“টানা তিন বছর ধরে ধীরগতির প্রবৃদ্ধি ও বাড়তে থাকা দারিদ্র্যের পাশাপাশি স্থায়ী মূল্যস্ফীতি, চাপে থাকা ব্যাংকিং খাত, দুর্বল রাজস্ব আহরণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত প্রতিকূলতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে”। ৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ রিপোর্টের প্রেস রিলিজের প্রথম প্যারার বাংলা অনুবাদ করলে সাধারণভাবে এমনই দাঁড়ায়।
এই টানা তিন বছরের ধীরগতির অর্থনীতিতে এবারও বিশ্বব্যাংক বলছে প্রবৃদ্ধি ৩.৯ হতে পারে। অর্থাৎ ৪ এর ঘরেও নয়। বাংলাদেশের মতো একটি জনঘনত্বপূর্ণ দেশে জিডিপি ৩.৯ কে যদি শুধু একটি সংখ্যা বলা হয় তাহলে সেটা ঠিক হবে না। জিডিপি ৩.৯ এ নেমে যাওয়ার অর্থ কর্মসংস্থান কমে যাওয়া, বিপুল সংখ্যক পরিবারের আয় কমে যাওয়া ও একটি বড় সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যে ঢুকে যাওয়া। এবং এখান থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে এ মুহূর্তে যে একটি বড় সংখ্যক মানুষ অনেক বিলাস সামগ্রী কমিয়ে দিয়ে জীবনযাত্রা ধরে রেখেছে তাদেরও পরিবারে খাদ্যসহ অনেক প্রয়োজনীয় বিষয়ে ধাক্কা লাগবে।

তাই এ মুহূর্তে সব থেকে বড় বিষয় হলো বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে যে পথে চলছে তা এই ধীরগতি থেকে বের হবার পথ কিনা? ধরে নেই যারা রাষ্ট্র চালাচ্ছেন তারা নিশ্চয়ই মনে করছেন- তারা এখান থেকে দেশের অর্থনীতিকে বের করে আনবেন। দেশের মানুষের বেঁচে থাকার স্বার্থে সকলেই এখন এই কামনা করছে, দেশের অর্থনীতিকে এখান থেকে বের করে আনতে সরকার সমর্থ হোক।
কিন্তু সরকার যে পথে অর্থনীতিকে পরিচালিত করছে এ পথে কি আসলেই অর্থনীতিকে সবল করা যাবে? এ ধরনের বাস্তবতায় সাধারণত অর্থনীতিকে দুই পথে পরিচালিত করতে দেখা যায়। একটা উপমাসহ বলা যায়, ধরা যাক একটি বড় কোম্পানি কোন একটা ভুল পথ নিয়ে বড় বিপর্যয়ে পড়েছে। তখন তার সামনে সাধারণত দুটো পথ থাকে। এক, ওই কোম্পানিকে যে সকল ব্যাংক ঋণ দিয়েছিলো তারা আরো ঋণ দিয়ে কোম্পানি চালু রেখে লাভের পথে নিয়ে যাবার সুষ্ঠু ব্যবস্থা করতে পারে। আবার এর বিপরীতে ওই কোম্পানির যতটুকু সম্পদ তখনও আছে সেগুলো বিক্রি করে ব্যাংক তাদের কিছু টাকা রক্ষা করতে পারে।
প্রথম পথটি অ্যাগ্রেসিভ পথ- দ্বিতীয় পথটি কনজারভেটিভ পথ। প্রথম পথে কর্মসংস্থান, পণ্য উৎপাদন, সরবরাহ, বাজারে ওই কোম্পানির অর্থের সঞ্চালন সবই চালু থাকে। দ্বিতীয় পথে তাৎক্ষণিক কিছু অর্থ রক্ষা হয় কিন্তু কর্মসংস্থান, উৎপাদন, সরবরাহ, বাজারে অর্থ সঞ্চালন সবই বন্ধ হয়ে যায়।

এখন কোন অর্থনীতিতে যদি কোন অংশে কর্মসংস্থান, উৎপাদন, উৎপাদন সংশ্লিষ্ট সরবরাহ ও এর সামগ্রিক অর্থ বাজারে সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যায় তাহলে তার প্রভাবে ওই নির্দিষ্ট অংশ দারিদ্রে ঢুকে যাওয়া ছাড়া পথ থাকে না।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০০৯ থেকে ২০২৩ অবধি যে আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ২০০৯ থেকে ২০১৬ অবধি যখন প্রতি মুহূর্তে দারিদ্র্য কমছিলো সে সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো এবং এর গতি ও ভর মিলে যে আকার এবং ওজন তৈরি করেছে- তাকে আর ছোট কোন পাত্রে ঢোকানো সম্ভব নয়। যেমন ২০০৮ এ যেখানে বাংলাদেশে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতো না সেখানে এখন ১৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন অতি স্বাভাবিক বিষয়। আর মোট সক্ষমতা না হয় বাদ দেয়া গেলো। এরসঙ্গে দেশ জোড়া, সড়ক, নৌ, রেল এবং আকাশ পথ।
তাই এই অবকাঠামো নিয়ে এখন যদি শুধুমাত্র সম্পদ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয় তাহলে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও উৎপাদন সংশ্লিষ্ট অর্থ সৃষ্টি হবার পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

পৃথিবীর বড় বড় মন্দায় এবং প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যে সকল দেশ আগ্রাসী পথ নিয়েছিলো তারাই কিন্তু সফল হয়েছিলো। রক্ষণশীলদের অর্থনীতির ইতিহাস সুখকর নয়। আর দরিদ্রকে কাজে সংশ্লিষ্ট না করে নগদ অর্থ দিয়ে যে দারিদ্র্য দূর করা যায় না তার উদাহরণ তৈমুর লং থেকে বর্তমানের ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। তৈমুর লং ১৭ বার ভারত লুট করে অর্থ নিয়ে নিজের ক্ষুদ্র দেশের মানুষের মধ্যে বিলি করেছিলেন, কিন্তু তাতে তার দেশের মানুষের ভাগ্য ফেরেনি। ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের সরকার শিল্পের ইনসেনটিভের অর্থখাত বন্ধ করে দিয়ে ওই অর্থ সুবিধাবঞ্চিতকে ভাতা হিসেবে দেয়। যার ফলে ১৯৬০-৬১ সালে কংগ্রেস শাসনামলেও ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে যে পশ্চিমবঙ্গ মাথাপিছু আয়ে দ্বিতীয় ছিলো। এখন মাথাপিছু আয়ে ১৬তম অবস্থানে। আর পশ্চিমবঙ্গের জিডিপি ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ৪.৮ শতাংশ অন্যদিকে অসমের জিডিপি ৭ শতাংশ।
পশ্চিমবঙ্গের পাশ্ববর্তী রাজ্য বিহারের জিডিপি ৬.৫ শতাংশ। তবে অসমের জিডিপি আগেই উল্লেখ করার ছোট একটা কারণ আছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের সব সময়ই একটা অভিযোগ বাংলাদেশ থেকে মানুষ ভারতে অনুপ্রবেশ করে। আর এই অভিযোগটি অসমে বার বার এক সময়ে উচ্চারিত হতো। আগে অনেক সময় মুখ বুঝে তাদের অভিযোগ সহ্য করেছি। ২০১০ এ অসমের প্রেসক্লাবে বাংলাদেশের সিনিয়র সাংবাদিক হিসেবে তাদের অনেক সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। বাংলাদেশ বিষয়ে তাদের যেমন পজিটিভ প্রশ্ন ছিলো তেমনি নেগেটিভ প্রশ্নও ছিলো। আর ওই নেগেটিভ প্রশ্নের একটি ছিলো বাংলাদেশ থেকে কেন অসমে অনুপ্রবেশ ঘটছে। সেদিন হেসে উত্তর দিয়েছিলাম, মানুষ মাইগ্রেশন করে সাধারণত দুই কারণে, নিরাপত্তার অভাবে ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে। বাংলাদেশে এ মুহূর্তে কোন মানুষের নিরাপত্তার অভাব আছে তা কেউ বলবে না। অন্যদিকে বাংলাদেশের জিডিপি ৬.৫ আর অসমের জিডিপি ৩ পয়েন্ট সামথিং- তাহলে বাংলাদেশ থেকে কেন মানুষ আসবে এখানে। তাছাড়া অসমের সীমান্তে বাংলাদেশের জেলা সিলেট। বাংলাদেশে অঞ্চলভিত্তিক জিডিপি হিসেব করলে সিলেটে আরো বেশি হবে। তাই বাংলাদেশ থেকে কেন অসমে অনুপ্রবেশ করবে?
অসম ২০১০ থেকে ২০২৫ এর ভেতর তাদের সেদিনের ৪ এর নীচের জিডিপি আজ ৭ এ নিয়ে এসেছে। এই জিডিপি অসম কিন্তু শুধু সুবিধাবঞ্চিতদের ভাতা দিয়ে বাড়ায়নি। সুবিধাবঞ্চিতদের ভাতা দিয়েছে ঠিকই তবে অবকাঠামো, শিল্প ও সুবিধাবঞ্চিতদের ভাতা দেয়াকে সমন্বয় করেছে। আর এটা করতে তারা আগ্রাসী ভূমিকা নিয়েছে। যেমন ২০০৯ থেকে বাংলাদেশ নিয়েছিলো।
“মেগা প্রজেক্ট, মেগা দুর্নীতি” বিরোধী দলে থেকে রাজপথে বা সংসদে স্লোগান হিসেবে ভালো। তবে সরকারে গেলে জনঘনত্বপূর্ণ, কৃষিনির্ভর দরিদ্র দেশের কোটি কোটি মুখে খাবার দিতে গেলে কর্মসংস্থান তৈরি করে, জিডিপিতে গতি ফেরানো ছাড়া কোন পথ নেই। আর সে কাজে মেগা প্রজেক্ট বন্ধ করার সুযোগ নেই। কারণ দেশের অবকাঠামোই তৈরি হয়েছে মেগা অর্থনীতির জন্যে। মনে রাখা দরকার ঋণ করে ঘি খেয়ে কিন্তু কেউ মারা যায় না, বরং ঋণ করে ঘি খেয়ে বুদ্ধিমান হয়ে সে ভালো থাকে। ঋণ না করে- না খেয়েই মানুষ মারা যায়।
বাংলাদেশে গত পনের বছরে যে অবকাঠামো হয়েছে, শিল্প ও তার যে বাজার হয়েছিলো- তিন বছরে তা থেমে গেছে। কিন্তু একে আরো পিছিয়ে দিলে বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট যে নেগেটিভ ইঙ্গিত দিচ্ছে সেদিকেই চলে যাবার সম্ভাবনা বেশি।
তাছাড়া বাংলাদেশের এই অবকাঠামো যতটা না সরকারি খাতের জন্যে তার থেকে বেশি বেসরকারি খাতের জন্যে। তাই ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের মতো বেসরকারি খাতের ঋণের সুযোগ যদি সরকার নিয়ে নেয় ভোটের রাজনীতিতে- তাহলে অর্থনীতি আরো খারাপের দিকে যাবে। বেসরকারি খাত সুযোগ না পেলে ৩.৯ জিডিপি থেকে দেশকে বের করা কঠিন হবে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে যে তেলের দামের বৃদ্ধি হয়েছে এটাই এখন বাস্তবতা। এই বাস্তবতার অর্থ এই নয় যে এখন শিল্প গুটিয়ে ফেলে শুধুমাত্র কৃচ্ছ্রতা দিয়ে বাঁচতে হবে।

পৃথিবীর প্রতিটি সংকটের মধ্যেই নতুন নতুন পথ তৈরি হয়। রাষ্ট্রীয় সংঘাত, অর্থনৈতিক সংকট- এগুলো সবই পৃথিবীর চিরন্তন বিষয়। এই সংকটের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিকসহ অনেক উত্থান-পতন দেখা যায় পৃথিবীতে।
রাষ্ট্র এবং সংকট অনেকটা যমজ বিষয়। তেমনি রাষ্ট্রপরিচালক ও সংকট- মোকাবিলাকারীও( ক্রাইসিস ম্যানেজার) যমজ বিষয়। এ দুই সবখানে মেলে না বলেই কোন কোন রাষ্ট্র অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে সমর্থ হয় কোন কোন রাষ্ট্র অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে পারে না। তেমনি কোন কোন রাষ্ট্রপরিচালক সংকট মোকাবিলাকারী হিসেবে উজ্জ্বলতা পায়- কারো কারো রাষ্ট্র পরিচালনায় উজ্জ্বলতা থাকে না।
বাংলাদেশের জিডিপি টানা তিন বছরে কমে গেছে চিহ্নিত কারণে। কিন্তু বাংলাদেশে যে অবকাঠামো তৈরি হয়েছে এই তিন বছরের আগের দেড় দশকে – এই অবকাঠামোর একটি দেশ ৩.৯ জিডিপি নিয়ে কোন মতেই ধুঁকতে পারে না।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.
স্বদেশ রায় 


















