দেশের ব্যাংকিং খাতের বড় অংশ এখন উচ্চ ঝুঁকির মুখে—এমনই সতর্কবার্তা উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি গোপন অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছয়টি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খেলাপি ঋণের কারণে একাধিক ব্যাংকের আর্থিক স্থিতি ও সম্পদের গুণগত মান নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনটির শিরোনাম ‘সিলেক্টেড লিড ব্যাংকস, ইমপ্যাক্টেড বাই সিক্স গ্রুপস’। এতে বিভিন্ন ব্যাংকের ঝুঁকিপূর্ণ ঋণসংক্রান্ত সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে তাদের শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে। চিহ্নিত ছয়টি গোষ্ঠী বা ব্যক্তির মধ্যে রয়েছেন সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম, বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা এবং ওরিয়ন গ্রুপ।
ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি চিত্র
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি ছয়টির মধ্যে পাঁচটি গোষ্ঠীর ঋণঝুঁকির তালিকায় রয়েছে, যা একাধিক উচ্চঝুঁকির ঋণ পোর্টফোলিওতে তাদের গভীর সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, সদ্য একীভূত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি ছয়টি গোষ্ঠীর সঙ্গেই যুক্ত রয়েছে, যা ইঙ্গিত করছে—একীভূত হওয়ার ফলে দুর্বল ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের বড় অংশ তাদের ব্যালান্স শিটে এসেছে।

এছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, এবি ব্যাংক এবং আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের নামও একাধিকবার উঠে এসেছে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায়।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থান
রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় এই গোষ্ঠীগুলোর খেলাপি ঋণের সংযোগ পাওয়া গেছে। ফলে পুরো ব্যাংকিং খাত জুড়েই একটি বিস্তৃত ঝুঁকির চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন কৌশল
বর্ধমান এই সিস্টেমিক ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। নির্বাচিত কিছু ব্যাংককে ‘লিড ব্যাংক’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, যারা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কাজ করবে।
লিড ব্যাংক নির্ধারণে যেসব মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক নন-ডিসক্লোজার চুক্তি (এনডিএ) পরিচালনার অভিজ্ঞতা। এর মাধ্যমে জটিল আলোচনায় অংশ নেওয়া এবং ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দক্ষভাবে পরিচালনা করা সহজ হবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গোষ্ঠীভিত্তিক লিড ব্যাংক

সাইফুজ্জামান চৌধুরী গ্রুপের জন্য লিড ব্যাংক হিসেবে রয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, সঙ্গে ইসলামী ব্যাংক ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। এস আলম গ্রুপে লিড হিসেবে ইসলামী ব্যাংক, সহযোগী হিসেবে জনতা ও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। বেক্সিমকো গ্রুপে ন্যাশনাল ব্যাংক লিড, সঙ্গে জনতা ব্যাংক। সিকদার গ্রুপে আইএফআইসি ব্যাংক লিড, সঙ্গে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংক। নাসা গ্রুপে ন্যাশনাল ব্যাংক লিড, সহযোগী আইএফআইসি ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। আর ওরিয়ন গ্রুপে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিড, সঙ্গে অগ্রণী ব্যাংক।
নীতিগত সীমাবদ্ধতা
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যেসব ব্যাংক একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে বা নির্ধারিত রয়েছে, তারা লিড ব্যাংক হিসেবে কাজ করতে পারবে না। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চলমান নীতিগত বিবেচনার অংশ।
সমন্বিত পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপ ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ সংকট মোকাবিলায় একটি সমন্বিত ও আন্তর্জাতিকভাবে সহায়তাপ্রাপ্ত কৌশলের দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















