চাঁদের এমন কিছু দৃশ্য, যা আগে কখনও মানুষের চোখে ধরা পড়েনি, সেগুলো এবার সামনে আনল নাসা। আর্টেমিস-২ মিশনের নভোচারীরা চাঁদের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় যে অভিজ্ঞতা ও ছবি সংগ্রহ করেছেন, তা চাঁদের ভূতাত্ত্বিক রহস্য বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
চাঁদের অজানা রূপ
৬ এপ্রিল চাঁদের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় নভোচারীরা চাঁদের দূরবর্তী অংশে নজর দেন। সেখানে তারা দেখেন আঘাতের ফলে তৈরি বিশাল গহ্বরগুলোর চারপাশে বাদামি ও সবুজের ভিন্ন ভিন্ন ছায়া, অসমান ভূখণ্ড এবং দীর্ঘ ছায়া। পাশাপাশি তারা দেখতে পান চাঁদের দিগন্তে পৃথিবীর উদয় এবং ভাসমান ধুলোর আলো।

মারে ওরিয়েন্টালে গহ্বরের সম্পূর্ণ দৃশ্য
নভোচারীরা প্রথমবারের মতো মারে ওরিয়েন্টালে নামের প্রায় ৬০০ মাইল বিস্তৃত এক বিশাল গহ্বরের সম্পূর্ণ রূপ দেখতে সক্ষম হন। এই গহ্বরটি চাঁদের কাছের এবং দূরের দুই অংশ জুড়েই বিস্তৃত। অতীতে অ্যাপোলো মিশনের সময় এই অঞ্চলটি অন্ধকারে ঢাকা থাকায় সম্পূর্ণভাবে দেখা সম্ভব হয়নি।
চাঁদের যে অংশ পৃথিবী থেকে দেখা যায় না
গহ্বরটির বাম পাশের পুরো অঞ্চলটি চাঁদের সেই অংশ, যা পৃথিবী থেকে কখনও দেখা যায় না। কারণ চাঁদ নিজের অক্ষের উপর যত দ্রুত ঘোরে, পৃথিবীকে প্রদক্ষিণও করে ঠিক একই গতিতে, ফলে একই অংশ সবসময় পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকে।
ভূখণ্ডের রঙ ও গঠনের পার্থক্য
নভোচারীরা লক্ষ্য করেন যে গহ্বরের ভেতরের অংশে মসৃণ সমতল ভূমি রয়েছে, তবে কেন্দ্রে বাদামি রঙের উপস্থিতি বেশি। খালি চোখে এই অঞ্চলটি সমতল বা মালভূমির মতো মনে হলেও ক্যামেরার মাধ্যমে রঙ ও ছায়ার সূক্ষ্ম পার্থক্য স্পষ্টভাবে বোঝা গেছে।
![]()
ভাভিলভ ও হার্টস্প্রুং গহ্বর
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল ভাভিলভ গহ্বর, যা বড় ও প্রাচীন হার্টস্প্রুং গহ্বরের কিনারায় অবস্থিত। এখানে নভোচারীরা দেখেন, গহ্বরের ভেতরের অংশ তুলনামূলকভাবে মসৃণ হলেও বাইরের প্রান্ত অনেক বেশি খসখসে ও অমসৃণ।
দক্ষিণ মেরু-এইটকেন অববাহিকা
উড়ানের প্রায় ২৪ মিনিট পর তারা দক্ষিণ মেরু-এইটকেন অববাহিকা পর্যবেক্ষণ করেন। প্রায় ১,৬০০ মাইল বিস্তৃত এই অঞ্চলটি সৌরজগতের সবচেয়ে বড় পরিচিত আঘাতজনিত গহ্বর। এই বিশাল কাঠামো চাঁদের ইতিহাস ও গঠন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।
সূর্যগ্রহণ ও মহাকাশের দৃশ্য
চাঁদের দূরবর্তী অংশ ঘুরে আসার পর নভোচারীরা প্রায় ৫৩ মিনিট দীর্ঘ একটি সূর্যগ্রহণ প্রত্যক্ষ করেন। এই সময় তারা সূর্যের করোনা দেখতে পান এবং দূরে উজ্জ্বল শুক্র, লালচে মঙ্গল ও হালকা কমলা আভাযুক্ত শনি গ্রহের ঝলকও দেখতে সক্ষম হন। সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে করোনাকে তারা শিশুর নরম চুলের মতো দেখাচ্ছিল বলে বর্ণনা করেন।

পৃথিবীর উদয়
শেষে চাঁদের দিগন্তে পৃথিবী উদিত হতে দেখা যায়, যা “আর্থরাইজ” নামে পরিচিত। ১৯৬৮ সালে প্রথমবার এই দৃশ্য দেখার পর যেমন বিস্ময় তৈরি হয়েছিল, এবারও তেমনই এক অনন্য মুহূর্তের সাক্ষী হন নভোচারীরা।
এই সব ছবি ৬ এপ্রিল ওরিয়ন মহাকাশযান থেকে তোলা হয়েছে নভোচারী রেইড উইসম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কচ ও জেরেমি হ্যানসেনের মাধ্যমে এবং নাসা তা প্রকাশ করেছে। এই পর্যবেক্ষণগুলো ভবিষ্যতে চাঁদের গঠন ও ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















