মাটির গভীরে গড়ে তোলা ইরানের গোপন মিসাইল ঘাঁটিগুলো দীর্ঘদিন ধরে দেশটির প্রতিরক্ষা কৌশলের সবচেয়ে শক্তিশালী ঢাল হিসেবে বিবেচিত ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যেই সেই কৌশল এখন উল্টো দুর্বলতায় পরিণত হচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আকাশে টহল দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান এবং সশস্ত্র ড্রোন। ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি থেকে মিসাইল বহনকারী লঞ্চার বের হওয়া মাত্রই সেগুলোর ওপর আঘাত হানা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভারী বোমারু বিমান থেকে শক্তিশালী বোমা ফেলে বহু স্থানে মাটির নিচে থাকা অস্ত্রভাণ্ডারও কার্যত আটকে দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, এসব তথাকথিত ‘মিসাইল নগরী’র প্রবেশপথের কাছাকাছি বহু ইরানি মিসাইল ও লঞ্চারের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে, যেগুলো সাম্প্রতিক বিমান হামলায় ধ্বংস হয়েছে।

শুরুতেই শত শত মিসাইল ছুড়েছে তেহরান
সংঘাত শুরু হওয়ার পর গত শনিবার থেকে ইরান ইসরায়েল, পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটির দিকে পাঁচ শতাধিক মিসাইল নিক্ষেপ করেছে বলে আঞ্চলিক সরকারগুলোর তথ্য। তবে এর বড় অংশই মাঝপথে প্রতিরোধ করা হয়েছে।
যুদ্ধের প্রথম দিকের তুলনায় এখন বড় আকারের মিসাইল হামলা কমে গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক আক্রমণে তেহরানের পাল্টা হামলার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানান, ইরানের অবশিষ্ট ব্যালিস্টিক মিসাইল লঞ্চারগুলো খুঁজে ধ্বংস করার অভিযান চলছে। তার মতে, ইরানের আঘাত হানার সক্ষমতা দ্রুত কমে যাচ্ছে।
চার দিনে মিসাইল হামলা কমেছে প্রায় ৮৬ শতাংশ
যুদ্ধ শুরুর আগেই ইরান কিছু মিসাইল ও লঞ্চার ভূগর্ভস্থ বাংকার থেকে সরিয়ে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে হামলা থেকে সেগুলো রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইতোমধ্যে শত শত মিসাইল, লঞ্চার ও ড্রোন ধ্বংস করেছে বলে সামরিক সূত্রের দাবি। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, মাত্র চার দিনের মধ্যে ইরানের মিসাইল উৎক্ষেপণ প্রায় ছিয়াশি শতাংশ কমে গেছে।
ভূগর্ভস্থ ঘাঁটির বড় দুর্বলতা
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের হাজার হাজার স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার মিসাইল এখনও ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিতেই রয়েছে। কিন্তু এসব ঘাঁটির অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে অনেকটাই পরিচিত হয়ে গেছে।
এর ফলে ‘মিসাইল নগরী’ ধারণার একটি বড় দুর্বলতা সামনে এসেছে। আগে এসব লঞ্চার ছিল চলমান ও খুঁজে পাওয়া কঠিন। এখন সেগুলো নির্দিষ্ট স্থানে আটকে থাকায় সহজেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেকাংশে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন পরিচিত মিসাইল ঘাঁটির ওপর নজরদারি বিমান ঘোরাচ্ছে। কোনো ধরনের নড়াচড়া দেখা গেলেই যুদ্ধবিমান বা সশস্ত্র ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হচ্ছে।
শিরাজ ও ইসফাহানের কাছে ধ্বংস লঞ্চার
দক্ষিণ ইরানের শিরাজ শহরের কাছাকাছি কয়েকটি ঘাঁটিতে একাধিকবার হামলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়ে আসা কিছু মোবাইল মিসাইল লঞ্চার কাছের একটি গিরিখাতে ধ্বংস হয়ে পড়ে আছে।

একটি ছবিতে ধ্বংস হওয়া লঞ্চারের কাছ থেকে লালচে ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে, যা মিসাইলের নাইট্রিক অ্যাসিড জ্বালানি ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেয়। এতে গিরিখাত জুড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল।
ইসফাহানের কাছেও একটি লঞ্চার সড়কে চলতে দেখা যায় স্যাটেলাইট ছবিতে। সেখানে কাছাকাছি একটি বড় গর্ত থেকে ধারণা করা হয়, যুদ্ধবিমান সেটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল কিন্তু প্রথম আঘাতটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। পরের দিন একই এলাকায় ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের প্রবেশপথে ব্যাপক বোমাবর্ষণের চিহ্ন পাওয়া যায়।
উত্তর ও দক্ষিণে আলাদা লক্ষ্যবস্তু
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র মূলত দক্ষিণ ইরানের ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে, আর ইসরায়েল আঘাত হানছে উত্তরাঞ্চলের স্থাপনাগুলোতে।
তাবরিজ শহরের উত্তরে একটি ভূগর্ভস্থ ঘাঁটির সুড়ঙ্গপথ ধসে পড়ার চিত্রও স্যাটেলাইটে ধরা পড়েছে। এছাড়া দক্ষিণ ইরানের খোরগো, হাজি আবাদ ও জাম শহরের কাছেও কয়েকটি মিসাইল ঘাঁটিতে হামলার তথ্য পাওয়া গেছে।
আক্রমণের কৌশল বদল
)
বিশ্লেষকদের মতে, ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংস করতে যে বিশেষ বাঙ্কার ভেদকারী বোমা দরকার, তার সংখ্যা সীমিত। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ, রাস্তা ও উপরিভাগের স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে আঘাত করা হচ্ছে।
এর পেছনে আরেকটি কারণ হলো দ্রুত ইরানের মিসাইল সক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়া। কারণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে আগত মিসাইল প্রতিরোধ করতে যে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র লাগে, তার মজুতও সীমিত।
এখনও কিছু মিসাইল ধরে রেখেছে তেহরান
তবু ইরান সম্পূর্ণ থেমে যায়নি। মাঝে মাঝে ড্রোন ও বিচ্ছিন্ন মিসাইল হামলা চালানো হচ্ছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, সবচেয়ে শক্তিশালী ও দীর্ঘ পাল্লার মিসাইলগুলো হয়তো শেষ মুহূর্তের জন্য সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।
ইরান মিসাইল উৎক্ষেপণের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করেছে, যাতে শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর হামলা হলেও প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে না পড়ে। ধ্বংস হওয়া মিসাইল দ্রুত তৈরি করা সম্ভব হলেও নতুন লঞ্চার তৈরি করা তুলনামূলক কঠিন।
ইরানের অধিকাংশ মিসাইল ঘাঁটি ভূগর্ভস্থ হলেও উপরের ভবন, রাস্তা ও প্রবেশপথের কারণে সেগুলো স্যাটেলাইট ছবিতে শনাক্ত করা সম্ভব। বহু বছর ধরে এসব স্থাপনার অবস্থান শনাক্ত করার কাজ চালিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















