প্রতি বছর বর্ষা এলেই ভারতের আসামে নেমে আসে বৃষ্টি, নদীর পানি বাড়ে, ভাঙে বাঁধ, প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ জনপদ। ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, ফসল ও মানুষের স্বাভাবিক জীবন মুহূর্তের মধ্যে তছনছ হয়ে যায়। এবারের বন্যায়ও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এক লাখ ২৬ হাজারের বেশি মানুষ এখনো বন্যার দুর্ভোগে রয়েছেন এবং শতাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
আসামের মানুষের কাছে বন্যা শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি তাদের জীবনযাত্রারই অংশ। ব্রহ্মপুত্র ও তার অসংখ্য শাখা-প্রশাখা, পাহাড়, বন ও নদীঘেরা ভূপ্রকৃতির সঙ্গে এখানকার মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবিকা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ফলে বন্যা যেমন মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, তেমনি নদীই আবার নতুন মাটি, নতুন চর ও নতুন জীবনের সুযোগ তৈরি করে।
নদীর রুদ্ররূপ, মানুষের অসহায়তা
আসামের বন্যার ভয়াবহতা বোঝাতে শিল্পী জুবিন গর্গের একটি গানের কথা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সেখানে বন্যার গর্জনে একটি পরিবারের ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু মুহূর্তের মধ্যে ভেসে যাওয়ার বেদনা তুলে ধরা হয়েছে। কয়েকটি মুহূর্তের মধ্যেই একটি পরিবারের বহু বছরের সাজানো জীবন কীভাবে শেষ হয়ে যেতে পারে, সেই বাস্তবতাই এতে ফুটে ওঠে।
এবারের বন্যায় ডিখৌ নদীর পানি বেড়ে যাওয়াকে বড় একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নদীটি ব্রহ্মপুত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। আসামের বাসিন্দা ও কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রতিবেশী নাগাল্যান্ডে অবৈধ কয়লা উত্তোলনের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। তাদের দাবি, এর ফলে এমন কিছু এলাকাও প্লাবিত হয়েছে যেগুলো আগে নিয়মিত বন্যাকবলিত হতো না।
তবে নদী বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, বন্যার জন্য একটি কারণকে দায়ী করলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যাবে না। প্রাকৃতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের নানা কর্মকাণ্ডও বন্যার ভয়াবহতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ নয়, বুঝতে হবে
সাংবাদিক ও লেখক সঞ্জয় হাজারিকার ব্রহ্মপুত্রকে নিয়ে লেখা গ্রন্থে নদীটির এই দ্বৈত চরিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৫০ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ব্রহ্মপুত্র তার গতিপথ বদলে নতুন নতুন প্রবাহপথ তৈরি করে এবং নতুন চর ও নদীদ্বীপের জন্ম দেয়।
অর্থাৎ ব্রহ্মপুত্র শুধু ধ্বংস করে না, সৃষ্টি করেও। নদী একদিকে মানুষের বসতি ও সম্পদ ভাসিয়ে নেয়, অন্যদিকে নতুন ভূমি ও জীবিকার সুযোগ তৈরি করে।
হাজারিকার মতে, বর্তমান বন্যা পরিস্থিতির একটি বড় অংশ মানুষের কর্মকাণ্ডের ফল। যথাযথ পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করে সড়ক নির্মাণ, পাহাড়ে নির্বিচারে বন উজাড়, নদী ও নদীর তীর থেকে পাথর-মাটি উত্তোলন এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনপথ পলি ও আবর্জনায় বন্ধ হয়ে যাওয়া—সবকিছু মিলে বন্যার পানি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি করে।
প্রাকৃতিক ছোট নদী, খাল ও জলধারা পলিতে ভরাট হয়ে গেলে পানি স্বাভাবিক পথে নামতে পারে না। তখন অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ পানি ও কাদা জনবসতিতে ঢুকে পড়ে।
এই বাস্তবতা সামনে রেখে নদীকে নিয়ন্ত্রণ করার বদলে নদীর স্বাভাবিক আচরণ বোঝার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্রের ওপর চীনের বিশাল বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের প্রসঙ্গ টেনে সতর্ক করা হয়েছে, প্রতিটি সমস্যার জবাব আরেকটি বিশাল প্রকল্প দিয়ে দেওয়া সবসময় সমাধান নয়। প্রকৃতির শক্তি মানুষের চেয়ে অনেক বড়—তাই নদীর সঙ্গে আচরণে আরও বিনয়ী ও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।
বন্যাকে ঘিরেই বদলে যায় জীবনের ক্যালেন্ডার
আসামের নিচু এলাকাগুলোতে বসবাসকারী মানুষের কাছে বন্যা প্রতিবছরের পরিচিত বাস্তবতা। তারা শুধু বন্যার ক্ষতি সহ্য করেন না, বন্যার সঙ্গে খাপ খাইয়ে জীবনও সাজিয়ে নিয়েছেন।
আসামকে ঘিরে প্রকাশিত গল্প সংকলনে এমন মানুষের জীবন উঠে এসেছে, যারা বছরের পর বছর বন্যার সঙ্গে বসবাস করতে করতে নিজেদের জীবনযাত্রায় এর জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন।
একটি গল্পে দেখা যায়, সুন্দরগ্রামের এক বৃদ্ধ শিক্ষক প্রতিবছর বন্যার জন্য অপেক্ষা করেন। কারণ বন্যা এলে তার গ্রীষ্মের ছুটি দীর্ঘ হয়। সেই সময়টুকুই পরিবারের সঙ্গে থাকার সুযোগ এনে দেয়। কিন্তু বন্যার জন্য এমন আকাঙ্ক্ষাকে তিনি অপরাধবোধের সঙ্গে দেখেন। তাই নিয়মিত ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
শেষ পর্যন্ত নিজের ছুটি বিসর্জন দিয়ে তিনি নৌকার ওপর একটি ভাসমান পাঠাগার গড়ে তোলেন। বন্যার সময় যখন মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন সেই ভাসমান পাঠাগার হয়ে ওঠে জ্ঞান ও মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের একটি মাধ্যম।
এই গল্প দেখায়, বন্যা শুধু ধ্বংসের গল্প নয়। মানুষের সৃজনশীলতা, মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং অন্যের পাশে দাঁড়ানোর শক্তিও বন্যার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে।
ইতিহাসের কেন্দ্রেও ব্রহ্মপুত্র
ইতিহাসবিদ অরূপজ্যোতি শইকিয়ার ব্রহ্মপুত্রকে নিয়ে গবেষণাধর্মী গ্রন্থে নদীটিকে আসামের ইতিহাসের কেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়েছে। প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত নদী কীভাবে মানুষের বসতি, কৃষি, বাণিজ্য ও অভিবাসনের গতিপথ নির্ধারণ করেছে, সেখানে তার দীর্ঘ বিবরণ রয়েছে।
ভূতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব ও ঐতিহাসিক নথির সাহায্যে দেখানো হয়েছে, মানুষের সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের সম্পর্ক কখনোই একমুখী ছিল না। নদী যেমন মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি মানুষও নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী নদীকে বদলানোর চেষ্টা করেছে।
ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণ, চা-বাগানের বিস্তার, সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ এবং পরবর্তী সময়ে বাঁধ ও নদী নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন উদ্যোগ ব্রহ্মপুত্রের পরিবেশ ও স্বাভাবিক গতিপথে পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু নদী বারবার মানুষের তৈরি বাঁধ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে অতিক্রম করে নিজের শক্তির জানান দিয়েছে।
ঘর হারিয়েও ঘরে ফেরে মানুষ
প্রতি বর্ষায় নদী ফুলে ওঠে, গর্জে ওঠে। বন্যার তীব্রতা কখনো কম, কখনো বেশি। কিন্তু ধ্বংসের স্মৃতি থেকে যায়। বন্যার পানি চলে যাওয়ার পরও মানুষের জীবনে তার প্রভাব দীর্ঘদিন থাকে।
তারপরও মানুষ এসব এলাকা ছেড়ে যায় না। তারা আবার ঘর তোলে, জমি পরিষ্কার করে, জীবিকা ফিরিয়ে আনে এবং নতুন করে জীবন শুরু করে। কারণ সেটিই তাদের ঘর, তাদের শিকড়, তাদের পরিচিত পৃথিবী।
ব্রহ্মপুত্রের মতোই নদীর তীরের মানুষের জীবনেও যেন একই দ্বৈততা রয়েছে। তারা একদিকে হারায়, অন্যদিকে আবার গড়ে তোলে। বারবার ভাঙনের পরও তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি শেষ হয় না।
সমাধান নদীর বিরুদ্ধে নয়, নদীর সঙ্গে
আসামের বন্যাকে কেবল প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানুষের তৈরি নানা সংকটও পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলছে। অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ, পাহাড় ধ্বংস, নদী থেকে অতিরিক্ত মাটি-পাথর উত্তোলন এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনপথ বন্ধ হয়ে যাওয়া—এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষকে বাস্তবতার বাইরে ঠেলে না দিয়ে তাদের অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় জ্ঞানকে গুরুত্ব দিতে হবে। বন্যার সঙ্গে যারা বছরের পর বছর বসবাস করছেন, তাদের জীবনযাপনের কৌশল থেকেই অনেক কার্যকর সমাধানের পথ পাওয়া যেতে পারে।
আসামের বন্যা তাই শুধু একটি মৌসুমি দুর্যোগের গল্প নয়। এটি মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্কের একটি বড় শিক্ষা। নদীকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা না করে তার স্বাভাবিক গতিপথ, শক্তি ও প্রয়োজনকে বুঝতে হবে। প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত যত বাড়বে, বিপদও তত বাড়তে পারে।
ব্রহ্মপুত্র বারবার মনে করিয়ে দেয়—মানুষ প্রকৃতিকে নিজের ইচ্ছামতো চালাতে পারে না। বরং প্রকৃতির শক্তিকে সম্মান করে, তার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে এবং নিজেদের ভুলগুলো সংশোধন করেই নিরাপদ ভবিষ্যতের পথ তৈরি করতে হবে।
বন্যা হয়তো আসামের জীবন থেকে পুরোপুরি কখনোই মুছে যাবে না। কিন্তু পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ রক্ষা এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে সম্মান করার মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। নদীর সঙ্গে যুদ্ধ নয়—নদীকে বুঝে, তার সঙ্গে সহাবস্থান করাই হয়তো আসামের মানুষের টিকে থাকার সবচেয়ে বাস্তব পথ।
আসামের বন্যা আমাদের জন্যও একটি সতর্কবার্তা—প্রকৃতিকে জয় করার নয়, প্রকৃতির সঙ্গে বাঁচার শিক্ষা নিতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















