রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সচিবালয়ে দলের বৈঠক হয়েছে—এমন সমালোচনার জবাব দিয়েছেন বিএনপির নেতারা। তাদের দাবি, সচিবালয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি; সেখানে শুধু নেতাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার নির্বাচন ভবনে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সাংবাদিকদের বলেন, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী বাছাইয়ের দায়িত্ব আগেই দেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি দলের নেতাদের ডেকে তাঁর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, রাষ্ট্রপতি প্রার্থী নির্বাচনের জন্য আলাদা কোনো বৈঠকের প্রয়োজন হয়নি। তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করা হয়েছে।
সচিবালয়ে কী হয়েছিল
বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, সচিবালয়ে দলের কয়েকজন নেতার মধ্যে যে আলোচনা হয়েছে, সেটিকে স্থায়ী কমিটির আনুষ্ঠানিক বৈঠক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, আলোচনা যেকোনো জায়গায় হতে পারে এবং সচিবালয়ে সেদিন এমন কোনো সভা হয়নি, যেখানে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী বাছাইয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি প্রার্থী নির্বাচনের সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়েছিল। বৃহস্পতিবার শুধু দলের সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়েছে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীও একই কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, দলের স্থায়ী কমিটি আগেই তারেক রহমানকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষমতা দিয়েছিল। ফলে সচিবালয়ে নতুন করে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না।
জামায়াতের অভিযোগ
সচিবালয়ে বিএনপির নেতাদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সচিবালয় মূলত রাষ্ট্রীয় নির্বাহী কার্যক্রম পরিচালনার জায়গা। সেখানে রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক হওয়া নিয়ে তিনি আপত্তি জানান।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের কাছে এ বিষয়ে বক্তব্য দেন তিনি।
আযাদ প্রশ্ন তোলেন, রাষ্ট্রীয় কার্যালয়ে রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে সেটিকে গণতান্ত্রিক চর্চার দৃষ্টিতে কীভাবে দেখা হবে।
তবে বিএনপি নেতারা জামায়াতের এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের বক্তব্য, সচিবালয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি।
মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন জমা
বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা ২৪ মিনিটে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল নির্বাচন ভবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র জমা দেয়। স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেয়।
মনোনয়নপত্রে মির্জা ফখরুলের প্রার্থিতা প্রস্তাব করেন ড. আবদুল মঈন খান। তাঁর প্রার্থিতা সমর্থন করেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থিতা আনুষ্ঠানিক রূপ পায়।
নির্বাচনে একাধিক রাজনৈতিক শিবির
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ইতোমধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিএনপির পাশাপাশি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটও প্রার্থী দিয়েছে।
বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনে অংশগ্রহণকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য ইতিবাচক।
প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনিও নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিজেদের অবস্থান জনগণের সামনে তুলে ধরবে—এটাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
রাজনৈতিক বিতর্কের নতুন মাত্রা
সচিবালয়ে বিএনপির নেতাদের উপস্থিতি নিয়ে জামায়াতের প্রশ্ন এবং বিএনপির পাল্টা ব্যাখ্যার ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
বিএনপি বলছে, প্রার্থী বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত কোনো আকস্মিক বৈঠকের মাধ্যমে নেওয়া হয়নি। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে আগেই এই দায়িত্ব দেওয়ায় তাঁর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মির্জা ফখরুলকে প্রার্থী করা হয়েছে।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় কার্যালয়ে রাজনৈতিক দলের নেতাদের আলোচনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জামায়াত। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে প্রার্থীদের মনোনয়ন ও রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ঘিরে নির্বাচনকেন্দ্রিক তৎপরতা আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপির অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট হয়েছে। এখন নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার, বক্তব্য ও পারস্পরিক সমালোচনা আরও গুরুত্ব পাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















