্রোতের সঙ্গে ভেসে ইরানের দিকে পৌঁছাতে পারে।
মৃত্যুদণ্ড নিয়ে ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ
এদিকে ইরানে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার অভিযোগ নিয়েও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। ফ্রান্স, ব্রিটেন, কানাডাসহ ৩০টির বেশি দেশ ইরানের মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহারের নিন্দা জানিয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে দেশগুলো বলেছে, মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার প্রয়োগকারীদের ভয় দেখাতে মৃত্যুদণ্ড ব্যবহার করা গ্রহণযোগ্য নয়। তারা ইরানকে মৃত্যুদণ্ড বন্ধ এবং নির্বিচারে আটক ব্যক্তিদের মুক্তির আহ্বান জানিয়েছে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি এসব অভিযোগের জবাবে পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনা করেছেন এবং গাজা ও ইরান নিয়ে তাদের অবস্থানকে দ্বিমুখী বলে মন্তব্য করেছেন।
সংকটের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে
হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা শুধু সামরিক সংঘাতের বিষয় হয়ে থাকছে না; এর অর্থনৈতিক প্রভাবও ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাবে, হরমুজ সংকট ও উচ্চ জ্বালানি দামের কারণে ২০২৬ সালে বিশ্বে তেলের চাহিদা ১৬ লাখ ব্যারেল প্রতিদিন কমতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন ২০২৬ সালে নতুন রেকর্ডে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ সংকট সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি অবস্থান, জাহাজে হামলা, নৌ অবরোধ, তেলবাজারের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে সামরিক তৎপরতা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর করে তুলেছে। কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রগতি না এলে এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে তার প্রভাব জ্বালানি বাজার ছাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















