ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের একটি শহরে মঙ্গলবার হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিমান হামলায় নিহতদের জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে। নিউইয়র্ক টাইমস যাচাই করা ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, শোকাহত মানুষের ভিড়ে শহরের সড়কগুলো ভরে গেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অভিযানের মধ্যে এই হামলাকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে ধরা হচ্ছে।

শনিবার সংঘটিত ওই হামলায় অন্তত ১৭৫ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের বড় একটি অংশ ছিল শিক্ষার্থী, যারা সে সময় মিনাব শহরের শাজারাহ তায়্যেবা নামের একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস করছিল। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
নিউইয়র্ক টাইমস যাচাই করা ভিডিও ও ছবিতে দেখা গেছে, বিস্ফোরণে দুইতলা ভবনটির অন্তত অর্ধেক ধ্বংস হয়ে গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাতের বিস্তার
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে প্রথম দফার হামলা শুরু করার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন বলে জানানো হয়। এর জবাবে ইরান অঞ্চলজুড়ে বিভিন্ন দেশের দিকে রকেট ও ড্রোন হামলা চালায়।
এই সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যে ৮০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
দাফনের আগে সারিবদ্ধ কবর খোঁড়া
মঙ্গলবার মিনাবে জানাজার আগে শহরের একটি কবরস্থানে শ্রমিকদের সারিবদ্ধভাবে কবর খুঁড়তে দেখা যায়। বিদ্যালয় থেকে প্রায় পাঁচ মাইল দূরে অবস্থিত ওই কবরস্থানে বহু কবর প্রস্তুত করা হয়। নিউইয়র্ক টাইমস যাচাই করা ভিডিও ফুটেজে এই দৃশ্য দেখা গেছে।
শোকযাত্রার সময় একটি ট্রাকে বহু কফিন তোলা ছিল। হাজারো মানুষ সেই ট্রাককে ঘিরে হাঁটছিল। কেউ শোকে বিলাপ করছিল, আবার কেউ কফিনের ওপর মিষ্টি ও গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে দিচ্ছিল। ড্রোনচিত্রে দেখা যায়, কবরস্থানে মানুষের ভিড়ের মধ্যে একে একে কফিনগুলো কবরের ভেতরে নামানো হচ্ছে।
কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, উপস্থিত মানুষজন প্রার্থনা করছেন এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সমর্থনে স্লোগান দিচ্ছেন।

বিদ্যালয়ের পাশেই সামরিক ঘাঁটি
যে বিদ্যালয়টিতে হামলা হয়েছিল, সেটি ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর একটি নৌঘাঁটির পাশেই অবস্থিত।
নিউইয়র্ক টাইমস বিশ্লেষণ করা উপগ্রহচিত্রে দেখা যায়, ভবনটি একসময় ওই সামরিক স্থাপনার অংশ ছিল। তবে ২০১৬ সালের মধ্যে ভবনটিকে আলাদা দেয়াল দিয়ে ঘিরে ফেলা হয় এবং তখন থেকে এটি আর ঘাঁটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল না।
এই হামলার বিষয়ে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের সরকার সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতির খবর সম্পর্কে তারা অবগত এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আরও একটি স্কুলে হামলার অভিযোগ
শনিবার ইরানে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে। আরেকটি হামলা তেহরানের নরমাক এলাকায় ৭২ নম্বর স্কোয়ারের কাছে অবস্থিত হেদায়াত উচ্চবিদ্যালয়ে আঘাত হানে বলে স্থানীয় গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার কর্মী সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।
যুদ্ধ আইনের প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মতে, ইচ্ছাকৃতভাবে স্কুল, হাসপাতাল বা অন্য কোনো বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। নির্বিচারে হামলাও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে।
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি জানিয়েছে, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সামরিক কাজে ব্যবহার করা হলেও সশস্ত্র পক্ষগুলোর দায়িত্ব থাকে যেন বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামোর ক্ষতি যতটা সম্ভব এড়ানো বা কমিয়ে আনা যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















