বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন যে অস্থিরতা দৃশ্যমান, তা কেবল চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দ্বন্দ্ব, ইউরোর দুর্বলতা কিংবা জাপানি ইয়েনের পতনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এসব সমস্যার পেছনে রয়েছে আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী কিছু ভারসাম্যহীনতা—অতিরিক্ত সঞ্চয় ও কম ভোগ, বিপরীত দিকে অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় ও ঋণ, উৎপাদন ও চাহিদার অসামঞ্জস্য, এবং এক দেশের উদ্বৃত্তের বিপরীতে অন্য দেশের ঘাটতি।
বিগত কয়েক মাসে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের আলোচনায় মুদ্রার বিনিময় হার বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। চীনা ইউয়ানের মূল্য কমে যাওয়া, ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং ইয়েনকে সমর্থন দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের পদক্ষেপ—সবকিছুই যেন একটি প্রশ্নকে সামনে এনেছে: কোন দেশের মুদ্রার দাম কত হওয়া উচিত?
কিন্তু সমস্যার কেন্দ্র সম্ভবত সেখানে নয়। বিনিময় হার অনেক সময় সংকটের কারণ নয়, বরং সংকটের বহিঃপ্রকাশ। মুদ্রার দরে চাপ তৈরি হয় যখন একটি অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়, ভোগ, বিনিয়োগ, সরকারি ব্যয় ও বৈদেশিক বাণিজ্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের অসামঞ্জস্য জমা হতে থাকে।
চীনের উদ্বৃত্তের পেছনে যে বাস্তবতা
চীনের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে বিতর্কে প্রায়ই ইউয়ানের মূল্যকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়। কিন্তু এই ব্যাখ্যা চীনা অর্থনীতির ভেতরের পরিবর্তনগুলোকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না।
চীনের দীর্ঘদিনের উচ্চ সঞ্চয়, উৎপাদন সক্ষমতার বিস্তার, অভ্যন্তরীণ ভোগের তুলনামূলক দুর্বলতা এবং আবাসন খাতের সংকট—সব মিলিয়ে দেশটির অর্থনীতিতে বিপুল উৎপাদন উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত সামাজিক নিরাপত্তার অভাব সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়িয়েছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বর্তমান আয় থেকে বেশি অংশ জমিয়ে রাখতে চায়।
এর ফল হলো—অর্থনীতিতে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ছে না। অতিরিক্ত উৎপাদনের একটি বড় অংশ তখন বিদেশি বাজারের দিকে যায়। এর ফলে রপ্তানি বাড়ে, বাণিজ্য উদ্বৃত্তও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
এই অবস্থায় ইউয়ানের ওপর নিম্নমুখী চাপ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাই কেবল মুদ্রার মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে সমস্যার সমাধান করা হলে মূল কারণগুলো অক্ষতই থেকে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যাটি আবার প্রায় বিপরীত
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে চিত্রটি অনেকাংশে উল্টো। দীর্ঘস্থায়ী সরকারি বাজেট ঘাটতি, উচ্চ ভোগ এবং তুলনামূলক কম সঞ্চয় দেশটির অর্থনীতিকে বৈদেশিক অর্থের ওপর বেশি নির্ভরশীল করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে বিশেষ মর্যাদা।
বিশ্বজুড়ে ডলারের চাহিদা থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী মুদ্রার সুবিধা পায়। কিন্তু এর একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে—মার্কিন পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক ব্যয়বহুল হতে পারে এবং দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
অতএব চীনকে শুধু ইউয়ান শক্তিশালী করতে চাপ দিলেই যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামোগত সমস্যা দূর হবে না। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতি কমানোর প্রশ্নটিও কেবল মুদ্রাবাজারের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়।
মুদ্রার মূল্যকে অস্ত্র বানালে বিপদ বাড়বে
চীনের ইউয়ানের সাম্প্রতিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে। মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপকে সরাসরি রপ্তানি বাড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখা যথেষ্ট সরলীকরণ।
চীন যদি কেবল রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়ানোর জন্য ইউয়ানকে দুর্বল করতে চাইত, তাহলে মুদ্রার পতন ঠেকাতে কেন পদক্ষেপ নেবে—এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবে মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রয়োজনও থাকে, বিশেষ করে যখন অতিরিক্ত অস্থিরতা মূলধন প্রবাহ ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
আর ইউয়ানকে জোর করে শক্তিশালী করলেও সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে না। চীনের অনেক রপ্তানি ডলারে মূল্যায়িত হয়। ফলে বিনিময় হার পরিবর্তনের প্রভাব বাস্তব অর্থনীতিতে পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে। তাছাড়া কেবল মুদ্রার মূল্য পরিবর্তন করে চীনের অতিরিক্ত উৎপাদন বা দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদার সমস্যার সমাধান করা যায় না।
প্লাজা অ্যাকর্ডের শিক্ষা ভুলভাবে নেওয়া উচিত নয়
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৮৫ সালের প্লাজা অ্যাকর্ডের প্রসঙ্গ আবার সামনে আসছে। তখন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মূল্য বাড়ানোর পথ তৈরি হয়েছিল। সেই সময়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা এই সমঝোতাকে সম্ভব করেছিল।
কিন্তু বর্তমান চীন সেই সময়ের জাপান নয়। চীনের অর্থনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক ব্যবস্থা, বৈশ্বিক অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক—সবই আলাদা। তাই পুরোনো একটি চুক্তির কাঠামোকে হুবহু পুনরাবৃত্তি করার চেষ্টা বাস্তবসম্মত হবে না।
বরং জাপানের পরবর্তী অভিজ্ঞতা থেকে সতর্ক হওয়া দরকার। ইয়েনের দ্রুত শক্তিশালী হওয়া দেশটির অর্থনীতিতে এমন কিছু চাপ তৈরি করেছিল, যার সঙ্গে পরবর্তী ‘হারানো দশক’-এর সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়েছে। অর্থাৎ একটি দেশের মুদ্রাকে কৃত্রিমভাবে নির্দিষ্ট পথে ঠেলে দেওয়া সব সময় কাঙ্ক্ষিত ফল আনে না।
জাপানের ইয়েন সংকট আরও বড় সতর্কবার্তা
ইয়েনের সাম্প্রতিক দুর্বলতা বৈশ্বিক অর্থনীতির আরেকটি দুর্বল জায়গা প্রকাশ করেছে। জাপানের কর্তৃপক্ষ মুদ্রাটিকে সমর্থন দিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও এর কাঠামোগত চাপ পুরোপুরি দূর হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েন সমর্থনের পদক্ষেপকেও কেবল বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এর পেছনে মার্কিন ট্রেজারি বাজারের স্থিতিশীলতার প্রশ্নও রয়েছে। জাপান যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সিকিউরিটির অন্যতম বড় বিদেশি ধারক। ইয়েনের পতন ঠেকাতে জাপানি বিনিয়োগকারীরা যদি বিপুল পরিমাণ মার্কিন সম্পদ বিক্রি করে দেশে অর্থ ফেরত নিতেন, তাহলে মার্কিন বন্ডের ওপর বিক্রির চাপ বাড়তে পারত এবং সুদের হার আরও ওপরে উঠতে পারত।
অর্থাৎ একটি দেশের মুদ্রা সংকট দ্রুত অন্য দেশের আর্থিক বাজারেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশ্ব অর্থনীতি যত বেশি আন্তঃনির্ভরশীল হচ্ছে, এই ঝুঁকিও তত বাড়ছে।

ঋণের বোঝাই সবচেয়ে বড় বিপদ
এখানেই বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি সামনে আসে। জাপানের সরকারি ঋণ তার মোট দেশজ উৎপাদনের দ্বিগুণেরও বেশি। সরকারি ব্যয়ের একটি বড় অংশ ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের সামনে সহজ কোনো পথ থাকে না। বাজেট ঘাটতি কমাতে ব্যয় সংকোচন করলে অর্থনীতির ওপর চাপ পড়ে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ালে ঋণের খরচ আরও বাড়ে। সম্পদ বিক্রি করলে সাময়িক অর্থ পাওয়া যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হয় না।
আর সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, জাপানের সমস্যা একা নয়। বিশ্বের আরও কয়েকটি উন্নত অর্থনীতিতে সরকারি ঋণের মাত্রা অত্যন্ত বেশি। ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, শিক্ষা বা অন্যান্য জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয়ের জায়গা সংকুচিত হতে পারে।
ঋণের বোঝা বাড়তে থাকলে বিনিয়োগকারীরাও ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হবেন। রাষ্ট্রের ঋণ পরিশোধ নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে ঋণের সুদও বাড়তে পারে। তখন একটি বিপজ্জনক চক্র তৈরি হয়—ঋণ বাড়ে, সুদ বাড়ে, সুদ পরিশোধে আরও ঋণ লাগে।
সমাধান তাই একক কোনো দেশের মুদ্রায় নেই
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান সমস্যার সবচেয়ে বড় ভুল হবে এটিকে এক দেশের মুদ্রার মূল্য কিংবা এক দেশের বাণিজ্য নীতির ফল হিসেবে দেখা।
চীনের প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ ভোগ বাড়ানো, সামাজিক নিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং উৎপাদন ও চাহিদার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি নিরাপদ বোধ করলে অতিরিক্ত সঞ্চয়ের বদলে ভোগে অর্থ ব্যয়ের প্রবণতা বাড়তে পারে। এতে দেশটির বিপুল উদ্বৃত্ত ধীরে ধীরে কমার সুযোগ তৈরি হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রয়োজন দীর্ঘস্থায়ী সরকারি ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ এবং সঞ্চয়ের সক্ষমতা বাড়ানো। শুধু সুদের হার কিংবা ডলারের বিনিময় হার দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না।
ইউরোপসহ অন্যান্য অর্থনীতিরও নিজেদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বৈশ্বিক উদ্বৃত্ত ও চাহিদার ভারসাম্যহীনতার অভিঘাত থেকে কোনো দেশ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকতে পারবে না।
বড় বিপদটি আসলে অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা নয়, সমাধানের ব্যর্থতা
আজকের বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা অন্য দেশের বাজারে দ্রুত প্রতিফলিত হয়। চীনের উদ্বৃত্ত, যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতি, জাপানের ঋণ এবং ইয়েনের দুর্বলতা আলাদা আলাদা সমস্যা মনে হলেও এগুলো একই বৈশ্বিক ব্যবস্থার পরস্পর-সংযুক্ত অংশ।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, সমস্যাগুলোর অনেকগুলোর সমাধান অর্থনীতিবিদদের অজানা নয়। কীভাবে সঞ্চয় ও ভোগের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা যায়, কীভাবে সরকারি ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কীভাবে সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ানো যায় কিংবা কীভাবে অতিরিক্ত ঋণের ঝুঁকি কমানো যায়—এসব নিয়ে বহুদিন ধরেই আলোচনা চলছে।
অভাবটি জ্ঞানের নয়; অভাব রাজনৈতিক সদিচ্ছার।
এই কারণেই বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে শুধু ‘ভারসাম্যহীনতা’ বলে বর্ণনা করলে যথেষ্ট হয় না। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের ভুল অগ্রাধিকার, স্বল্পমেয়াদি সুবিধার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি গ্রহণ এবং এক দেশের সমস্যার সমাধান অন্য দেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা।
মুদ্রার বিনিময় হার নিয়ে লড়াই হয়তো সংবাদে বেশি জায়গা পাবে। কিন্তু প্রকৃত লড়াই হওয়া উচিত সঞ্চয়, ভোগ, ঋণ, সরকারি ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং উৎপাদন কাঠামো নিয়ে। এই গভীর সংস্কার ছাড়া বৈশ্বিক অর্থনীতির ভারসাম্য ফিরবে না।
বর্তমান পরিস্থিতি তাই কেবল আরেকটি অর্থনৈতিক সংকটের পূর্বাভাস নয়। এটি দীর্ঘদিনের ভুল সিদ্ধান্তের জমে ওঠা ফল। সেই ভুল থেকে বেরিয়ে আসার পথ আছে—কিন্তু পথটি রাজনৈতিকভাবে কঠিন, ধীর এবং ব্যয়বহুল। আর যত দেরি হবে, সেই মূল্য ততই বাড়বে।
মাহমুদ মোহেলদিন 

















