কুড়িগ্রাম, দেশের উত্তরের সীমান্তবর্তী একটি জেলা, যেখানে বিস্তীর্ণ আয়তন থাকা সত্ত্বেও দারিদ্র্য, ভূমিহীনতা ও নদীভাঙনের চাপে লাখো মানুষ এখনও কঠিন জীবনযাপন করছে।
ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, দুর্বল অবকাঠামো এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে জেলার উন্নয়ন প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। প্রায় ২ হাজার ২৫৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই জেলায় বাস করে ২৩ লাখেরও বেশি মানুষ। কিন্তু এই বিপুল জনসংখ্যার বড় একটি অংশ এখনও মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
দারিদ্র্যের গভীরতা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রামে দারিদ্র্যের হার ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ, যেখানে জাতীয় গড় ১৯ শতাংশ। চরম দারিদ্র্যের হারও উদ্বেগজনক—৫৩ দশমিক ২ শতাংশ। নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি আরও কঠিন। চর রাজিবপুর উপজেলায় দারিদ্র্যের হার ৭৯ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বঞ্চনার গভীরতা স্পষ্ট করে।

ভূমিহীনতা ও স্বাস্থ্য সংকট
জেলার প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পরিবার ভূমিহীন। জমি না থাকায় জীবিকা নির্বাহের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে প্রায় ৫৭ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন রোগে ভুগছে, যা দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্য সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
নদীভাঙনের নির্মম বাস্তবতা
কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলাসহ ১৬টি নদী। এখানে ৪৬৯টি চর রয়েছে, যার মধ্যে ২৬৯টিতে বসবাস করছে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। প্রতি বছর নদীভাঙনে হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে নতুন করে ভূমিহীন হয়ে পড়ে। ব্রহ্মপুত্রের প্রায় ৭০ কিলোমিটার, তিস্তার ৪৫ কিলোমিটার এবং ধরলার ৬০ কিলোমিটার অংশে জরুরি নদী ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
কাজের অভাব ও শিল্পহীনতা
জেলায় শিল্পায়নের অভাব কর্মসংস্থানের সংকটকে আরও তীব্র করেছে। ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কুড়িগ্রাম টেক্সটাইল মিল ২০১১ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আর কোনো বড় শিল্প গড়ে ওঠেনি। ফলে স্থানীয় মানুষের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত।

সম্ভাবনা ও ধীরগতি
ধরলা নদীর তীরে প্রস্তাবিত ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের জন্য ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য ১৫০ দশমিক ০৭ একর খাসজমি এবং ৬৯ দশমিক ৫৭ একর ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি বরাদ্দের প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৩৩ দশমিক ৯২ একর জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে, তবে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগবে।
মানুষের কণ্ঠে বাস্তবতা
চর কালীর আলগার বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, নদীভাঙনে একাধিকবার ঘর হারিয়েছেন তিনি। এখনও স্থায়ী কোনো সমাধান না থাকায় প্রতি বছর আতঙ্কে থাকতে হয়। আরেক বাসিন্দা আকলিমা বেগম জানান, চরাঞ্চলে সম্পদ থাকলেও বাজার, স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে মানুষ পিছিয়ে আছে।
সমাধানের পথ কোথায়

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, সরকারি উদ্যোগ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রয়োজন নদী ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়ন। বিশেষজ্ঞরা উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন। ধরলা নদীর ওপর রেলসেতু, নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গামারীতে রেলসংযোগ উন্নয়ন এবং গাইবান্ধা, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ হয়ে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া গবাদিপশুর জন্য বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, স্থানীয় বাজার উন্নয়ন, নদীপথে সরকারি পরিবহন চালু, টোলমুক্ত পারাপার এবং চর বিষয়ক পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি উঠেছে।
জেলা পরিষদ প্রশাসক জানিয়েছেন, নদীভাঙন প্রতিরোধ, চরাঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকার কাজ করছে। তবে টেকসই উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা অপরিহার্য।
কুড়িগ্রামের এই চিত্র শুধু একটি জেলার নয়, বরং দেশের উন্নয়ন বৈষম্যের প্রতিফলন। যথাযথ পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত হলে এই জেলার লাখো মানুষের জীবনমান বদলে যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















