ভারতে ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লালকেল্লায় হামলার ঘটনায় আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (একিউআইএস)-এর সম্পৃক্ততা সরকারি পর্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে ব্যবহার করে নিজেদের সেল গড়ে তোলার চেষ্টা নিয়ে উদ্বেগের কথাও উঠে এসেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটবিষয়ক নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ দলের দ্বিবার্ষিক প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একিউআইএস একটি বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত সংগঠন থেকে ধীরে ধীরে আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনে রূপ নিচ্ছে। বড় ও কেন্দ্রীভূত ইউনিটের পরিবর্তে ছোট, বিচ্ছিন্ন ও বিকেন্দ্রীভূত সেলের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার দিকে ঝুঁকেছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে তারা সরবরাহ ও আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশকে ঘিরে উদ্বেগ
জাতিসংঘের ৩৮তম প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একিউআইএসের বাংলাদেশকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সেল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা নিয়ে কিছু উদ্বেগ রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসী তৎপরতার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়, সামগ্রিকভাবে সন্ত্রাসী হুমকির মাত্রা বড় ধরনের পরিবর্তন দেখায়নি। তবে সাহেল অঞ্চল ও দক্ষিণ এশিয়ায় এ হুমকি বেড়েছে। আল-কায়েদার শীর্ষ নেতৃত্ব এখনও অনেকটা প্রান্তিক অবস্থায় রয়েছে এবং বিদেশে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা ও উদ্দেশ্য কতটা রয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাড়ছে উত্তেজনা
প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সীমান্তপারের হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) বিপুলসংখ্যক হামলার পর এসব সংঘাত তীব্র হয়েছে।
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষ টিটিপিকে সমর্থন দিয়ে চলেছে। এর ফলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টিটিপির হামলা বেড়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে সামরিক পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তালেবান প্রকাশ্যে আফগানিস্তানে কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
তবে সদস্য দেশগুলো আশঙ্কা করছে, চলমান সংঘাত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। আফগানিস্তানে বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা প্রতিবেশী দেশগুলোসহ মধ্য এশিয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা হুমকি হয়ে রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতা
প্রতিবেদনে ইসলামিক স্টেট ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠীর তৎপরতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। ইসলামিক স্টেটের নেতা আবু বকর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আলী আল-মাইনুকির মৃত্যু সংগঠনটির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে যোগাযোগ সক্ষমতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে জামা’আত নুসরাত উল-ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন ও ইসলামিক স্টেট ইন দ্য গ্রেটার সাহারার মধ্যে সহিংস প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়েছে। একই সময়ে আল-শাবাব আরও লক্ষ্যভিত্তিক ও কৌশলগত অভিযান চালানোর দিকে ঝুঁকছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আটক শিবির বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি ইসলামিক স্টেট কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে। ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে নিরাপত্তাশূন্যতার সুযোগ নিয়ে ২০২৬ সালের শুরুতে আল-কায়েদা ইন দ্য অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলাও নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেট-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো অর্থ সংগ্রহ এবং স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল করতে মুক্তিপণের বিনিময়ে অপহরণকে এখনও অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেট-খোরাসানসহ অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তালেবান কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ থাকলেও সন্ত্রাসী তৎপরতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ, একিউআইএস, দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসী তৎপরতা
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশকে ব্যবহার করে একিউআইএসের সম্ভাব্য সেল গঠনের উদ্বেগ দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। একই সঙ্গে আফগানিস্তানকেন্দ্রিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম এবং পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাত পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও জটিল করে তুলছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ব্যবহার করে একিউআইএসের সেল গঠনের উদ্বেগ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বাড়তে থাকা সন্ত্রাসী ঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















