বাংলাদেশকে কোনো একক দেশ বা জোটের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ। তাদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক সম্পর্ক বহুমুখী রাখলে বাংলাদেশ আরও বেশি কৌশলগত স্বাধীনতা পাবে এবং আঞ্চলিক রাজনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে দক্ষভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে।
সংস্থাটি বলছে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় বাংলাদেশকে সতর্কভাবে এগোতে হবে। কোনো একক অংশীদারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তৈরি করতে পারে, যা অতীতে ভারতবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে দেখা গেছে।
কূটনীতিতে ভারসাম্যের প্রয়োজন
ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নতুন সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে যখন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। এতে যেমন ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি সুযোগও তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা সহজ হবে না, কারণ দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করবে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বড় শক্তিগুলো নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য ও কৌশলগত প্রতিযোগিতায় গুরুত্ব বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে চীন অবকাঠামো বিনিয়োগ ও সহযোগিতার মাধ্যমে তার অবস্থান শক্ত করতে চাইছে।
বহুমুখী সম্পর্কই কৌশলগত শক্তি
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, পাকিস্তান, তুরস্ক, উপসাগরীয় দেশ এবং রাশিয়াসহ বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে হবে। এতে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা সহজ হবে।
সরকারের নীতি হিসেবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ ধারণার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে সব দেশের সঙ্গে সম্মানজনক ও পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
রোহিঙ্গা সংকট বড় চ্যালেঞ্জ
বিদেশনীতি পরিচালনায় রোহিঙ্গা সংকটকে সবচেয়ে কঠিন ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের কারণে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার দ্রুত প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা খুবই কম।
বর্তমান নীতিতে তাদের কাজের সুযোগ না থাকায় তারা আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু বৈশ্বিক সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্যসহায়তাও কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে বলা হয়েছে, তবে তা বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণের ওপর প্রভাব কমানোর দিকেও নজর দিতে হবে।
এছাড়া শরণার্থী শিবিরে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করার বিষয়েও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে রাখাইন অঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সংলাপ পুনরায় শুরু করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা এবং জটিল বৈশ্বিক বাস্তবতায় ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















