হাম প্রাদুর্ভাবের বিস্তার ও মৃত্যু সংখ্যা
বর্তমান হামের ঢেউতে দেশজুড়ে হাম আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত অন্তত পঞ্চাশের বেশি জেলায় শতাধিক শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে হামের লক্ষণ নিয়ে, এবং গত কয়েকদিনে প্রায় চল্লিশের মতো শিশু মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে। কিছু হাসপাতালে গত একদিনে তিন-চারজন শিশু মারা গেছে, যার ফলে মোট মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা চলমান সময়ে প্রায় চল্লিশের উপরে পৌঁছেছে।
যদিও হাসপাতাল ভেদে নম্বর ভিন্ন হতে পারে, মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে যে অনেক শিশুর মৃত্যু ইতোমধ্যেই নিশ্চিত হয়েছে এবং সন্দেহভাজন হিসেবে আরও মৃত্যুর ঘটনা যাচাইাধীন রয়েছে।

টিকা সংকট: ভ্যাকসিন নেই, সমস্যা বাড়ছে
দেশে হাম প্রতিরোধে ব্যবহৃত হাম-ভ্যাকসিন নিয়ে বড় ধরনের ঘাটতির অভিযোগ এসেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের সিনিয়র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে অনেক জেলায় টিকা সরবরাহ পাওয়া যায়নি, এবং সরকারের উদ্যোগে তৎক্ষণাত টিকা সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তারা বলেছেন যে ভ্যাকসিন সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি ও কার্যক্রমে অনিয়মের কারণে অনেক শিশু তাদের নির্ধারিত টিকা সময়মতো পায়নি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকার জরুরি ভিত্তিতে ভ্যাকসিন সংগ্রহের জন্য লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে এবং টিকা আসলে তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষ টিকা কার্যক্রম চালু করবে। এই উদ্যোগে দুই বছর থেকে দশ বছরের নিচে শত শত শিশুদের জন্য বিশেষ হাম টিকা কার্যক্রম শুরু করা হবে।
গত দুই বছরে টিকা কার্যক্রমে বিরতি: বিশাল গ্যাপ
সম্প্রতি পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র পঞ্চান্ন দশমিক দুই শতাংশ শিশু একটি হাম ভ্যাকসিন পেয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ৪৪ শতাংশ শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে — যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এই টিকা-খালতি গত কয়েক বছরে যথেষ্ট বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা কার্যক্রমে দীর্ঘ সময় বিরতি, সরবরাহ ব্যবস্থায় ত্রুটি এবং কর্মসূচির অনিয়মের কারণে বহু শিশু গত দুই বছরে হাম টিকা থেকে বাদ পড়েছে। ফলে ইমিউনিটি-গ্যাপ তৈরি হয়েছে, এবং সেই গ্যাপের শিশুরাই এখন সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে; যেখানে আক্রান্তদের মধ্যে বেশিরভাগই দুই বছরের নিচে এবং নয় মাসের নিচে শিশু।

ভ্যাকসিনের অভাব ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রস্তুতি সংকট
টিকা কার্যক্রমে দীর্ঘ বিরতি, ভ্যাকসিন স্টক রক্ষণাবেক্ষণে অসামঞ্জস্য এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম অভাব—এসব কারণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক জেলায় পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন না থাকায়, বিদ্যালয় স্বাস্থ্য কার্যক্রম ও স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টিকা দেওয়া অসম্ভব হচ্ছে, এবং এর ফলে সংক্রমণের বিস্তার আরও দ্রুত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্দিষ্ট এলাকায় ভ্যাকসিন না পাওয়া শিশুদের সংক্রমণ বাড়ছে, এমনকি নয় মাসের ছোট শিশুদের মধ্যে বেশি রোগী শনাক্ত হচ্ছে, যারা টিকার আওতার বাইরে থাকলেও মায়ের দেওয়া ইমিউনিটি কম থাকার কারণে সংক্রমণে পড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও স্থানীয় স্বীকৃতি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘ শিশু তহবিল বলেছে, টিকা কার্যক্রমের দীর্ঘ বিরতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অসামঞ্জস্যের কারণে দেশে ইমিউনিটি-গ্যাপ তৈরি হয়েছে, যার ফলে হামের মতো সংক্রামক রোগ আবার ছড়িয়ে পড়ছে। তারা উল্লেখ করেছে, দেশের লক্ষ্য ছিল দ্রুততম সময়ে হাম নির্মূল করা, কিন্তু ভ্যাকসিন-অভাব সেই লক্ষ্যকে ব্যাহত করেছে।

শিশুদের ঝুঁকি ও প্রতিরোধ
হাম ভাইরাস খুবই সংক্রামক, বিশেষত টিকা না পাওয়া বা দ্বিতীয় ডোজ না নেওয়া শিশুদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। সংক্রমণের ফলে জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে দাগ দেখা যায়, যা সময়মতো চিকিৎসা না হলে জটিলতা এবং মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হলো সময়মতো যথেষ্ট ভ্যাকসিন প্রদান এবং সংক্রমিতদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
#হামপ্রাদুর্ভাব #টিকা_সংকট #শিশুর_স্বাস্থ্য #ভ্যাকসিন_অভাব #স্বাস্থ্যসংবাদ #বাংলাদেশ
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















