ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীর কার্যত অচলাবস্থার প্রভাব এবার সরাসরি পড়তে শুরু করেছে জাপানের কৃষিখাতে। আমদানি-নির্ভর রাসায়নিক সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশটির খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও এখনো বড় ধরনের সরবরাহ সংকট দেখা দেয়নি, তবু আন্তর্জাতিক বাজারে সারের ঘাটতির আশঙ্কা বাড়তে থাকায় জাপান সরকার মজুত বাড়ানো এবং বিকল্প উৎস খোঁজার উদ্যোগ নিয়েছে।
আমদানির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা
জাপানে ব্যবহৃত রাসায়নিক সারের প্রধান কাঁচামাল ইউরিয়া, অ্যামোনিয়াম ফসফেট এবং পটাশিয়াম ক্লোরাইডের প্রায় পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে জাপানের ইউরিয়ার ৭৪ শতাংশ এসেছে মালয়েশিয়া থেকে। অ্যামোনিয়াম ফসফেটের ৭২ শতাংশ সরবরাহ করেছে চীন এবং পটাশিয়াম ক্লোরাইডের ৭৮ শতাংশ এসেছে কানাডা থেকে।
ইউরিয়া কম খরচের নাইট্রোজেন সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অ্যামোনিয়াম ফসফেট বিভিন্ন ধরনের মাটি ও ফসলের জন্য উপযোগী, আর পটাশিয়াম ক্লোরাইড মাটিতে পটাশিয়ামের ঘাটতি পূরণে ব্যবহৃত হয়।
সারের দামে নতুন বৃদ্ধি
দেশটির জাতীয় কৃষি সমবায় ফেডারেশন জেন-নো ঘোষণা দিয়েছে, ২০২৬ সালের শরৎকালীন মৌসুমের জন্য জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সরবরাহকৃত সারের পাইকারি মূল্য বাড়ানো হবে।
নতুন মূল্য অনুযায়ী ইউরিয়ার দাম ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ, অ্যামোনিয়াম ফসফেটের দাম ৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং পটাশিয়াম ক্লোরাইডের দাম ৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের একই মৌসুমের তুলনায় এই বৃদ্ধি কৃষকদের জন্য অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি করবে।
জেন-নোর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এতটাই অস্থির হয়ে উঠেছে যে সারের কাঁচামালের ভবিষ্যৎ মূল্য নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে আমদানিকৃত ইউরিয়ার দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় সেই অতিরিক্ত খরচ বাজারে সমন্বয় করা হয়েছে।

সরবরাহ পরিস্থিতি কতটা ঝুঁকিতে?
ইরান যুদ্ধের কারণে ন্যাফথা সরবরাহে সংকট তৈরি হয়ে বিভিন্ন শিল্পে আতঙ্ক ছড়ালেও সার খাতের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সারের কাঁচামালের ব্যবহার সীমিত হওয়ায় সরবরাহকারীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা বা অতিরিক্ত মজুতের প্রবণতা এখনো দেখা যায়নি।
কৃষি, মৎস্য ও বনভিত্তিক অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা করা নোরিনচুকিন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক মিওয়া কোবারি বলেছেন, সারের কাঁচামাল সাধারণত অন্য শিল্পে ব্যবহার হয় না। ফলে সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রতিযোগিতামূলক চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। এছাড়া সার ভারী ও বড় আকারের হওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে মজুত রাখা ব্যয়বহুল।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি।
খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগ
জাপানের কৃষিমন্ত্রী নোরিকাজু সুজুকি জানিয়েছেন, আপাতত দেশের জন্য পর্যাপ্ত ইউরিয়া নিশ্চিত করা হয়েছে এবং সরকার সরবরাহ বজায় রাখতে কাজ করছে। পাশাপাশি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা, কাঁচামাল মজুত বৃদ্ধি এবং দেশীয় সম্পদের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা সতর্ক করেছে, হরমুজ প্রণালীতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী সারের সংকট দেখা দিতে পারে। এর ফলে চলতি বছর এবং আগামী বছরে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংস্থাটির মতে, ফসল উৎপাদনের নির্দিষ্ট সময়সূচি থাকে এবং প্রয়োজনীয় সময়ে সার না পৌঁছালে ফলন কমে যাওয়া অনিবার্য।
এই প্রেক্ষাপটে জি-৭ দেশের কৃষিমন্ত্রীরাও খাদ্য ও সার সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য বাজার ব্যবস্থার আহ্বান জানিয়েছেন।
জাপানে সারের দাম বৃদ্ধি শুধু কৃষকদের ব্যয় বাড়ানোর বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল, খাদ্যনিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার বহুমাত্রিক প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠছে।
হরমুজ প্রণালীর সংকটে জাপানে সারের দাম বৃদ্ধি, বাড়ছে খাদ্যনিরাপত্তা উদ্বেগ
জাপানে আমদানি-নির্ভর সারের দাম বেড়েছে। ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থায় খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
Sarakhon Report 


















