০৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
খুশি নারীদের কেন টার্গেট করা হয়? অনলাইন বিষাক্ততার বিরুদ্ধে সরব হানিয়া আমির পালারি ফিল্মসের এক দশক: সোনালি ধারায় এগিয়ে চলা নারীর গল্পকে কেন পিছনে রাখা হচ্ছে: পাকিস্তানের বিনোদন জগতের অদৃশ্য বৈষম্যের গল্প ৫ টাকার সেলাই থেকে মাসে লাখ টাকা আয়, গ্রামের ছেলেটির অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প বালি ১৯৫২: লিউ কাংয়ের চোখে এক যাত্রার গল্প পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের মাঝে নারী সংরক্ষণ বিল নিয়ে উত্তাপ, সীমা পুনর্বিন্যাসে বাড়ছে বিতর্ক পয়লা বৈশাখে ‘মাতৃ শক্তি ভরসা কার্ড’ ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ, নির্বাচন বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে সরব তৃণমূল বঙ্গের মাটি থেকে অনুপ্রবেশকারীদের সরানোর হুঁশিয়ারি, নির্বাচনী মঞ্চে শাহর কড়া বার্তা তেলের দাম ব্যারেলে ১০০ ডলারের কাছাকাছি, আইইএ বলছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি ধাক্কা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ঐতিহাসিক রাত: ১০ জনের বার্সেলোনাকে ২-০ হারাল অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ

রাজনীতির বাইরে আওয়ামী লীগের আর কী শক্তি আছে

  • স্বদেশ রায়
  • ০৯:১৪:০৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
  • 315

আওয়ামী লীগের রাজনীতি এখন সংসদে আইন পাস করার মাধ্যমে নিষিদ্ধ হয়েছে। এ অবস্থায় বৈধভাবে, আইনত এবং প্রচলিত ধারায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শক্তির প্রকাশ ঘটানোর কোনো অধিকারও নেই।

কিন্তু আওয়ামী লীগ নামক যে দলটি নিষিদ্ধ হয়েছে, এই রাজনৈতিক দল সম্পর্কে দেশের বর্ষীয়ান অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী রেহমান সোবহান বলেছেন, “আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল নয়, আওয়ামী লীগই বাংলাদেশকে সৃষ্টি করেছে”। এ কারণেই প্রশ্ন আসে, এ দলটির ক্ষমতা বা শক্তি শুধু কি রাজনীতির ভেতর নিহিত? পৃথিবীতে যে দল বা প্ল্যাটফর্মটি দেশ সৃষ্টি করে, ওই দল রাজনীতিতে যতই কোণঠাসা হয়ে পড়ুক না কেন, প্রচলিত রাজনীতির বাইরে তার ভিন্ন অনেক কিছু সম্পদ ও শক্তি থাকে। আওয়ামী লীগের সে শক্তিগুলো কী কী হতে পারে?

জন্মের চরিত্রের মধ্যে শক্তি

আওয়ামী লীগের জন্ম পাকিস্তান সৃষ্টিকারী মুসলিম লীগের প্রগতিশীল তরুণ অংশ ও কৃষক, প্রজার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে। মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান দুই ছিল প্রগতিশীলতা ও সব মানুষের প্রতিনিধিত্বের বিপরীতে। যে কোনো ভূখণ্ডের মতো এ ভূখণ্ডেও (তৎকালীন পূর্ববাংলা, বর্তমানে বাংলাদেশ) প্রগতিশীল একটি আকাঙ্ক্ষা ছিল। ভূমিজাত এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই আওয়ামী লীগের জন্ম। এ কারণে আওয়ামী লীগের জন্মের মধ্যেই সহজাতভাবে এই শক্তিগুলো রয়ে গেছে, দলটি ভূখণ্ডের প্রগতিশীল আকাঙ্ক্ষার ধারক, ও বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীসহ সাধারণ সব সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী।

“হিন্দুরা ভোট দিয়েছে” এই ন্যারেটিভ লাগে না

এজন্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই বাংলাদেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর যারা আছেন, রাজনৈতিকভাবে তাদের বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগ। এ প্রতিষ্ঠানেই সবাই নিজেকে মানুষ হিসেবে সম্মানিত বোধ করে। তাই আওয়ামী লীগকে অনেক তকমা দিলেও মৌলবাদী তকমা দেওয়া যায় না। বরং আওয়ামী লীগের বিপরীতে আওয়ামী লীগের সহযাত্রী দলগুলো ছাড়া অন্যরা যে মৌলবাদী দল নয়, তা প্রমাণ করতে হলে দেশি ও বিদেশি এম্বেডেড সাংবাদিক ও মিডিয়ার মাধ্যমে নগ্ন চেষ্টা করতে হয়। এটা করতে হয় যে নির্বাচনে “হিন্দুরা ওই দলকে ভোট দিয়েছে”। কারণ, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রমাণ না করা যায় হিন্দুরা ভোট দিয়েছে, ততক্ষণ আওয়ামী লীগের বিপরীতের ওই দল মুসলিম মৌলবাদী হিসেবে বা সর্বোচ্চ মডারেট মুসলিমের দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকে। এ কারণে এ ধরনের কূট কৌশলের চেষ্টার পরেও বাংলাদেশের সহজাত প্রগতিশীল ও ভূখণ্ডভিত্তিক জাগতিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত থাকে আওয়ামী লীগ।

 

প্রকৃত বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন

বাঙালি জাতির বয়স দীর্ঘ। কমপক্ষে দুই হাজার বছরের একটি সভ্যতার ইতিহাস এর প্রতিটি পরতে পরতে পাওয়া যায়। কিন্তু ভূখণ্ডভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী হয়ে ওঠার কোনো চেষ্টা বা আন্দোলন প্রাচীন ইতিহাসে নেই। শুধু মধ্যযুগের কিছু সাহিত্যে এবং ১৯০৫ সাল থেকে বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন শুরু হলে তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে ও কবিতায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটি সূচনা করেন। পরবর্তীতে এর জোরালো উচ্চারণ উঠে নজরুলের কণ্ঠে,
“নমঃ নমঃ নমো বাংলাদেশ মম”

তবে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও পরবর্তীতে হিন্দু ও মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের ভাগ-বাটোয়ারার মধ্যে এই বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চাপা পড়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ মারা যান, নজরুলও অজানা রোগে বাকরুদ্ধ হয়ে যান।

তাই সত্য অর্থে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয় এই পূর্ববঙ্গে ১৯৫০ দশক থেকে। অন্য যে কোনো জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা ইতিপূর্বে যেমন হয়েছে শিল্প, সাহিত্যের ভেতর দিয়ে। বাংলাদেশের ৫০-এর দশকের কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, গীতিকার, চারু-কারুকলা শিল্পী সকলেরই কাজ কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদভিত্তিক একটি আলাদা সত্ত্বাকে ঘিরে। এ কারণে বাংলাদেশের প্রগতিশীল শিল্প সংস্কৃতির মূল ভিত্তি রয়ে গেছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। এর বাইরে যা আছে তা প্রতিক্রিয়াশীলতা।

৫০-এর দশকের শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি

বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদভিত্তিক শিল্প সাহিত্যের ভিত্তিমূল তৈরি করেন ৫০-এর দশকের লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতি কর্মীরা। তাঁরা আবহমান বাংলার সহজিয়া চেতনার দর্শন, রবীন্দ্র-নজরুলকে ধারণ করে সর্বোপরি তাঁদের অতুলনীয় মেধা ও মনন দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী ধারার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি গড়ার কাজ শুরু করেন। এই কাজ শুধু নান্দনিক শিল্প সাহিত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এমনকি বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একটি সংগ্রাম হিসেবে শুধু চিহ্নিত নয় ইতিহাসে, এ সংগ্রামকে তারা একটি বহতা নদীর রূপ দিতে সমর্থ হন—যা চিরকাল বয়ে চলবে এ ভূখণ্ডে।

৫০-এর দশকের এই শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ওই সময়ে রাজনৈতিকভাবে ধারণ করে আওয়ামী লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ। পূর্ববঙ্গের কমিউনিস্ট পার্টি ৫০-এর দশক থেকে যত না কমিউনিস্ট আন্দোলন করে, তার থেকে বেশি তারা জাতীয়তাবাদী আন্দোলন করতে বাধ্য হয়—রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায়। কমিউনিস্ট পার্টির বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক অংশ ষাটের দশক থেকে ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। এবং ৮০’র দশকে এসে সম্পূর্ণরূপে আওয়ামী লীগে বিলীন হয়।

এ কারণে বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদী ভিত্তিক শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সব থেকে বেশি ধারণ করতে পারে আওয়ামী লীগ। এবং এ সম্পদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বা প্রবাহমান ধারা আওয়ামী লীগ।

ষাট ও সত্তর দশকের শিল্প সাহিত্য ও মুক্তিযুদ্ধ নামক মহাকাব্য

৫০-এর দশকে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে শক্ত ভিত তৈরি হয়—তা ষাট ও সত্তর দশকের কবি সাহিত্যিক শিল্পীদের মাধ্যমে শুধু বেগবান হয় না, নির্দিষ্ট ভূখণ্ডভিত্তিক বাঙালির জাগতিক রাষ্ট্র তৈরির অন্যতম কারিগরও হয়। যার ফলে ৫০-এর দশক থেকে সত্তর দশকের কবি সাহিত্যিক শিল্পীরা মূলত রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগের পরিপূরক হিসেবে বা মিলিতভাবে সৃষ্টি করে মুক্তিযুদ্ধ নামক মহাকাব্য ও বাংলাদেশ নামক একটি জাগতিক রাষ্ট্র।

যে কোনো জাতি যখনই কোনো মহাকাব্যের উত্তরাধিকার হয়, তখন তার জাতিসত্তা ও চেতনার সত্তা অর্থাৎ তার জাতীয়-সংস্কৃতির যাবতীয় অঙ্গ বিকশিত হয় ওই মহাকাব্যকে ঘিরে।

যে কারণে বাংলাদেশের পপুলিস্ট লেখকদেরও লেখার জন্যও মুক্তিযুদ্ধ নামক মহাকাব্যের যে কোনো উপাদানের ওপর ভিত্তি করতে হয়। তাই সে পপুলিস্ট হলেও তার কাজও বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির শক্তি হিসেবেই কাজ করে।

কবিতা, দেশাত্মবোধক গান, নাটক ও স্লোগান

কবিতা, দেশাত্মবোধক গান, নাটক শিল্প সাহিত্যের ভেতরই পড়ে। তবে তারপরেও বলতে হয়, রবীন্দ্র নজরুলের পরে বাঙালি জাতীয়তাবাদভিত্তিক যে বিপুল দেশাত্মবোধক গানের ভান্ডার তৈরি হয়েছে বাংলা গানে তা এই পূর্ববাংলায় বা বাংলাদেশে। এই গানের শক্তি বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তি ও তার রাজনৈতিক ধারা আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কেউ ধারণ করতে পারে না। তাই আওয়ামী লীগ না থাকলে এই সাংস্কৃতিক শক্তি বা সঙ্গীতকে চেপে রাখার চেষ্টা হয়। কিন্তু গানের শক্তি সহজাত, একজন বাউল যখন শুধু গান গাওয়ার জন্য নির্মম মৃত্যুকে মেনে নেয় (যা গত দুই বছর ধরে দেখা যাচ্ছে) তখন বোঝা যায় দেশাত্মবোধক ও জাগতিক শক্তির এই গানের ক্ষমতা কত অসীম।

দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের ভেতর দিয়ে ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার পরে বাঙালি জাতীয়তাবাদী নাট্যকারদের হাতে অতুলনীয় অনেক নাটক সৃষ্টি হয়েছে। তাকেও নানাভাবে নিষিদ্ধ রাখতে হয়, বা চেপে রাখতে হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদ বা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ রাখতে হলে। আর নাটকের শক্তি কত বড় তা বোঝা যায়। ব্রিটিশ তার সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য যে নাটক বন্ধ রাখার আইন তৈরি করেছিল তা এখনও বাংলাদেশে বহাল রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে ৫০-এর দশকের পর থেকে জাগতিক রাষ্ট্র সৃষ্টির সংগ্রাম ও তার উত্থান-পতন এসব ঘিরে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলো এই ভূখণ্ডের কবিরাই লিখেছেন। এবং বাঙালি জাতি রাষ্ট্রের স্রষ্টা পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রাম ও তাঁর ট্রাজিক মৃত্যু ঘিরে এদেশের কবিরা লিখেছেন, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম কবিতাগুলোর কিছু কবিতা। এমনিতে ভাষার শক্তিই অসীম, তারপরে যদি তা কবিতায় রূপ নেয়—তাহলে তা চিরকালের শক্তি।

রবীন্দ্র-নজরুল পরবর্তী অন্যতম সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক লিখেছিলেন, এই বাংলার বাঙালিরা রাজপথে দাঁড়িয়ে স্লোগানে হিসেবে পৃথিবীর শক্তিশালী কবিতা লিখতে পারে। বাঙালির অন্তত তিনটি স্লোগান উল্লেখ করলে এর সত্যতা বোঝা যায়,
“তোমার আমার ঠিকানা
পদ্মা মেঘনা যমুনা”
“তুমি কে? আমি কে?
বাঙালি, বাঙালি”
“জয় বাংলা”

তিনটি স্লোগানের প্রথমটি ভূগোল ও জাতীয় চরিত্র নির্ধারণ করে, দ্বিতীয়টি জাতীয়তা নির্ধারণ করে আর তৃতীয়টির ব্যাখ্যার কোনো ভাষা আজও পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়নি। শুধু বলা যায়, অনাগত কোনো ঐতিহাসিক এ ভূখণ্ডের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে বিস্মিত হবেন, মাত্র দুটি শব্দ যার ভেতর এমন শক্তি আছে যা উচ্চারণ করে এ এদেশের ইতিহাসে শিশু থেকে বৃদ্ধ বারবার মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে।

জাতির বীর চরিত্র

যে জাতির বীর নেই, সে জাতি আসলে জাতি নয়। তাই কোনো কোনো জাতি নিজেকে গড়তে তারা কল্পনার মহাকাব্য থেকেও বীর নিয়ে আসে। ইতিহাসের নানান সমালোচনার পরেও নেপোলিয়ান গ্রেট, আলেকজান্ডার দি গ্রেট। বাঙালির ইতিহাসে যতই উত্থান-পতন ঘটুক না কেন, বাঙালির প্রতিটি সৎ সন্তান ইতিহাসের আগামী হাজার বছরেও বীরত্ব খুঁজবে শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে। এবং তাকে ধারণ করেই বাঙালি ঘরের সন্তানরা বীর হয়ে উঠবে। সাহসী হয়ে উঠবে। আর ধ্রুব সত্য, বীরত্ব ছাড়া জীবনের কোনো পদক্ষেপই সফল হয় না। ষড়যন্ত্র কখনই বীরত্বের বিকল্প নয়।

শেখ মুজিব ও বাংলাদেশ যেমন যমজ শব্দ, শেখ মুজিব ও বাঙালিও তেমনি সমার্থক শব্দ। তেমনি এই বাংলায় বীরত্ব ও শেখ মুজিবুর রহমানও সমার্থক শব্দ। তাই এই বাংলায় বীরেরা সব সময়ই মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে তাঁর চরিত্রকে ধারণ করে।

শেখ মুজিবের ভাস্কর্য যারা ভেঙে ফেলে, যারা ওই ভাস্কর্যের মাথায় প্রস্রাব করে—তারা জানে না, মধ্যযুগে যারা বাংলা ভাষাকে দূরে ঠেলে ফেলার চেষ্টা করেছিল- সে সময় কবি আবদুল হাকিম তাদেরকে চিহ্নিত করেছিলেন এভাবেই
“যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি”

তাই বঙ্গবন্ধুকে এই ভূখণ্ডে যারা যখনই অপমান করুক না কেন, আবদুল হাকিমের অনুকরণেই কোনো কবি তাদের উদ্দেশে হয়তো এমন বলবে

যেসব বাংলাদেশে জন্মে—
স্বীকার করে না শেখ মুজিবের কীর্তি।
সেসব কাহার জন্ম নির্ণয়ে কেন বৃথা চেষ্টা,
বৃথা ঘৃণা করো তুমি তাদের প্রতি—
ঘৃণার পাত্রের থেকেও নিচু তারা অতি।

বাস্তবে বাংলা ভাষার মতো বাঙালির রাষ্ট্রে ও জাতীয় জীবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চিরকালীন শক্তি। আর বীরকে বা বীরের স্মৃতিকে আঘাত করলে, অপমান করলে বীরের অনুসারীর সংখ্যা বাড়ে, শক্তি বাড়ে সাধারণ সময়ের থেকে। তার ওপরে রয়েছে বঙ্গবন্ধু ও তার দেশ সৃষ্টির সহযাত্রীদের পবিত্র রক্তধারা। আর এ ধরনের রক্তধারার ক্ষমতা তো বর্তমানের ইরানকে দেখে পৃথিবী বুঝতে পারছে।

হাসান হোসেনের রক্তধারা

ইরান আক্রমণের পূর্বে আক্রমণকারীরা তাদের অস্ত্রের বাইরে ইরানের জিওগ্রাফির পাওয়ারও নিশ্চয়ই হিসেব করেছিল। কিন্তু তারা একটি হিসাব করেনি, ইরানের সব থেকে বড় জনগোষ্ঠী শিয়া সম্প্রদায়ের ঐক্যের মূল ভিত্তি নবীজির রক্তধারা বহনকারী হাসান-হোসেনের রক্ত। ১৪শ বছর আগে ফোরাত নদীর কূলে সীমারের নির্মম ছুরিতে শিশু পুত্র কন্যাসহ বীর হাসান-হোসেনের যে রক্ত ঝরেছিল, রক্ত ঝরেছিল হাসান হোসেনের আরও অনুসারীদের—ওই রক্তই ১৪’শ বছর ধরে শিয়া সম্প্রদায়কে আলাদা ঐক্যের শক্তি দিয়েছে। প্রতি মহরমের ১০ তারিখে তাদের ঐক্য দ্বিগুণ হয়। তাই বর্তমানে একের পর এক নেতা নিহত হবার পরেও তাদের ঐক্যে ফাটল ধরানো সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে বাংলাদেশ স্রষ্টা শেখ মুজিবের পরিবার-পরিজন ও তাঁর সহযাত্রী বীরদের রক্ত যারা ঝরিয়েছিল—তাদের অস্ত্রও কিন্তু সীমারের ছুরির মতোই। সীমারের ছুরি যেমন নবীজির রক্তধারার বিপরীতে, এখানে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীরাও তেমনি বাঙালি জাতির জীবনে বাংলাদেশের বিপরীতে। তাই বাঙালি জাতীয়তাবাদীর শক্তির ঐক্য শিয়াদের মতোই।

১৪’শ বছর পরেও দেখা যাবে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর হত্যার দিনে, তাঁর সহযাত্রী বীরদের জেলখানায় হত্যার দিনে—এমনকি তাঁর ঐতিহাসিক বাড়ি ভাঙার দিনে—বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তির, শেখ মুজিবের অনুসারীদের ঐক্য দ্বিগুণ হবে। এটাই বীরের রক্তধারার রীতি যে কোনো জাতির জীবনে।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.

 

জনপ্রিয় সংবাদ

খুশি নারীদের কেন টার্গেট করা হয়? অনলাইন বিষাক্ততার বিরুদ্ধে সরব হানিয়া আমির

রাজনীতির বাইরে আওয়ামী লীগের আর কী শক্তি আছে

০৯:১৪:০৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

আওয়ামী লীগের রাজনীতি এখন সংসদে আইন পাস করার মাধ্যমে নিষিদ্ধ হয়েছে। এ অবস্থায় বৈধভাবে, আইনত এবং প্রচলিত ধারায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শক্তির প্রকাশ ঘটানোর কোনো অধিকারও নেই।

কিন্তু আওয়ামী লীগ নামক যে দলটি নিষিদ্ধ হয়েছে, এই রাজনৈতিক দল সম্পর্কে দেশের বর্ষীয়ান অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী রেহমান সোবহান বলেছেন, “আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল নয়, আওয়ামী লীগই বাংলাদেশকে সৃষ্টি করেছে”। এ কারণেই প্রশ্ন আসে, এ দলটির ক্ষমতা বা শক্তি শুধু কি রাজনীতির ভেতর নিহিত? পৃথিবীতে যে দল বা প্ল্যাটফর্মটি দেশ সৃষ্টি করে, ওই দল রাজনীতিতে যতই কোণঠাসা হয়ে পড়ুক না কেন, প্রচলিত রাজনীতির বাইরে তার ভিন্ন অনেক কিছু সম্পদ ও শক্তি থাকে। আওয়ামী লীগের সে শক্তিগুলো কী কী হতে পারে?

জন্মের চরিত্রের মধ্যে শক্তি

আওয়ামী লীগের জন্ম পাকিস্তান সৃষ্টিকারী মুসলিম লীগের প্রগতিশীল তরুণ অংশ ও কৃষক, প্রজার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে। মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান দুই ছিল প্রগতিশীলতা ও সব মানুষের প্রতিনিধিত্বের বিপরীতে। যে কোনো ভূখণ্ডের মতো এ ভূখণ্ডেও (তৎকালীন পূর্ববাংলা, বর্তমানে বাংলাদেশ) প্রগতিশীল একটি আকাঙ্ক্ষা ছিল। ভূমিজাত এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই আওয়ামী লীগের জন্ম। এ কারণে আওয়ামী লীগের জন্মের মধ্যেই সহজাতভাবে এই শক্তিগুলো রয়ে গেছে, দলটি ভূখণ্ডের প্রগতিশীল আকাঙ্ক্ষার ধারক, ও বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীসহ সাধারণ সব সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী।

“হিন্দুরা ভোট দিয়েছে” এই ন্যারেটিভ লাগে না

এজন্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই বাংলাদেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর যারা আছেন, রাজনৈতিকভাবে তাদের বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগ। এ প্রতিষ্ঠানেই সবাই নিজেকে মানুষ হিসেবে সম্মানিত বোধ করে। তাই আওয়ামী লীগকে অনেক তকমা দিলেও মৌলবাদী তকমা দেওয়া যায় না। বরং আওয়ামী লীগের বিপরীতে আওয়ামী লীগের সহযাত্রী দলগুলো ছাড়া অন্যরা যে মৌলবাদী দল নয়, তা প্রমাণ করতে হলে দেশি ও বিদেশি এম্বেডেড সাংবাদিক ও মিডিয়ার মাধ্যমে নগ্ন চেষ্টা করতে হয়। এটা করতে হয় যে নির্বাচনে “হিন্দুরা ওই দলকে ভোট দিয়েছে”। কারণ, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রমাণ না করা যায় হিন্দুরা ভোট দিয়েছে, ততক্ষণ আওয়ামী লীগের বিপরীতের ওই দল মুসলিম মৌলবাদী হিসেবে বা সর্বোচ্চ মডারেট মুসলিমের দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকে। এ কারণে এ ধরনের কূট কৌশলের চেষ্টার পরেও বাংলাদেশের সহজাত প্রগতিশীল ও ভূখণ্ডভিত্তিক জাগতিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত থাকে আওয়ামী লীগ।

 

প্রকৃত বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন

বাঙালি জাতির বয়স দীর্ঘ। কমপক্ষে দুই হাজার বছরের একটি সভ্যতার ইতিহাস এর প্রতিটি পরতে পরতে পাওয়া যায়। কিন্তু ভূখণ্ডভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী হয়ে ওঠার কোনো চেষ্টা বা আন্দোলন প্রাচীন ইতিহাসে নেই। শুধু মধ্যযুগের কিছু সাহিত্যে এবং ১৯০৫ সাল থেকে বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন শুরু হলে তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে ও কবিতায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটি সূচনা করেন। পরবর্তীতে এর জোরালো উচ্চারণ উঠে নজরুলের কণ্ঠে,
“নমঃ নমঃ নমো বাংলাদেশ মম”

তবে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও পরবর্তীতে হিন্দু ও মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের ভাগ-বাটোয়ারার মধ্যে এই বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চাপা পড়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ মারা যান, নজরুলও অজানা রোগে বাকরুদ্ধ হয়ে যান।

তাই সত্য অর্থে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয় এই পূর্ববঙ্গে ১৯৫০ দশক থেকে। অন্য যে কোনো জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা ইতিপূর্বে যেমন হয়েছে শিল্প, সাহিত্যের ভেতর দিয়ে। বাংলাদেশের ৫০-এর দশকের কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, গীতিকার, চারু-কারুকলা শিল্পী সকলেরই কাজ কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদভিত্তিক একটি আলাদা সত্ত্বাকে ঘিরে। এ কারণে বাংলাদেশের প্রগতিশীল শিল্প সংস্কৃতির মূল ভিত্তি রয়ে গেছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। এর বাইরে যা আছে তা প্রতিক্রিয়াশীলতা।

৫০-এর দশকের শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি

বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদভিত্তিক শিল্প সাহিত্যের ভিত্তিমূল তৈরি করেন ৫০-এর দশকের লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতি কর্মীরা। তাঁরা আবহমান বাংলার সহজিয়া চেতনার দর্শন, রবীন্দ্র-নজরুলকে ধারণ করে সর্বোপরি তাঁদের অতুলনীয় মেধা ও মনন দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী ধারার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি গড়ার কাজ শুরু করেন। এই কাজ শুধু নান্দনিক শিল্প সাহিত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এমনকি বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একটি সংগ্রাম হিসেবে শুধু চিহ্নিত নয় ইতিহাসে, এ সংগ্রামকে তারা একটি বহতা নদীর রূপ দিতে সমর্থ হন—যা চিরকাল বয়ে চলবে এ ভূখণ্ডে।

৫০-এর দশকের এই শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ওই সময়ে রাজনৈতিকভাবে ধারণ করে আওয়ামী লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ। পূর্ববঙ্গের কমিউনিস্ট পার্টি ৫০-এর দশক থেকে যত না কমিউনিস্ট আন্দোলন করে, তার থেকে বেশি তারা জাতীয়তাবাদী আন্দোলন করতে বাধ্য হয়—রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায়। কমিউনিস্ট পার্টির বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক অংশ ষাটের দশক থেকে ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। এবং ৮০’র দশকে এসে সম্পূর্ণরূপে আওয়ামী লীগে বিলীন হয়।

এ কারণে বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদী ভিত্তিক শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সব থেকে বেশি ধারণ করতে পারে আওয়ামী লীগ। এবং এ সম্পদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বা প্রবাহমান ধারা আওয়ামী লীগ।

ষাট ও সত্তর দশকের শিল্প সাহিত্য ও মুক্তিযুদ্ধ নামক মহাকাব্য

৫০-এর দশকে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে শক্ত ভিত তৈরি হয়—তা ষাট ও সত্তর দশকের কবি সাহিত্যিক শিল্পীদের মাধ্যমে শুধু বেগবান হয় না, নির্দিষ্ট ভূখণ্ডভিত্তিক বাঙালির জাগতিক রাষ্ট্র তৈরির অন্যতম কারিগরও হয়। যার ফলে ৫০-এর দশক থেকে সত্তর দশকের কবি সাহিত্যিক শিল্পীরা মূলত রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগের পরিপূরক হিসেবে বা মিলিতভাবে সৃষ্টি করে মুক্তিযুদ্ধ নামক মহাকাব্য ও বাংলাদেশ নামক একটি জাগতিক রাষ্ট্র।

যে কোনো জাতি যখনই কোনো মহাকাব্যের উত্তরাধিকার হয়, তখন তার জাতিসত্তা ও চেতনার সত্তা অর্থাৎ তার জাতীয়-সংস্কৃতির যাবতীয় অঙ্গ বিকশিত হয় ওই মহাকাব্যকে ঘিরে।

যে কারণে বাংলাদেশের পপুলিস্ট লেখকদেরও লেখার জন্যও মুক্তিযুদ্ধ নামক মহাকাব্যের যে কোনো উপাদানের ওপর ভিত্তি করতে হয়। তাই সে পপুলিস্ট হলেও তার কাজও বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির শক্তি হিসেবেই কাজ করে।

কবিতা, দেশাত্মবোধক গান, নাটক ও স্লোগান

কবিতা, দেশাত্মবোধক গান, নাটক শিল্প সাহিত্যের ভেতরই পড়ে। তবে তারপরেও বলতে হয়, রবীন্দ্র নজরুলের পরে বাঙালি জাতীয়তাবাদভিত্তিক যে বিপুল দেশাত্মবোধক গানের ভান্ডার তৈরি হয়েছে বাংলা গানে তা এই পূর্ববাংলায় বা বাংলাদেশে। এই গানের শক্তি বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তি ও তার রাজনৈতিক ধারা আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কেউ ধারণ করতে পারে না। তাই আওয়ামী লীগ না থাকলে এই সাংস্কৃতিক শক্তি বা সঙ্গীতকে চেপে রাখার চেষ্টা হয়। কিন্তু গানের শক্তি সহজাত, একজন বাউল যখন শুধু গান গাওয়ার জন্য নির্মম মৃত্যুকে মেনে নেয় (যা গত দুই বছর ধরে দেখা যাচ্ছে) তখন বোঝা যায় দেশাত্মবোধক ও জাগতিক শক্তির এই গানের ক্ষমতা কত অসীম।

দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের ভেতর দিয়ে ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার পরে বাঙালি জাতীয়তাবাদী নাট্যকারদের হাতে অতুলনীয় অনেক নাটক সৃষ্টি হয়েছে। তাকেও নানাভাবে নিষিদ্ধ রাখতে হয়, বা চেপে রাখতে হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদ বা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ রাখতে হলে। আর নাটকের শক্তি কত বড় তা বোঝা যায়। ব্রিটিশ তার সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য যে নাটক বন্ধ রাখার আইন তৈরি করেছিল তা এখনও বাংলাদেশে বহাল রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে ৫০-এর দশকের পর থেকে জাগতিক রাষ্ট্র সৃষ্টির সংগ্রাম ও তার উত্থান-পতন এসব ঘিরে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলো এই ভূখণ্ডের কবিরাই লিখেছেন। এবং বাঙালি জাতি রাষ্ট্রের স্রষ্টা পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রাম ও তাঁর ট্রাজিক মৃত্যু ঘিরে এদেশের কবিরা লিখেছেন, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম কবিতাগুলোর কিছু কবিতা। এমনিতে ভাষার শক্তিই অসীম, তারপরে যদি তা কবিতায় রূপ নেয়—তাহলে তা চিরকালের শক্তি।

রবীন্দ্র-নজরুল পরবর্তী অন্যতম সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক লিখেছিলেন, এই বাংলার বাঙালিরা রাজপথে দাঁড়িয়ে স্লোগানে হিসেবে পৃথিবীর শক্তিশালী কবিতা লিখতে পারে। বাঙালির অন্তত তিনটি স্লোগান উল্লেখ করলে এর সত্যতা বোঝা যায়,
“তোমার আমার ঠিকানা
পদ্মা মেঘনা যমুনা”
“তুমি কে? আমি কে?
বাঙালি, বাঙালি”
“জয় বাংলা”

তিনটি স্লোগানের প্রথমটি ভূগোল ও জাতীয় চরিত্র নির্ধারণ করে, দ্বিতীয়টি জাতীয়তা নির্ধারণ করে আর তৃতীয়টির ব্যাখ্যার কোনো ভাষা আজও পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়নি। শুধু বলা যায়, অনাগত কোনো ঐতিহাসিক এ ভূখণ্ডের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে বিস্মিত হবেন, মাত্র দুটি শব্দ যার ভেতর এমন শক্তি আছে যা উচ্চারণ করে এ এদেশের ইতিহাসে শিশু থেকে বৃদ্ধ বারবার মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে।

জাতির বীর চরিত্র

যে জাতির বীর নেই, সে জাতি আসলে জাতি নয়। তাই কোনো কোনো জাতি নিজেকে গড়তে তারা কল্পনার মহাকাব্য থেকেও বীর নিয়ে আসে। ইতিহাসের নানান সমালোচনার পরেও নেপোলিয়ান গ্রেট, আলেকজান্ডার দি গ্রেট। বাঙালির ইতিহাসে যতই উত্থান-পতন ঘটুক না কেন, বাঙালির প্রতিটি সৎ সন্তান ইতিহাসের আগামী হাজার বছরেও বীরত্ব খুঁজবে শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে। এবং তাকে ধারণ করেই বাঙালি ঘরের সন্তানরা বীর হয়ে উঠবে। সাহসী হয়ে উঠবে। আর ধ্রুব সত্য, বীরত্ব ছাড়া জীবনের কোনো পদক্ষেপই সফল হয় না। ষড়যন্ত্র কখনই বীরত্বের বিকল্প নয়।

শেখ মুজিব ও বাংলাদেশ যেমন যমজ শব্দ, শেখ মুজিব ও বাঙালিও তেমনি সমার্থক শব্দ। তেমনি এই বাংলায় বীরত্ব ও শেখ মুজিবুর রহমানও সমার্থক শব্দ। তাই এই বাংলায় বীরেরা সব সময়ই মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে তাঁর চরিত্রকে ধারণ করে।

শেখ মুজিবের ভাস্কর্য যারা ভেঙে ফেলে, যারা ওই ভাস্কর্যের মাথায় প্রস্রাব করে—তারা জানে না, মধ্যযুগে যারা বাংলা ভাষাকে দূরে ঠেলে ফেলার চেষ্টা করেছিল- সে সময় কবি আবদুল হাকিম তাদেরকে চিহ্নিত করেছিলেন এভাবেই
“যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি”

তাই বঙ্গবন্ধুকে এই ভূখণ্ডে যারা যখনই অপমান করুক না কেন, আবদুল হাকিমের অনুকরণেই কোনো কবি তাদের উদ্দেশে হয়তো এমন বলবে

যেসব বাংলাদেশে জন্মে—
স্বীকার করে না শেখ মুজিবের কীর্তি।
সেসব কাহার জন্ম নির্ণয়ে কেন বৃথা চেষ্টা,
বৃথা ঘৃণা করো তুমি তাদের প্রতি—
ঘৃণার পাত্রের থেকেও নিচু তারা অতি।

বাস্তবে বাংলা ভাষার মতো বাঙালির রাষ্ট্রে ও জাতীয় জীবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চিরকালীন শক্তি। আর বীরকে বা বীরের স্মৃতিকে আঘাত করলে, অপমান করলে বীরের অনুসারীর সংখ্যা বাড়ে, শক্তি বাড়ে সাধারণ সময়ের থেকে। তার ওপরে রয়েছে বঙ্গবন্ধু ও তার দেশ সৃষ্টির সহযাত্রীদের পবিত্র রক্তধারা। আর এ ধরনের রক্তধারার ক্ষমতা তো বর্তমানের ইরানকে দেখে পৃথিবী বুঝতে পারছে।

হাসান হোসেনের রক্তধারা

ইরান আক্রমণের পূর্বে আক্রমণকারীরা তাদের অস্ত্রের বাইরে ইরানের জিওগ্রাফির পাওয়ারও নিশ্চয়ই হিসেব করেছিল। কিন্তু তারা একটি হিসাব করেনি, ইরানের সব থেকে বড় জনগোষ্ঠী শিয়া সম্প্রদায়ের ঐক্যের মূল ভিত্তি নবীজির রক্তধারা বহনকারী হাসান-হোসেনের রক্ত। ১৪শ বছর আগে ফোরাত নদীর কূলে সীমারের নির্মম ছুরিতে শিশু পুত্র কন্যাসহ বীর হাসান-হোসেনের যে রক্ত ঝরেছিল, রক্ত ঝরেছিল হাসান হোসেনের আরও অনুসারীদের—ওই রক্তই ১৪’শ বছর ধরে শিয়া সম্প্রদায়কে আলাদা ঐক্যের শক্তি দিয়েছে। প্রতি মহরমের ১০ তারিখে তাদের ঐক্য দ্বিগুণ হয়। তাই বর্তমানে একের পর এক নেতা নিহত হবার পরেও তাদের ঐক্যে ফাটল ধরানো সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে বাংলাদেশ স্রষ্টা শেখ মুজিবের পরিবার-পরিজন ও তাঁর সহযাত্রী বীরদের রক্ত যারা ঝরিয়েছিল—তাদের অস্ত্রও কিন্তু সীমারের ছুরির মতোই। সীমারের ছুরি যেমন নবীজির রক্তধারার বিপরীতে, এখানে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীরাও তেমনি বাঙালি জাতির জীবনে বাংলাদেশের বিপরীতে। তাই বাঙালি জাতীয়তাবাদীর শক্তির ঐক্য শিয়াদের মতোই।

১৪’শ বছর পরেও দেখা যাবে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর হত্যার দিনে, তাঁর সহযাত্রী বীরদের জেলখানায় হত্যার দিনে—এমনকি তাঁর ঐতিহাসিক বাড়ি ভাঙার দিনে—বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তির, শেখ মুজিবের অনুসারীদের ঐক্য দ্বিগুণ হবে। এটাই বীরের রক্তধারার রীতি যে কোনো জাতির জীবনে।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.