০৩:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৪ মে ২০২৬
ছয় বড় শিল্পগোষ্ঠীর ঋণঝুঁকিতে ব্যাংক খাত, বাংলাদেশ ব্যাংকের গোপন প্রতিবেদনে বড় সতর্কবার্তা টাঙ্গাইলে মহাসড়কে ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষে নিহত ২, আহত আরও ২ চট্টগ্রামে পাঁচ ব্যাংকের শাখায় তালা, আমানত ফেরত ও ‘হেয়ার কাট’ বাতিলের দাবিতে টানা বিক্ষোভ ঈদের আগে রাত ১১টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার দাবি, সরকারের কাছে চিঠি ব্যবসায়ীদের টেকনাফ থেকে রওনা, রোহিঙ্গা বোঝাই নৌকা ডুবি: আন্দামান সাগরে ৯ জনকে উদ্ধার ইউনূস সরকারের কর্মকাণ্ডের বৈধতা চ্যালেঞ্জে নতুন রিট, তদন্ত দাবিও উঠল বিজয়ের ঝড়, তামিল রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ: নগদ টাকা আর স্বর্ণের আংটি   ৩ ঘন্টার গননাতে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির দাপট, পিছিয়ে তৃণমূলের হেভিওয়েটরা হিজবুল্লাহর অজেয়তার মিথ ভাঙছে, যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় চাপে লেবানন জিন না কেটে রোগ সারানোর নতুন দিগন্ত: এপিজেনোম সম্পাদনায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে আশার আলো

হরমুজ প্রণালীতে দম্ভের সংঘর্ষ: ভুল হিসাব, দীর্ঘ যুদ্ধ আর বিশ্ব অর্থনীতির ঝুঁকি

ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত এমন এক বাস্তবতার সামনে বিশ্বকে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস আর বাস্তব কৌশলের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কয়েক বছর আগে পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত দিয়ে যে পথের শুরু, তা এখন এসে দাঁড়িয়েছে এক জটিল অচলাবস্থায়—যেখানে দ্রুত সাফল্যের প্রত্যাশা বারবার ভেঙে পড়েছে।

শুরুতে ধারণা ছিল, সীমিত সামরিক চাপ ও অর্থনৈতিক অবরোধ ইরানকে দ্রুত সমঝোতায় বাধ্য করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে যে আশাবাদী বক্তব্য শোনা গিয়েছিল—সংক্ষিপ্ত অভিযান, দ্রুত বিজয়—তা এখন আর টেকসই বলে মনে হচ্ছে না। বরং ইরান হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণে এনে দেখিয়েছে, আঞ্চলিক বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল এবং প্রতিপক্ষকে দ্রুত নতিস্বীকার করানো সহজ নয়।

অর্থনৈতিক চাপও প্রত্যাশামতো ফল দিচ্ছে না। যদিও ইরান তাদের তেল খাতে চাপে রয়েছে এবং বিকল্প রপ্তানি পথ খুঁজছে, তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে তাদের অর্থনীতি তাৎক্ষণিকভাবে ধসে পড়ার মুখে নয়। তেলের মজুত, বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহনশীলতা—এই সব মিলিয়ে তারা এখনও কিছুটা সময় ধরে রাখতে সক্ষম। অর্থাৎ যে চাপ দ্রুত ফল দেবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, তা এখন দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় রূপ নিচ্ছে।

Strait of Hormuz standoff reignites as IRGC defies Iran's diplomats |  Euronews

এই পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নেতৃত্বের ধারাবাহিক অতিরিক্ত আশাবাদ। বারবার ঘোষণা এসেছে যে যুদ্ধ শেষের পথে, প্রতিপক্ষ দুর্বল হয়ে পড়েছে বা শিগগিরই সমঝোতায় আসবে। কিন্তু বাস্তবতা সেই দাবিকে সমর্থন করেনি। এতে স্পষ্ট হয় যে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা অনেক বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ পর্যন্ত মন্তব্য করেছেন, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। তার ভাষায়, একটি দেশ তার নিজের অবস্থানকেই ক্ষুণ্ণ করছে। এই মন্তব্য কেবল কূটনৈতিক সমালোচনা নয়, বরং বর্তমান নীতির সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।

মূল সমস্যা হলো, উভয় পক্ষই বিশ্বাস করে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে নতি স্বীকার করানো সম্ভব। অন্যদিকে ইরানও মনে করছে তারা এই চাপ সহ্য করে সময়ক্ষেপণ করতে পারবে। এই পারস্পরিক বিশ্বাসই অচলাবস্থাকে দীর্ঘায়িত করছে।

এই ধরণের পরিস্থিতি প্রায়ই দেখা যায় এমন নেতৃত্বের ক্ষেত্রে, যারা নিজেদের চারপাশে এমন পরিবেশ তৈরি করেন যেখানে সমালোচনা বা সতর্কবার্তা কম শোনা যায়। ফলে বাস্তবতার সঙ্গে সিদ্ধান্তের দূরত্ব বেড়ে যায়। ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের ভুলের দিকে নিয়ে গেছে।

The Remarkable Collapse of Iran's Powerful Alliances | The New Yorker

ইরানের ক্ষেত্রেও অতীতে এমন ভুল দেখা গেছে। ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস দখল এবং দীর্ঘদিন জিম্মি সংকট, কিংবা ইরান-ইরাক যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা—এসব সিদ্ধান্ত তাদের আন্তর্জাতিক অবস্থান দুর্বল করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও যদি একই ধরণের কৌশলগত ভুল হয়, তবে তার পরিণতি আরও জটিল হতে পারে।

এই সংঘাতের প্রভাব কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হরমুজ প্রণালী বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এখানে অচলাবস্থা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হবে, দাম বাড়বে এবং তার প্রভাব পড়বে খাদ্য, ওষুধ, সারসহ নানা খাতে। বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলো এই চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করবে।

এমন পরিস্থিতিতে একটি সীমিত সমঝোতার প্রস্তাব সামনে এসেছে—প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং জটিল বিষয়গুলো পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া। যদিও এই প্রস্তাবে এখনো পূর্ণ সম্মতি নেই, তবুও এটি একটি সম্ভাব্য পথ দেখায়। কারণ সব সমস্যার একসঙ্গে সমাধান না হলেও, উত্তেজনা কমানোই প্রথম ধাপ হতে পারে।

The Strait of Hormuz crisis, why Iran must reopen the Strait of Hormuz

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো বাস্তবতা স্বীকার করা এবং কৌশল পুনর্বিবেচনা করা। শক্তির প্রদর্শন যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, দীর্ঘমেয়াদে তা সবসময় কার্যকর হয় না। বরং ধৈর্য, সংলাপ এবং বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিই টেকসই সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকে যায়—এই সংঘাত কি যুক্তির পথে ফিরে আসবে, নাকি দম্ভ ও ভুল হিসাবের চক্রেই আটকে থাকবে? যদি দ্বিতীয়টি ঘটে, তবে এর মূল্য শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো বিশ্বকেই দিতে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ছয় বড় শিল্পগোষ্ঠীর ঋণঝুঁকিতে ব্যাংক খাত, বাংলাদেশ ব্যাংকের গোপন প্রতিবেদনে বড় সতর্কবার্তা

হরমুজ প্রণালীতে দম্ভের সংঘর্ষ: ভুল হিসাব, দীর্ঘ যুদ্ধ আর বিশ্ব অর্থনীতির ঝুঁকি

১২:৩০:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত এমন এক বাস্তবতার সামনে বিশ্বকে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস আর বাস্তব কৌশলের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কয়েক বছর আগে পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত দিয়ে যে পথের শুরু, তা এখন এসে দাঁড়িয়েছে এক জটিল অচলাবস্থায়—যেখানে দ্রুত সাফল্যের প্রত্যাশা বারবার ভেঙে পড়েছে।

শুরুতে ধারণা ছিল, সীমিত সামরিক চাপ ও অর্থনৈতিক অবরোধ ইরানকে দ্রুত সমঝোতায় বাধ্য করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে যে আশাবাদী বক্তব্য শোনা গিয়েছিল—সংক্ষিপ্ত অভিযান, দ্রুত বিজয়—তা এখন আর টেকসই বলে মনে হচ্ছে না। বরং ইরান হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণে এনে দেখিয়েছে, আঞ্চলিক বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল এবং প্রতিপক্ষকে দ্রুত নতিস্বীকার করানো সহজ নয়।

অর্থনৈতিক চাপও প্রত্যাশামতো ফল দিচ্ছে না। যদিও ইরান তাদের তেল খাতে চাপে রয়েছে এবং বিকল্প রপ্তানি পথ খুঁজছে, তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে তাদের অর্থনীতি তাৎক্ষণিকভাবে ধসে পড়ার মুখে নয়। তেলের মজুত, বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহনশীলতা—এই সব মিলিয়ে তারা এখনও কিছুটা সময় ধরে রাখতে সক্ষম। অর্থাৎ যে চাপ দ্রুত ফল দেবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, তা এখন দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় রূপ নিচ্ছে।

Strait of Hormuz standoff reignites as IRGC defies Iran's diplomats |  Euronews

এই পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নেতৃত্বের ধারাবাহিক অতিরিক্ত আশাবাদ। বারবার ঘোষণা এসেছে যে যুদ্ধ শেষের পথে, প্রতিপক্ষ দুর্বল হয়ে পড়েছে বা শিগগিরই সমঝোতায় আসবে। কিন্তু বাস্তবতা সেই দাবিকে সমর্থন করেনি। এতে স্পষ্ট হয় যে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা অনেক বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ পর্যন্ত মন্তব্য করেছেন, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। তার ভাষায়, একটি দেশ তার নিজের অবস্থানকেই ক্ষুণ্ণ করছে। এই মন্তব্য কেবল কূটনৈতিক সমালোচনা নয়, বরং বর্তমান নীতির সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।

মূল সমস্যা হলো, উভয় পক্ষই বিশ্বাস করে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে নতি স্বীকার করানো সম্ভব। অন্যদিকে ইরানও মনে করছে তারা এই চাপ সহ্য করে সময়ক্ষেপণ করতে পারবে। এই পারস্পরিক বিশ্বাসই অচলাবস্থাকে দীর্ঘায়িত করছে।

এই ধরণের পরিস্থিতি প্রায়ই দেখা যায় এমন নেতৃত্বের ক্ষেত্রে, যারা নিজেদের চারপাশে এমন পরিবেশ তৈরি করেন যেখানে সমালোচনা বা সতর্কবার্তা কম শোনা যায়। ফলে বাস্তবতার সঙ্গে সিদ্ধান্তের দূরত্ব বেড়ে যায়। ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের ভুলের দিকে নিয়ে গেছে।

The Remarkable Collapse of Iran's Powerful Alliances | The New Yorker

ইরানের ক্ষেত্রেও অতীতে এমন ভুল দেখা গেছে। ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস দখল এবং দীর্ঘদিন জিম্মি সংকট, কিংবা ইরান-ইরাক যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা—এসব সিদ্ধান্ত তাদের আন্তর্জাতিক অবস্থান দুর্বল করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও যদি একই ধরণের কৌশলগত ভুল হয়, তবে তার পরিণতি আরও জটিল হতে পারে।

এই সংঘাতের প্রভাব কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হরমুজ প্রণালী বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এখানে অচলাবস্থা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হবে, দাম বাড়বে এবং তার প্রভাব পড়বে খাদ্য, ওষুধ, সারসহ নানা খাতে। বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলো এই চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করবে।

এমন পরিস্থিতিতে একটি সীমিত সমঝোতার প্রস্তাব সামনে এসেছে—প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং জটিল বিষয়গুলো পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া। যদিও এই প্রস্তাবে এখনো পূর্ণ সম্মতি নেই, তবুও এটি একটি সম্ভাব্য পথ দেখায়। কারণ সব সমস্যার একসঙ্গে সমাধান না হলেও, উত্তেজনা কমানোই প্রথম ধাপ হতে পারে।

The Strait of Hormuz crisis, why Iran must reopen the Strait of Hormuz

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো বাস্তবতা স্বীকার করা এবং কৌশল পুনর্বিবেচনা করা। শক্তির প্রদর্শন যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, দীর্ঘমেয়াদে তা সবসময় কার্যকর হয় না। বরং ধৈর্য, সংলাপ এবং বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিই টেকসই সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকে যায়—এই সংঘাত কি যুক্তির পথে ফিরে আসবে, নাকি দম্ভ ও ভুল হিসাবের চক্রেই আটকে থাকবে? যদি দ্বিতীয়টি ঘটে, তবে এর মূল্য শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো বিশ্বকেই দিতে হবে।