দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংগীত জগতে বড় এক পরিবর্তন ঘটছে। একসময় যেখানে পশ্চিমা পপ ও কে-পপ চার্ট দখল করে রাখত, এখন সেখানে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে স্থানীয় সংগীত। তবে এই উত্থানের মাঝেও ইন্দোনেশিয়ার সামনে দেখা দিয়েছে এক অদ্ভুত বাস্তবতা—স্ট্রিমিংয়ে বিপুল জনপ্রিয়তা পেলেও সেই সাফল্য সবসময় কনসার্টের দর্শকসংখ্যায় রূপ নিচ্ছে না। সারাক্ষণ রিপোর্ট।
স্থানীয় সংগীতের উত্থান
সাম্প্রতিক কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর—এই পাঁচ দেশের স্ট্রিমিং চার্টে স্থানীয় সংগীতের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে শুধু ইন্দোনেশিয়াতেই শীর্ষ ২০০ স্ট্রিমিং তালিকায় ২৩.২ বিলিয়ন স্ট্রিম রেকর্ড হয়েছে, যা অঞ্চলটির অন্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।
২০২৩ সালে ইন্দোনেশিয়ার স্পটিফাই শীর্ষ ৫০ তালিকায় স্থানীয় সংগীতের অংশ ছিল ৬২ শতাংশ। ২০২৬ সালের শুরুতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮২ শতাংশে। একই সময়ে কে-পপের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডের সাফল্য
ফিলিপাইনে স্থানীয় পপ সংগীতের বিস্ফোরক উত্থান পশ্চিমা পপের অংশ কমিয়ে দিয়েছে। দেশটির জনপ্রিয় গার্ল গ্রুপ বিনি শুধু স্থানীয় চার্টেই নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও সাফল্য পেয়েছে। কোচেলায় পারফর্ম করার পর তারা বিশ্ব সফরের ঘোষণা দেয়।
থাইল্যান্ডেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। টি-পপ এবং থাই হিপ-হপের উত্থানে কে-পপের প্রভাব দ্রুত কমেছে। দেশটির শিল্পীরা নিজেদের বাজারে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলে আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছেও পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন।
ইন্দোনেশিয়ার তিন স্তরের সংগীত পরিবেশ
ইন্দোনেশিয়ার সংগীত বাজারকে বিশ্লেষকেরা তিন স্তরে ভাগ করেছেন। প্রথম স্তরে রয়েছে মূলধারার ইন্দো-পপ শিল্পীরা। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে স্বাধীন বা ইন্ডি শিল্পীরা, যারা ভাইরাল প্ল্যাটফর্ম থেকে মূলধারায় প্রবেশ করছেন। তৃতীয় স্তরে রয়েছে হিপদুত নামে পরিচিত নতুন ধারার সংগীত, যা হিপ-হপ ও ঐতিহ্যবাহী দাংদুতের মিশ্রণ।
এই তিনটি ধারা সমান্তরালভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও তাদের স্ট্রিমিং সাফল্য সবসময় কনসার্টের টিকিট বিক্রিতে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
স্ট্রিম থেকে মঞ্চে যাওয়ার সংকট
সংগীত প্রযোজক ও শিল্প-সংশ্লিষ্টদের মতে, শত শত মিলিয়ন স্ট্রিম পাওয়া মানেই বড় ভক্তগোষ্ঠী তৈরি হওয়া নয়। অনেক শিল্পীর গান কোটি কোটি বার শোনা হলেও তারা একক কনসার্ট আয়োজনের সুযোগ পান না।
এর বিপরীতে, আন্তর্জাতিক শিল্পীদের প্রতি ইন্দোনেশিয়ান শ্রোতাদের আগ্রহ এখনও প্রবল। উদাহরণ হিসেবে, বিটিএসের আসন্ন জাকার্তা কনসার্ট ঘোষণার পর ব্যাপক উন্মাদনা দেখা গেছে। অথচ একই মাত্রার সমর্থন স্থানীয় শিল্পীদের একক কনসার্টে সবসময় দেখা যায় না।
দর্শকদের আচরণের পরিবর্তন
একটি জরিপে দেখা গেছে, ৫১ শতাংশ ইন্দোনেশিয়ান দর্শক স্থানীয় শিল্পীদের দেখতে পছন্দ করেন। কিন্তু ৬১ শতাংশ বিদেশে গিয়ে কনসার্ট দেখার পরিকল্পনা করেন। একই সঙ্গে ৫৭ শতাংশ দর্শক একক কনসার্টের চেয়ে সংগীত উৎসবকে বেশি পছন্দ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংগীত উৎসবের সহজলভ্যতা স্থানীয় শিল্পীদের একক কনসার্টের বাজারকে দুর্বল করছে। কারণ একটি টিকিটে বহু শিল্পীকে দেখার সুযোগ পাওয়ায় দর্শকরা আলাদা কনসার্টের জন্য বেশি অর্থ ব্যয় করতে আগ্রহী নন।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, স্ট্রিমিং জনপ্রিয়তা এবং প্রকৃত শিল্পীভক্তির মধ্যে এখনও বড় পার্থক্য রয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম স্থানীয় সংগীতকে অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছে দিলেও সেই জনপ্রিয়তাকে দীর্ঘমেয়াদি দর্শকসমর্থন ও সফল একক কনসার্টে রূপান্তর করা এখন ইন্দোনেশিয়ার সংগীত শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্ট্রিমিংয়ে শীর্ষে স্থানীয় সংগীত, কিন্তু কনসার্টে সেই জনপ্রিয়তা কতটা বাস্তব—দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় সংগীত বাজার এখন সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















