মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশের রফতানি খাতে। নতুন অর্ডারের হ্রাস, পরিবহন ব্যয়ের বৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশের রফতানিমুখী শিল্প এখন বহুমুখী চাপে পড়েছে।
নতুন অর্ডার কমছে
অর্থনীতিবিদ ও রফতানিকারকরা বলছেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি দামের অস্থিরতা, শিপিং রুটের ঝুঁকি এবং ক্রেতা দেশগুলোর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে তৈরি পোশাক, চামড়া, কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন খাতে নতুন ক্রয়াদেশ কমে যাচ্ছে। অনেক আগের অর্ডারও স্থগিত হয়েছে। বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান, বিদেশি ক্রেতারা নতুন অর্ডারে অপেক্ষা করছেন, কারণ যুদ্ধকালীন অনিশ্চয়তায় বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

কৃষিপণ্য ও পরিবহন ব্যাহত
বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসূর জানান, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সংকটের কারণে শাকসবজি ও ফল রফতানি প্রায় স্থবির। আগে প্রতিদিন যেসব পণ্য পাঠানো হতো, এখন মাত্র ২০–২৫ শতাংশ পাঠানো সম্ভব। লী এন্টারপ্রাইজের আবুল হোসাইন জানান, এয়ার ফ্রেইট ব্যয় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ২৫০–৩০০ টাকা থেকে প্রায় ৬০০ টাকা হয়েছে।
শিল্প খাতে দ্বৈত চাপ
চামড়া খাতেও প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত উল্লাহ জানান, নতুন রফতানি আদেশ প্রায় নেই। চীন থেকে আমদানি করা কেমিক্যালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্ডার হ্রাস একসঙ্গে তৈরি পোশাক খাতে দ্বৈত চাপ তৈরি করেছে।
শিপিং ব্যয় ও লিড টাইম বৃদ্ধি
পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক জাহাজ দীর্ঘ রুট ব্যবহার করছে। ফলে শিপিং ব্যয় বেড়ে ১০–১৪ দিন পর্যন্ত পণ্য পৌঁছাতে সময় লাগছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ না করতে পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকে যেতে পারেন।

নেতিবাচক প্রবণতায় রফতানি
গত ফেব্রুয়ারিতে দেশের রফতানি ৩৫০ কোটি ডলার হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ কম। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই–ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট রফতানি ৩ হাজার ১৯১ কোটি ডলার, যা ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ কম। প্রধান খাতগুলোতে তৈরি পোশাক, চামড়া, কৃষিপণ্য, পাটজাত পণ্য ও হোম টেক্সটাইলের রফতানি কমেছে।
বাণিজ্য ঘাটতি ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি
রফতানি আয় কমার বিপরীতে আমদানি ব্যয় বেড়ে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি। তবে প্রবাসী আয় ২১ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১৯ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, সীমিত পণ্য বৈচিত্র্য ও শিপিং রুটের ওপর নির্ভরতা বাংলাদেশের রফতানি খাতকে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বিকল্প বাজার, শিপিং রুট ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা না হলে বৈশ্বিক ধাক্কার মোকাবিলা কঠিন হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















