কুমিল্লা শহরের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। টানা দুই দিন ধরে অনেক বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। কোথাও আবার একেবারেই গ্যাস মিলছে না। এতে নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সংসারের খরচও বেড়ে গেছে।
গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে রান্না করা খাবার কিনে খাচ্ছে। কেউ কেউ বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন। আবার বিদ্যুৎ না থাকলে উঠান বা খোলা জায়গায় অস্থায়ী চুলা তৈরি করে রান্না করতে হচ্ছে। ফলে প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজও অনেক পরিবারের কাছে বাড়তি ঝামেলায় পরিণত হয়েছে।
নজরুল অ্যাভিনিউ এলাকার বাসিন্দা গোলাম কিবরিয়া জানান, তার বাসায় ৩১ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে গ্যাসের কোনো সরবরাহ নেই। রান্না বন্ধ থাকায় পরিবারের সদস্যদের জন্য বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে খাবারের দোকানেও ক্রেতার চাপ বেড়ে গেছে।
ব্যাংকার আবু সোলায়মান জানান, আগের দিন তিনি রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনে নিয়েছিলেন। কিন্তু পরদিন সেখানেও প্রয়োজনীয় খাবার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তার মতে, গ্যাস সংকটের কারণে কুমিল্লা শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় থমকে গেছে।
গৃহিণী সুমাইয়া আক্তারের অভিজ্ঞতাও একই রকম। আগের দিন তিনি বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করতে পারলেও পরদিন বিদ্যুৎ না থাকায় সেই সুযোগও পাননি। শেষ পর্যন্ত বাড়ির উঠানে অস্থায়ী চুলা তৈরি করে রান্না করতে হয়েছে তাকে।
গ্যাসের এই সংকটের প্রভাব পড়েছে রেস্তোরাঁ ও খাবারের দোকানেও। বাসাবাড়িতে রান্না করতে না পারায় মানুষ খাবারের জন্য এসব দোকানে ভিড় করছেন। ফলে খাবারের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে।
একটি রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক সোহেল রহমান জানান, অতিরিক্ত ক্রেতার চাপ সামলাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। ভাত, রুটি থেকে শুরু করে বেকারি পণ্যের চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু রান্না ও প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় গ্যাস সংকট থাকায় বাড়তি চাহিদা অনুযায়ী খাবার সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে বাখরাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানি জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ভাসমান সংরক্ষণ ও গ্যাসীকরণ ইউনিট থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায়।
কোম্পানির আওতাধীন কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। সাময়িক এই সমস্যার জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহযোগিতা চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পরিবারের রান্নার দায়িত্বে থাকা মানুষদের। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে বাড়তি অর্থ খরচ হচ্ছে। আবার বাইরে থেকে খাবার কিনতে গিয়ে সংসারের দৈনন্দিন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
অনেক পরিবার বলছে, গ্যাস না থাকার কারণে একটি কাজ করতে গিয়ে আরেকটি সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। গ্যাসের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। আবার বিদ্যুৎ থাকলেও সব পরিবারের পক্ষে বৈদ্যুতিক চুলায় নিয়মিত রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না।
গ্যাস সংকটের কারণে ছোট খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁগুলোর ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে ক্রেতা বেড়েছে, অন্যদিকে রান্নার কাজে প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে খাবার প্রস্তুত ও সরবরাহের স্বাভাবিক ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটছে।
কবে স্বাভাবিক হবে, জানা নেই
গ্যাস সরবরাহ কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দিতে পারেনি বাখরাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানি।
প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. সোলায়মান জানিয়েছেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি ভালো নয়। কখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।
এই অনিশ্চয়তার কারণে কুমিল্লার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার রান্নার জন্য সম্পূর্ণভাবে পাইপলাইনের গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তাদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।
দ্রুত সমাধান চান নগরবাসী
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। দীর্ঘ সময় গ্যাস না থাকলে শুধু রান্না বন্ধ থাকে না, পুরো পরিবারের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব পড়ে।
তাদের দাবি, সাময়িক সংকট হলেও দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে যাতে সাধারণ মানুষ দীর্ঘ সময় ভোগান্তিতে না পড়েন, সে জন্য কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।
কুমিল্লার বাসিন্দাদের আশা, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং আবারও ঘরে ঘরে স্বাভাবিকভাবে রান্নার চুলা জ্বলবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















