বর্নিও দ্বীপের গভীর অরণ্যে এমন এক প্রাণীর দেখা মেলে, যাকে একবার দেখলে ভুলে থাকা কঠিন। লম্বা ও অস্বাভাবিক বড় নাক—এই বৈশিষ্ট্যই তাকে অন্য সব বানর থেকে আলাদা করেছে। এই প্রাণীটির নাম প্রোবোসিস বানর, যা এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকলেও নতুন করে লাগানো বনে আবার আশার আলো দেখাচ্ছে।
নাকই শক্তি, নাকই পরিচয়
প্রোবোসিস বানরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার ঝুলন্ত লম্বা নাক। পুরুষ বানরদের ক্ষেত্রে এই নাক প্রায় সাত ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। গবেষকদের মতে, বড় নাক শুধু দৃষ্টিনন্দন নয়, এটি শক্তি ও প্রজনন সক্ষমতারও প্রতীক। যেসব পুরুষ বানরের নাক বড়, তারা সাধারণত বেশি শক্তিশালী এবং বেশি সঙ্গী আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।
![Borneo's Disappearing Wildlife: 5 Endangered Species of the Rainforest [UPDATED ON MARCH 2020] | Borneo Eco Tours | Blog](https://www.borneoecotours.com/v1/blog/wp-content/uploads/2019/01/ProboscisNEW.jpg)
এই বানরদের আরেকটি বিশেষ দিক হলো তাদের শব্দ। পুরুষ বানরের নাক দিয়ে বের হওয়া গভীর আওয়াজ সহজেই দূর থেকে শোনা যায়, যা তাদের উপস্থিতি জানান দেয়।
পানির সঙ্গে অদ্ভুত সম্পর্ক
প্রোবোসিস বানরকে পৃথিবীর সবচেয়ে জলপ্রীয় প্রাইমেটদের একটি বলা হয়। তারা নিয়মিত নদী পার হয়ে এক গাছ থেকে আরেক গাছে খাবারের খোঁজে যায়। তাদের হাত ও পায়ের আংশিক জালিকাযুক্ত গঠন এই সাঁতারকে সহজ করে তোলে।
রাতের বেলায় তারা নদীর ধারে গাছের ডালে ফিরে আসে। ধারণা করা হয়, পানির কাছাকাছি থাকলে শিকারি প্রাণী সহজে আক্রমণ করতে পারে না, ফলে এটি তাদের নিরাপত্তা বাড়ায়।

বন ধ্বংসে বিপন্ন অস্তিত্ব
কিন্তু এই বানরদের জীবনযাত্রা তাদের জন্যই বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ তারা নদীর ধারের বনাঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। গত কয়েক দশকে ব্যাপক বন উজাড়ের ফলে তাদের বাসস্থান দ্রুত কমে গেছে।
কিছু অঞ্চলে শিকারও তাদের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে। বর্তমান অনুমান অনুযায়ী, এই বানরের সংখ্যা প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজারের মধ্যে। গত কয়েক দশকে তাদের সংখ্যা ৭০ শতাংশের বেশি কমেছে বলে ধারণা করা হয়।
নতুন বনেই ফিরছে জীবন
বন উজাড়ের ফলে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এই প্রাণীদের বাঁচাতে শুরু হয়েছে পুনরুদ্ধার উদ্যোগ। নদীর তীরে নতুন করে স্থানীয় গাছ লাগিয়ে বন পুনর্গঠন করা হচ্ছে। ২০০৮ সাল থেকে এমন উদ্যোগে লাখ লাখ গাছ লাগানো হয়েছে।
এই নতুন বনাঞ্চলে ইতিমধ্যেই প্রোবোসিস বানরের ফিরে আসার প্রমাণ মিলেছে। কিছু এলাকায় আবার তাদের পরিবার গড়ে উঠছে, যা গবেষকদের জন্য বড় আশার খবর।
![]()
ছোট উদ্যোগেই বড় পরিবর্তন
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বানরদের টিকে থাকতে নিখুঁত অরণ্যের প্রয়োজন নেই। অল্প কিছু পুনরুদ্ধার কাজই তাদের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
এই ধারণা এখন সংরক্ষণ কার্যক্রমকে নতুন দিশা দেখাচ্ছে। কৃষিজমির সঙ্গে বনাঞ্চল যুক্ত করে ধীরে ধীরে তাদের আবাসস্থল পুনর্গঠন করা সম্ভব হচ্ছে।
সংরক্ষিত এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়
বর্নিওর কিছু সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এখনও এই বানরের নিরাপদ বসবাস রয়েছে। সেখানে প্রায় দেড় শতাধিক প্রোবোসিস বানর বাস করে। এসব এলাকা ভবিষ্যতে তাদের টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রোবোসিস বানর শুধু একটি অদ্ভুত প্রাণী নয়, এটি প্রকৃতির ভারসাম্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের বাঁচাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই অনন্য প্রাণীটি একদিন শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















