ইন্দোনেশিয়ার লোম্বক প্রণালীর কাছে একটি সন্দেহভাজন পানির নিচের চীনা ড্রোন উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় এশিয়াজুড়ে সমুদ্রতলের নজরদারি প্রতিযোগিতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বহু বছর ধরে চলা এই প্রতিযোগিতা এখন আরও তীব্র হচ্ছে, বিশেষ করে কৌশলগত জলপথগুলোকে ঘিরে।
ঘটনাটি সামনে আসে যখন টর্পেডোর মতো দেখতে একটি যন্ত্র স্থানীয় জেলে উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসে। লোম্বক প্রণালী প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ গভীর জলপথ, যেখানে সাবমেরিন গোপনে চলাচল করতে পারে। ফলে এটি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার নজরদারিতে রয়েছে।
চীনের প্রতিক্রিয়া ও সম্ভাব্য ব্যবহার
চীন জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য জানে না, তবে আন্তর্জাতিক আইন মেনে সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণা পরিচালনা করে থাকে। তাদের দাবি, যন্ত্রটি ত্রুটির কারণে অন্য দেশের জলসীমায় চলে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ড্রোন সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরি, মহাসাগরীয় তথ্য সংগ্রহ, নৌ চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর অবস্থান নির্ধারণে ব্যবহৃত হতে পারে। সংকটের সময়ে এসব তথ্য অত্যন্ত কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।
ইরান যুদ্ধ ও কৌশলগত জলপথের গুরুত্ব
ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীর অনিশ্চয়তা এই ধরনের নজরদারি কার্যক্রমের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্টগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে বড় শক্তিগুলো এখন সমুদ্রতলের তথ্য সংগ্রহে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন ইতোমধ্যেই বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগরের গভীর অঞ্চল এবং গুয়াম ও তাইওয়ানের আশপাশের সংবেদনশীল এলাকায় সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে তারা সাবমেরিন যুদ্ধের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
ভারতের পাল্টা প্রস্তুতি
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারতও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নজরদারি সক্ষমতা বাড়াতে বড় বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে শব্দ-সংবেদী সেন্সর নেটওয়ার্ক, গভীর সমুদ্র প্রযুক্তি এবং আকাশ থেকে নজরদারি।
ভারত পি-৮আই নজরদারি বিমান, সমুদ্র ড্রোন এবং নিজস্ব উন্নত পানির নিচের যান ব্যবহার করছে। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতাও জোরদার করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত এখন আর পুরোপুরি পিছিয়ে নেই, বরং দ্রুত এগিয়ে আসছে।

দক্ষিণ এশিয়ার সীমাবদ্ধতা
অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের সক্ষমতা এখনও সীমিত। পাকিস্তানের সাবমেরিন বহর থাকলেও তাদের প্রযুক্তি তুলনামূলকভাবে পুরোনো। বাংলাদেশে মাত্র দুটি পুরোনো সাবমেরিন রয়েছে এবং সাবমেরিনবিরোধী সক্ষমতা সীমিত। শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ প্রায় পুরোপুরি বাহ্যিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বৈচিত্র্যময় প্রস্তুতি
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অবস্থাও ভিন্ন ভিন্ন। ফিলিপাইন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সহযোগিতায় তাদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। সিঙ্গাপুর সমুদ্রতলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে কাজ করছে, আর ইন্দোনেশিয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সাবমেরিন প্রযুক্তি নিয়ে এগোচ্ছে।
ভিয়েতনাম ছয়টি আধুনিক সাবমেরিন নিয়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করলেও তাদের নজরদারি ব্যবস্থা এখনও উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে।
সমুদ্রতলের প্রতিযোগিতার ভবিষ্যৎ
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এখনও এই প্রতিযোগিতার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বাজেট সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তিগত ঘাটতি এবং বাইরের সহায়তার ওপর নির্ভরতা তাদের অগ্রগতিকে সীমিত করছে। তবে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকি এই অঞ্চলে সমুদ্রতলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দ্রুত এগিয়ে নিতে বাধ্য করছে।
সমুদ্রের নিচের এই অদৃশ্য প্রতিযোগিতা আগামী দিনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা রাজনীতির একটি বড় নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















