০৭:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
সংঘাত থেকে বিচ্ছিন্নতা: নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ইরানের কৌশলগত সংকট মোদির পাকিস্তান নীতি: সংলাপহীনতার আড়ালে কি আঞ্চলিক আধিপত্যের রাজনীতি? বিদ্যুৎ সংকটের নেপথ্যে জ্বালানি, ডলার, বকেয়া ও আস্থার সংকট উত্তর বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ, ৩ নম্বর সতর্কসংকেত জারি ছাত্র বিক্ষোভ নিয়ে সংসদে অমিত শাহের লেকচার শুনতে আগ্রহী নই: রাহুল গান্ধী লোহিত সাগর ও ওমান উপসাগরে একদিনে তিন জাহাজে হামলা, নিহত ৬; ৩ পাকিস্তানি ট্রাম্পকে গোপনে সরিয়ে নেওয়া হয় এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে, ইরানি হামলার আশঙ্কায় চমকপ্রদ নিরাপত্তা অভিযান তালেবান শাসনে ২৪ লাখ আফগান কিশোরীর মাধ্যমিক শিক্ষা বন্ধ, অবিলম্বে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান ইউনেস্কোর বাইডেনের স্বাস্থ্য সংকট ডেমোক্র্যাটদের গভীর রাজনৈতিক সংকটও উন্মোচন করছে লোডশেডিং ঘিরে আতঙ্ক, বিদ্যুৎ অফিসে নিরাপত্তা চেয়ে থানায় আবেদন

সংঘাত থেকে বিচ্ছিন্নতা: নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ইরানের কৌশলগত সংকট

মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত আঞ্চলিক উত্তেজনাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যার অভিঘাত এখন মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নাড়া দিচ্ছে। যে সংঘাতকে শুরুতে সীমিত পরিসরের সামরিক মোকাবিলা হিসেবে দেখা হচ্ছিল, তা ক্রমেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে কূটনীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়া দেশগুলোও সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়েছে।

তেহরান দাবি করতে পারে, যুদ্ধের সূচনা তার হাতে হয়নি। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রের দায় কেবল প্রথম গুলি চালানোর প্রশ্নে নির্ধারিত হয় না। দীর্ঘদিনের ভুল হিসাব, কূটনৈতিক সুযোগ নষ্ট করা এবং আপসহীন অবস্থানও সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে। ইরানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই যুদ্ধ কে শুরু করেছে তা নয়; বরং কেন তেহরান এমন একটি কৌশল বেছে নিল, যা ধীরে ধীরে তার নিজের কূটনৈতিক পরিসর সংকুচিত করেছে।

কূটনীতির জায়গা সংকুচিত হওয়ার পরিণতি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু ইস্যুতে অর্থবহ আলোচনায় ইরানের অনীহা হয়তো স্বল্পমেয়াদে কঠোর অবস্থানের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি তেহরানের দর-কষাকষির ক্ষমতাকেই দুর্বল করেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি শুধু সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; বিকল্প তৈরি করার ক্ষমতা, সম্পর্ক ধরে রাখার দক্ষতা এবং সংকটের সময় উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করাও রাষ্ট্রীয় শক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই জায়গাতেই ইরানের কৌশলগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। একটি সরকার কতটা কঠোর অবস্থান নিতে পারে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অবস্থানের পরিণতি সামলানোর সক্ষমতা। জনগণের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক সম্পর্ক রক্ষা করতে না পারলে শুধু প্রতিরোধের ভাষা রাষ্ট্রীয় সাফল্যের প্রমাণ হয়ে ওঠে না।

হরমুজ প্রণালী ফের বন্ধ করল ইরান :: এটিএন নিউজ

বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে তেহরান যেন বিপরীত পথ বেছে নিয়েছে। চাপ বাড়ার পর অবস্থান পুনর্বিবেচনার পরিবর্তে সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, ইরানের প্রতিক্রিয়া শুধু ঘোষিত প্রতিপক্ষদের লক্ষ্য করে সীমাবদ্ধ থাকেনি; উপসাগরীয় দেশগুলোকেও এর অভিঘাতের মধ্যে টেনে আনা হয়েছে। অথচ এসব দেশ দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা কমানো ও কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

হরমুজের ঝুঁকি এখন বৈশ্বিক ঝুঁকি

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা এই সংঘাতকে আরও বিপজ্জনক মাত্রা দিয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হিসেবে এই অঞ্চলে অস্থিরতা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমস্যা নয়; এটি জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এখানেই ইরানের কৌশলের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য দেখা যায়। একটি রাষ্ট্র যখন নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করে, যাতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলো তার বিরুদ্ধে আরও ঘনিষ্ঠ হয়, তখন সামরিক চাপ প্রয়োগ শেষ পর্যন্ত কৌশলগত সুবিধার বদলে বিচ্ছিন্নতা ডেকে আনতে পারে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী বিশ্লেষণে রাষ্ট্রগুলো শুধু কোনো দেশের সামরিক শক্তি দেখে সিদ্ধান্ত নেয় না; তার উদ্দেশ্য ও আচরণও বিবেচনা করে। কোনো রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড যদি প্রতিবেশীদের কাছে ক্রমবর্ধমান হুমকি হিসেবে প্রতিভাত হয়, তাহলে তারা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য একে অন্যের কাছাকাছি আসতে শুরু করে। ইরানের বর্তমান অবস্থান সেই ভারসাম্য তৈরির প্রক্রিয়াকেই ত্বরান্বিত করতে পারে।

অর্থাৎ, তেহরান যত বেশি চাপ প্রয়োগ করে নিজের প্রভাব বাড়াতে চাইছে, ততই অন্য রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন অনুভব করছে। শক্তি প্রদর্শনের এই পদ্ধতি শেষ পর্যন্ত শক্তির পরিধি বাড়ানোর বদলে ইরানের কৌশলগত পরিসর সংকুচিত করতে পারে।

উপসাগরের সামনে নতুন কৌশলগত হিসাব

যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে নিজেদের কৌশলগত সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। সংকটের সময়ই বোঝা যায় কোন জোট কতটা কার্যকর, কোন সম্পর্ক কতটা নির্ভরযোগ্য এবং কোন অংশীদারের ওপর কতটা আস্থা রাখা যায়।

হরমুজ প্রণালীতে হস্তক্ষেপ করলে হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের | STAR NEWS

এ কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বর্তমান পরিস্থিতি শুধু নিরাপত্তা সংকট নয়; এটি ভবিষ্যৎ কূটনীতি ও জোটনীতির পুনর্বিন্যাসেরও মুহূর্ত। পুরোনো সমীকরণ স্থায়ী নয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সম্পর্ক পুনর্গঠন করে। যে পক্ষ এই পরিবর্তন সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারবে এবং আবেগের বদলে হিসাব করে সিদ্ধান্ত নেবে, ভবিষ্যতের আঞ্চলিক ব্যবস্থায় তার প্রভাবও বেশি হবে।

আরব বিশ্বের পুরোনো দ্বিধা আবার সামনে

এই যুদ্ধ আরব বিশ্বের দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক দুর্বলতাকেও সামনে এনেছে। সেটি হলো—‘শত্রুর শত্রু বন্ধু’ ধরনের সরলীকৃত রাজনৈতিক হিসাব। ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের বিরোধের কারণে কেউ কেউ উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে তেহরানের আগ্রাসনকে স্পষ্টভাবে নিন্দা করতে দ্বিধা দেখাতে পারে। কিন্তু এই যুক্তি বাস্তব রাজনীতির জটিলতাকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে।

একই সময়ে একাধিক পক্ষের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা সম্ভব। ইসরায়েলের নীতি নিয়ে আপত্তি থাকা এবং ইরানের উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে আগ্রাসনের বিরোধিতা করা—এই দুই অবস্থান পরস্পরবিরোধী নয়। বরং একটি পরিণত পররাষ্ট্রনীতির জন্য একই সঙ্গে একাধিক সত্যকে স্বীকার করার সক্ষমতা প্রয়োজন।

এই জায়গায় আরব লীগের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংকটের সময় কোনো আঞ্চলিক সংগঠনের শক্তি তার বিবৃতির কঠোরতায় নয়, বরং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতায় প্রকাশ পায়। ইরানের পদক্ষেপের বিষয়ে দেরিতে প্রতিক্রিয়া বা অস্পষ্ট অবস্থান সংগঠনটির বিশ্বাসযোগ্যতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।

১৯৯০ সালে ইরাক কুয়েত আক্রমণ করার সময় আরব বিশ্বের বিভক্তি যেমন সম্মিলিত প্রতিক্রিয়াকে দুর্বল করেছিল, বর্তমান পরিস্থিতিও সেই পুরোনো সমস্যার কথা মনে করিয়ে দেয়। ভিন্ন ভিন্ন আনুগত্য ও কৌশলগত স্বার্থ যদি আবারও সম্মিলিত অবস্থানকে বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও কমে যেতে পারে।

বহুমেরুর বিশ্বব্যবস্থা কী, কীভাবে গড়ে উঠছে

যুদ্ধের আসল শিক্ষা কোথায়

যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত শুধু ধ্বংসের হিসাব দেয় না; এটি রাষ্ট্রগুলোর প্রকৃত সম্পর্কও প্রকাশ করে। শান্তিকালে যে কূটনৈতিক ভাষা অনেক কিছু আড়াল করতে পারে, সংঘাত সেই আবরণ সরিয়ে দেয়। তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে কে কার পাশে দাঁড়ায়, কোন জোট কতটা কার্যকর এবং কোন রাষ্ট্রের প্রভাব বাস্তবে কতটা বিস্তৃত।

ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা তাই কেবল সামরিক সংঘাত নয়। আরও গভীর সংকট হলো, দীর্ঘদিন ধরে অর্জিত কূটনৈতিক পরিসর যদি দ্রুত সংকুচিত হয়ে যায় এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো নিরাপত্তার প্রয়োজনে তার বিপরীতে ভারসাম্য গড়ে তোলে, তাহলে সামরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও একটি রাষ্ট্র কৌশলগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

এই সংঘাতের শেষ পরিণতি এখনই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শুধু কঠোরতা টেকসই শক্তির নিশ্চয়তা দেয় না। কখন চাপ প্রয়োগ করতে হবে, কখন সংযত হতে হবে এবং কখন কৌশল বদলাতে হবে—এই তিনটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের স্থিতিস্থাপকতা নির্ধারণ করে।

যুদ্ধের শব্দ একসময় থেমে যাবে। কিন্তু তার পর যে নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতা তৈরি হবে, সেখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে কে কতটা ধ্বংস করেছে তা নয়; বরং কে পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্য সবচেয়ে দ্রুত বুঝতে পেরেছে। ইরানের জন্য সেই হিসাবটি এখন আগের চেয়ে অনেক কঠিন। আর উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এটি এমন এক মুহূর্ত, যখন সংকটকে শুধু সামলানো নয়, ভবিষ্যতের আঞ্চলিক কাঠামোকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সংঘাত থেকে বিচ্ছিন্নতা: নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ইরানের কৌশলগত সংকট

সংঘাত থেকে বিচ্ছিন্নতা: নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ইরানের কৌশলগত সংকট

০৭:০৬:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত আঞ্চলিক উত্তেজনাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যার অভিঘাত এখন মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নাড়া দিচ্ছে। যে সংঘাতকে শুরুতে সীমিত পরিসরের সামরিক মোকাবিলা হিসেবে দেখা হচ্ছিল, তা ক্রমেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে কূটনীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়া দেশগুলোও সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়েছে।

তেহরান দাবি করতে পারে, যুদ্ধের সূচনা তার হাতে হয়নি। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রের দায় কেবল প্রথম গুলি চালানোর প্রশ্নে নির্ধারিত হয় না। দীর্ঘদিনের ভুল হিসাব, কূটনৈতিক সুযোগ নষ্ট করা এবং আপসহীন অবস্থানও সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে। ইরানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই যুদ্ধ কে শুরু করেছে তা নয়; বরং কেন তেহরান এমন একটি কৌশল বেছে নিল, যা ধীরে ধীরে তার নিজের কূটনৈতিক পরিসর সংকুচিত করেছে।

কূটনীতির জায়গা সংকুচিত হওয়ার পরিণতি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু ইস্যুতে অর্থবহ আলোচনায় ইরানের অনীহা হয়তো স্বল্পমেয়াদে কঠোর অবস্থানের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি তেহরানের দর-কষাকষির ক্ষমতাকেই দুর্বল করেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি শুধু সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; বিকল্প তৈরি করার ক্ষমতা, সম্পর্ক ধরে রাখার দক্ষতা এবং সংকটের সময় উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করাও রাষ্ট্রীয় শক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই জায়গাতেই ইরানের কৌশলগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। একটি সরকার কতটা কঠোর অবস্থান নিতে পারে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অবস্থানের পরিণতি সামলানোর সক্ষমতা। জনগণের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক সম্পর্ক রক্ষা করতে না পারলে শুধু প্রতিরোধের ভাষা রাষ্ট্রীয় সাফল্যের প্রমাণ হয়ে ওঠে না।

হরমুজ প্রণালী ফের বন্ধ করল ইরান :: এটিএন নিউজ

বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে তেহরান যেন বিপরীত পথ বেছে নিয়েছে। চাপ বাড়ার পর অবস্থান পুনর্বিবেচনার পরিবর্তে সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, ইরানের প্রতিক্রিয়া শুধু ঘোষিত প্রতিপক্ষদের লক্ষ্য করে সীমাবদ্ধ থাকেনি; উপসাগরীয় দেশগুলোকেও এর অভিঘাতের মধ্যে টেনে আনা হয়েছে। অথচ এসব দেশ দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা কমানো ও কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

হরমুজের ঝুঁকি এখন বৈশ্বিক ঝুঁকি

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা এই সংঘাতকে আরও বিপজ্জনক মাত্রা দিয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হিসেবে এই অঞ্চলে অস্থিরতা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমস্যা নয়; এটি জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এখানেই ইরানের কৌশলের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য দেখা যায়। একটি রাষ্ট্র যখন নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করে, যাতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলো তার বিরুদ্ধে আরও ঘনিষ্ঠ হয়, তখন সামরিক চাপ প্রয়োগ শেষ পর্যন্ত কৌশলগত সুবিধার বদলে বিচ্ছিন্নতা ডেকে আনতে পারে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী বিশ্লেষণে রাষ্ট্রগুলো শুধু কোনো দেশের সামরিক শক্তি দেখে সিদ্ধান্ত নেয় না; তার উদ্দেশ্য ও আচরণও বিবেচনা করে। কোনো রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড যদি প্রতিবেশীদের কাছে ক্রমবর্ধমান হুমকি হিসেবে প্রতিভাত হয়, তাহলে তারা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য একে অন্যের কাছাকাছি আসতে শুরু করে। ইরানের বর্তমান অবস্থান সেই ভারসাম্য তৈরির প্রক্রিয়াকেই ত্বরান্বিত করতে পারে।

অর্থাৎ, তেহরান যত বেশি চাপ প্রয়োগ করে নিজের প্রভাব বাড়াতে চাইছে, ততই অন্য রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন অনুভব করছে। শক্তি প্রদর্শনের এই পদ্ধতি শেষ পর্যন্ত শক্তির পরিধি বাড়ানোর বদলে ইরানের কৌশলগত পরিসর সংকুচিত করতে পারে।

উপসাগরের সামনে নতুন কৌশলগত হিসাব

যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে নিজেদের কৌশলগত সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। সংকটের সময়ই বোঝা যায় কোন জোট কতটা কার্যকর, কোন সম্পর্ক কতটা নির্ভরযোগ্য এবং কোন অংশীদারের ওপর কতটা আস্থা রাখা যায়।

হরমুজ প্রণালীতে হস্তক্ষেপ করলে হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের | STAR NEWS

এ কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বর্তমান পরিস্থিতি শুধু নিরাপত্তা সংকট নয়; এটি ভবিষ্যৎ কূটনীতি ও জোটনীতির পুনর্বিন্যাসেরও মুহূর্ত। পুরোনো সমীকরণ স্থায়ী নয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সম্পর্ক পুনর্গঠন করে। যে পক্ষ এই পরিবর্তন সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারবে এবং আবেগের বদলে হিসাব করে সিদ্ধান্ত নেবে, ভবিষ্যতের আঞ্চলিক ব্যবস্থায় তার প্রভাবও বেশি হবে।

আরব বিশ্বের পুরোনো দ্বিধা আবার সামনে

এই যুদ্ধ আরব বিশ্বের দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক দুর্বলতাকেও সামনে এনেছে। সেটি হলো—‘শত্রুর শত্রু বন্ধু’ ধরনের সরলীকৃত রাজনৈতিক হিসাব। ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের বিরোধের কারণে কেউ কেউ উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে তেহরানের আগ্রাসনকে স্পষ্টভাবে নিন্দা করতে দ্বিধা দেখাতে পারে। কিন্তু এই যুক্তি বাস্তব রাজনীতির জটিলতাকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে।

একই সময়ে একাধিক পক্ষের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা সম্ভব। ইসরায়েলের নীতি নিয়ে আপত্তি থাকা এবং ইরানের উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে আগ্রাসনের বিরোধিতা করা—এই দুই অবস্থান পরস্পরবিরোধী নয়। বরং একটি পরিণত পররাষ্ট্রনীতির জন্য একই সঙ্গে একাধিক সত্যকে স্বীকার করার সক্ষমতা প্রয়োজন।

এই জায়গায় আরব লীগের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংকটের সময় কোনো আঞ্চলিক সংগঠনের শক্তি তার বিবৃতির কঠোরতায় নয়, বরং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতায় প্রকাশ পায়। ইরানের পদক্ষেপের বিষয়ে দেরিতে প্রতিক্রিয়া বা অস্পষ্ট অবস্থান সংগঠনটির বিশ্বাসযোগ্যতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।

১৯৯০ সালে ইরাক কুয়েত আক্রমণ করার সময় আরব বিশ্বের বিভক্তি যেমন সম্মিলিত প্রতিক্রিয়াকে দুর্বল করেছিল, বর্তমান পরিস্থিতিও সেই পুরোনো সমস্যার কথা মনে করিয়ে দেয়। ভিন্ন ভিন্ন আনুগত্য ও কৌশলগত স্বার্থ যদি আবারও সম্মিলিত অবস্থানকে বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও কমে যেতে পারে।

বহুমেরুর বিশ্বব্যবস্থা কী, কীভাবে গড়ে উঠছে

যুদ্ধের আসল শিক্ষা কোথায়

যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত শুধু ধ্বংসের হিসাব দেয় না; এটি রাষ্ট্রগুলোর প্রকৃত সম্পর্কও প্রকাশ করে। শান্তিকালে যে কূটনৈতিক ভাষা অনেক কিছু আড়াল করতে পারে, সংঘাত সেই আবরণ সরিয়ে দেয়। তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে কে কার পাশে দাঁড়ায়, কোন জোট কতটা কার্যকর এবং কোন রাষ্ট্রের প্রভাব বাস্তবে কতটা বিস্তৃত।

ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা তাই কেবল সামরিক সংঘাত নয়। আরও গভীর সংকট হলো, দীর্ঘদিন ধরে অর্জিত কূটনৈতিক পরিসর যদি দ্রুত সংকুচিত হয়ে যায় এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো নিরাপত্তার প্রয়োজনে তার বিপরীতে ভারসাম্য গড়ে তোলে, তাহলে সামরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও একটি রাষ্ট্র কৌশলগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

এই সংঘাতের শেষ পরিণতি এখনই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শুধু কঠোরতা টেকসই শক্তির নিশ্চয়তা দেয় না। কখন চাপ প্রয়োগ করতে হবে, কখন সংযত হতে হবে এবং কখন কৌশল বদলাতে হবে—এই তিনটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের স্থিতিস্থাপকতা নির্ধারণ করে।

যুদ্ধের শব্দ একসময় থেমে যাবে। কিন্তু তার পর যে নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতা তৈরি হবে, সেখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে কে কতটা ধ্বংস করেছে তা নয়; বরং কে পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্য সবচেয়ে দ্রুত বুঝতে পেরেছে। ইরানের জন্য সেই হিসাবটি এখন আগের চেয়ে অনেক কঠিন। আর উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এটি এমন এক মুহূর্ত, যখন সংকটকে শুধু সামলানো নয়, ভবিষ্যতের আঞ্চলিক কাঠামোকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগও তৈরি হয়েছে।