ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বাঁ শহরে শুরু হওয়া জি-৭ সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণ করার চেষ্টা করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্মেলনে যোগ দিতে পৌঁছানোর আগেই ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে একটি স্পষ্ট উপলব্ধি তৈরি হয়েছে—ট্রাম্পকে আর সাময়িক রাজনৈতিক ব্যতিক্রম হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
বছরের পর বছর শুল্ক হুমকি, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং প্রকাশ্য মতবিরোধের পর ইউরোপের বহু নেতা মনে করছেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র কম পূর্বানুমানযোগ্য অংশীদার হয়ে উঠতে পারে। সেই কারণেই তারা এমন একটি আন্তর্জাতিক পরিবেশের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যেখানে ইউরোপকে আরও বেশি স্বনির্ভর হতে হবে।
ইরান সংকটের ছায়ায় জি-৭
এবারের জি-৭ সম্মেলনের ওপর ইরান যুদ্ধের প্রভাবও স্পষ্ট। সাম্প্রতিক সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে এবং নতুন করে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়িয়েছে। যদিও ট্রাম্প যুদ্ধের অবসানের ঘোষণা দিয়েছেন, তবুও এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এখনো রয়ে গেছে।
ট্রাম্প সম্মেলনে এমন বার্তা তুলে ধরতে চান যে তাঁর কূটনৈতিক কৌশল কার্যকর হয়েছে এবং মিত্র দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের সঙ্গে নিজেদের নীতিকে মানিয়ে নিচ্ছে। তবে ইউরোপীয় নেতারা অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যকে সমর্থন করলেও, আগের তুলনায় চাপের মুখে নতি স্বীকার করতে কম আগ্রহী।
ইউরোপের স্বনির্ভরতার প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্র এখনো ন্যাটোর প্রধান সামরিক শক্তি। পারমাণবিক সুরক্ষা, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং সামরিক অবকাঠামোর বড় অংশই ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল। তবুও ইউরোপে এখন প্রশ্ন উঠছে—যদি যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সংকটে নেতৃত্ব দিতে না চায় বা না দেয়, তাহলে কী হবে?
ইরান পরিস্থিতি এই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। ইউরোপীয় রাজধানীগুলোতে এমন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের প্রভাব তাদের ওপরও পড়ছে, অথচ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ভূমিকা সীমিত।
গ্রিনল্যান্ড বিতর্কে আস্থার সংকট
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নিয়ে অবস্থান ইউরোপে বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি করেছে। ডেনমার্কের অধীনস্থ এই অঞ্চলকে ঘিরে মার্কিন আগ্রহ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে কিছু ইউরোপীয় নেতা সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়েও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন।
এই ঘটনার পর ইউরোপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা আরও কমে যায়। অনেক নেতার কাছে এটি ছিল একটি সতর্কবার্তা যে, দীর্ঘদিনের ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক আগের মতো স্থিতিশীল নাও থাকতে পারে।
ম্যাক্রোঁর ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় কৌশলগত স্বনির্ভরতার পক্ষে কথা বলে আসছেন। তাঁর মতে, ইউরোপকে এমন সক্ষমতা অর্জন করতে হবে যাতে প্রয়োজনে নিজেদের স্বার্থ নিজেরাই রক্ষা করতে পারে।
সম্প্রতি তিনি ইউরোপীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন যে বর্তমান পরিস্থিতি ইউরোপের জন্য জেগে ওঠার সময়। তাঁর মতে, ইউরোপকে আরও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
তবে ম্যাক্রোঁ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পক্ষে নন। বরং তিনি একদিকে ইউরোপীয় স্বনির্ভরতার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন, অন্যদিকে ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত কূটনৈতিক সম্পর্কও বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।
স্টারমার, মেলোনি ও নতুন বাস্তবতা
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। ইরান সংকট ও গ্রিনল্যান্ড বিতর্কের পর ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাজনৈতিকভাবে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে স্টারমারের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। ইরান ইস্যুতে মতপার্থক্যের কারণে ট্রাম্প প্রকাশ্যে তাঁর সমালোচনা করেছেন। ফলে যুক্তরাজ্যও ধীরে ধীরে ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের দিকে ঝুঁকছে।
নাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত এই জি-৭ সম্মেলন শুধু বর্তমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার মঞ্চ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ইউরোপীয় নেতারা একদিকে ট্রাম্পকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ এড়াতে চাইছেন, অন্যদিকে নিজেদের স্বাধীন অবস্থানও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন।
তিন সপ্তাহ পর তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে প্রতিরক্ষা ব্যয়, সামরিক দায়বদ্ধতা এবং ট্রান্স-আটলান্টিক জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে এভিয়ানের এই সম্মেলনকে বৃহত্তর পরিবর্তনের সূচনা হিসেবেই দেখছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















